আজ ৮ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২১শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

031724Cu kalerkantho pic

অছাত্র ছাত্রলীগ নেতাদের বিদায় চান শিক্ষার্থীরা

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:অপেক্ষা, কবে খুলবে ক্যাম্পাস। করোনা মহামারির কারণে সারা দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও (চবি) বন্ধ রয়েছে। এখন করোনার প্রকোপ কমায় শিক্ষার্থীদের মনে আশা জেগেছে, হয়তো শিগগিরই খুলবে ক্যাম্পাস। শাটল ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দ আবার তাঁদের জীবনে ছন্দ ফিরিয়ে আনবে। তবে একই সঙ্গে উদ্বেগও রয়েছে তাঁদের মনে। বহু আগেই ছাত্রত্ব শেষ হওয়া কিছু ছাত্রলীগ নেতা এখনো ক্যাম্পাসে গেড়ে বসে আছেন। তুচ্ছ ঘটনায় ছাত্রলীগের গ্রুপগুলোর সংঘর্ষ তাঁদের ইন্ধনে বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছে অনেকবার। করোনার ক্ষতির পর আবার তেমন হলে তীব্র সেশনজটে পড়তে হবে শিক্ষার্থীদের। তাই অছাত্র নেতাদের ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি করছেন তাঁরা।

করোনায় সৃষ্ট সেশনজট দূর করতে নির্বিঘ্ন ক্যাম্পাস পাওয়ার জন্য যাঁরা পড়ালেখা শেষ হওয়ার পরও আবাসিক হলে সিট দখলে করে রেখেছেন এবং নানা সময়ে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দলাদলি ও কোন্দল-সংঘর্ষে জড়িয়েছেন—এমন বয়স্ক অন্তত দেড় ডজন ছাত্রলীগ নেতার ক্যাম্পাসে বিচরণ চান না তাঁরা। এঁদের কয়েকজন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরী হত্যা মামলারও আসামি।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান ছাত্রলীগের দুই সদস্যের কমিটি পূর্ণাঙ্গ হওয়া ছাড়াই ১৮ মাস পার হয়ে গেছে। ছাত্রলীগের কর্মীরা দাবি তুলেছেন, হয় এই কমিটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ করা হোক, না হয় নতুন কমিটি দেওয়া হোক। তাঁদের কথায়, ‘বয়োবৃদ্ধ’ কিছু ছাত্রলীগ নেতার জন্য তাঁদের অনেককে একনিষ্ঠভাবে ছাত্রলীগ করেও কোনো পদ-পদবিতে আসার আগেই নিয়মিত পড়াশোনা শেষ হওয়ায় ক্যাম্পাস ছাড়তে হচ্ছে। সময়মতো কমিটি হচ্ছে না। ঘুরেফিরে কয়েকজনই কমিটিতে দু-তিনবার করে স্থান পাচ্ছেন।

জানা যায়, ক্যাম্পাসে শাটল ট্রেনের বগিভিত্তিক ছাত্রলীগের সিএফসি, সিক্সটি নাইন, বিজয়, ভিএক্স, বাংলার মুখসহ ১১টি উপগ্রুপ রয়েছে। এ গ্রুপগুলো বিভক্ত সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন এবং বর্তমান শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারীর মধ্যে। আর এসব গ্রুপের সদস্যরা ক্যাম্পাস খোলা অবস্থায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘাতে জড়ায়। পরে এই সংঘাতকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ নামধারী বয়স্ক নেতাদের মদদে ক্যাম্পাস অবরোধসহ ক্লাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। হতাহতের ঘটনাও ঘটে। আধিপত্য বিস্তার এবং কখনো নিজস্ব স্বার্থের (টেন্ডার ও নিয়োগ সংক্রান্ত) জন্য আবাসিক হল, উপাচার্য-প্রক্টরের কার্যালয়, শিক্ষক বাস ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরও করা হয়।

সূত্র জানায়, এই নেতাদের তালিকায় রয়েছেন আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী বিভিন্ন গ্রুপের নেতৃত্বদানকারী মনসুর আলম, আব্দুল মালেক, আবু তোরাব পরশ, ইফতেখার আয়াজ, রকিবুল হাসান দিনার, রাজু মুন্সী, মো. সাঈদ, আমির সোহেল, প্রদীপ চক্রবর্তী দুর্জয়। আর মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারীর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন সুমন নাসির, ইলিয়াস মোল্লা, এনামুল হক আরাফাত, শরীফ উদ্দিন, শায়ন দাস গুপ্ত, জাহেদুল আওয়াল, আলামিন রিমন ও শরিফুল ইসলাম।

এ ছাড়া সাবেক সহসভাপতি আবুল মনসুর জামশেদ ও তাঁর ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম রোমেল ও মো. মামুন টেন্ডারসংশ্লিষ্ট কাজে জড়িত থেকে নানা সংঘাতের জন্ম দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সুমন মামুন, তৌহিদুল ইসলাম জিমেল ও জাহাঙ্গীর জীবন বর্তমানে চাকরি করলেও তাঁদেরও ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক তৎপরতা রয়েছে বলে জানা গেছে।

একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত অছাত্র নেতাদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া। করোনায় শিক্ষা কার্যক্রম এমনিতেই অনেক পিছিয়ে গেছে, তাই আবার তাঁদের ঝামেলার কারণে তাঁরা আর সেশনজটে আটকে থাকতে চান না।

