আজ ৮ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৪শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

আঁধারের বদলে আলোয়
আঁধারের বদলে আলোয়

আঁধারের বদলে আলোয়

প্রথমবার্তা প্রতিবেদকঃ পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে তারাও হয়েছিল মামলার আসামি। মামলা প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা আর নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠেছিল ওরা। কোমলমতি এই শিশুদের এবার মিলল নিস্তার। সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ও শিশু আদালতে ৫০টি মামলায় সাজার মুখে থাকা ৭০ শিশুকে কারাগারে না ঠেলে সংশোধনের জন্য মা-বাবার জিম্মায় পাঠানোর বিরল রায় দিয়েছেন এক মানবিক বিচারক। ফলে কারাগারের অন্ধকার জগতের বদলে তাদের ঠিকানা হয়েছে আপন আলয়ে।

 

গতকাল বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ও শিশু আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন এই রায় দেন। আদালতের ওই রায়ে বলা হয়েছে, লঘু অপরাধের ৫০ মামলায় ৭০ শিশু পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে থেকে নিজেদের সংশোধন করবে। আর তাদের কার্যক্রম ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তা। আদালতে রায় ঘোষণার পরই আদালত কর্তৃপক্ষ ৭০ শিশুকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। এ সময় তারা সবাই ছিল হাস্যোজ্জ্বল। বিচারকের এমন বিরল রায়ে সন্তুষ্ট পরিবারের লোকজনও।

 

সুনামগঞ্জ নারী ও শিশু আদালত সূত্রে জানা যায়, পরিবারের জিম্মায় পাঠানো ৭০ শিশুকে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে মামলায় জড়ানো হয়েছিল। অভিযুক্ত এসব শিশুর পরিবারের সঙ্গে আদালতে হাজিরা দিতে হতো নিয়মিত। ফলে শিশুদের স্বাভাবিক জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। তাদের শিক্ষাজীবনে লাগে ধাক্কা। শিশুদের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন বিচারক মো. জাকির হোসেন। গতকাল দুপুরে তিনি একসঙ্গে ৫০ মামলায় ৭০ শিশু আসামিকে কারাগারে না পাঠিয়ে নতুন পথ দেখিয়েছেন। এসব শিশু কারাগারের বদলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থেকে সংশোধিত হবে। বিচারক তাঁর রায়ে বেশ কিছু নির্দেশনাও দিয়েছেন।

 

আদালত সূত্র জানিয়েছে, যেসব শর্তে শিশুদের পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে সেগুলো ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না তা আগামী এক বছর জেলা প্রবেশন কর্মকর্তা মো. শফিউর রহমান পর্যবেক্ষণ করবেন। প্রতি তিন মাস পর পর আদালতকে তিনি তদারকির তথ্য জানাবেন। আদালত যেসব শর্ত দিয়েছেন সেগুলো হলো—প্রতিদিন দুটি ভালো কাজ করে সেগুলো আদালতের দেওয়া ডায়েরিতে লিখে রাখা, বছর শেষে ডায়েরি আদালতে জমা দেওয়া, মা-