বিভিন্ন অনুষদ সূত্র জানায়, এখন থেকে ১০-১২ বছর আগে যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন তাঁদের আর ছাত্রত্ব নেই। অনেকে আবার গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করতে পারেনি। ছাত্রত্ব না থাকলেও এঁরা ছাত্রলীগের একাধিক কমিটিতে পদ-পদবি পেয়ে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক রাজনীতিতে জড়িয়ে আছেন।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রক্টরিয়াল বডি ও আমাদের একটি কমিটি আছে। ওই কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাদের ছাত্রত্ব নেই এবং নানা সময়ে ক্যাম্পাস উত্তপ্তের সঙ্গে যারা জড়িত থাকে, তারা আর ক্যাম্পাসে থাকতে পারবে না। করোনা-পরবর্তী ক্যাম্পাস নির্বিঘ্নে পরিচালিত হবে। তাই প্রশাসনের উচিত তাদের বের করে দেওয়া। তাদেরও উচিত নিজ থেকে সরে যাওয়া।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়া বলেন, ‘যাদের ছাত্রত্ব নেই, বিভিন্ন ক্রাইমের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে মামলায় নাম আছে, তাদের ক্যাম্পাসে থাকার দরকার নেই। আর যারা পড়াশোনা শেষ করে এখনো ক্যাম্পাসসংশ্লিষ্ট রাজনীতিসহ বিভিন্ন কাজে জড়িত আছে, তাদের উচিত চলে যাওয়া। তাদের বিষয়ে ক্যাম্পাস খোলার পরই এসংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হবে।’

যাঁদের ছাত্রত্ব নেই তাঁদের ক্যাম্পাসে বিচরণ বিষয়ে হাটহাজারী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে দেখব, আমাদের এখতিয়ারে থাকলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাদের ছাত্রত্ব নেই—এ বিষয়সহ যেকোনো বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের লিখিত আবেদন পেলেই ব্যবস্থা নিতে পারব।’ দিয়াজ হত্যা মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সম্প্রতি জয়েন করেছি। তাই দিয়াজ হত্যা মামলার আসামিদের ব্যাপারটা এ মুহূর্তে কোন পর্যায়ে আছে, তা জানি না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজ্ঞান অনুষদের ২০১৪-১৫ সেশনের এক শিক্ষার্থী (ছাত্রলীগের কর্মী) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সেশনের অনেকে নিয়মিত পড়াশোনা শেষ করে বের হয়ে গেছেন। সময়মতো কমিটি না হওয়ায় কয়েক বছর ছাত্রলীগ করেও ত্যাগীরা কোনো পদ-পদবি পাননি। অতীতেও এমন হয়েছে। তাই ১৩ বছর আগে ক্যাম্পাসে এসেও এখনো যাঁরা ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক রাজনীতি করছেন এবং ঝামেলা পাকাচ্ছেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত তাঁদের বের করে দেওয়া।’

পরিসংখ্যান বিভাগের ২০০৬-০৭ সেশনের শিক্ষার্থী রেজাউল হক রুবেলকে সভাপতি এবং মার্কেটিং বিভাগের ২০১০-১১ সেশনের ইকবাল হোসেন টিপুকে সাধারণ সম্পাদক করে ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই এক বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দুই সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয় কেন্দ্র থেকে। তাঁদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে কেন্দ্রীয় সেলে পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৮ মাস পার হলেও তাঁরা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেননি। নানা সময়ে কর্মীরা পূর্ণাঙ্গ কমিটির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন।

কমিটির সভাপতি রেজাউল হক রুবেল কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার পরে ক্যাম্পাস খুললেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে। করোনার আগে দীর্ঘ সময় পেয়েও কমিটি ঘোষণা করতে না পারার প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব পেয়েই ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশকারী ও অছাত্রদের ঠেকানো এবং ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মীদের কমিটিতে নিয়ে আসাসহ কয়েকটি কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলাম। এগুলো করতে করতে করোনা এসে গেল।’ ছাত্রত্ব না থাকা ছাত্রলীগ নামধারীদের ক্যাম্পাসে বিচরণ সম্পর্কে রুবেল বলেন, ‘ক্যাম্পাস খোলার পর তা যাচাই-বাছাই করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগ কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে বলব।’

সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে অনেকে এখনো ক্যাম্পাসে রয়ে গেছেন। এ ছাড়া অনেকের বাড়ি ক্যাম্পাসের আশপাশে, এ জন্য তাঁরা ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক নানা বিষয়ে আলোচনা করার জন্য আসা-যাওয়া করেন। ক্যাম্পাসে তাঁদের ঠেকানোর বিষয়টি আমাদের হাতে নেই। এটা একান্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতে। তবে যাঁদের ছাত্রত্ব নেই. আমার পক্ষ থেকে তাঁদের ছাত্রলীগের কমিটি ও সংশ্লিষ্টতায় আনা হবে না। অনেকে মান-সম্মান নিয়ে চলে গেছেন। আশা করি, তাঁরাও এটি করবেন।’

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে দুই সদস্যের এ কমিটি ঘোষণা করার পরই ‘সভাপতি রুবেলের ছাত্রত্ব নেই ও বেশি বয়স’—এমন সমালোচনার মুখে পড়েছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগসহ সংশ্লিষ্টরা।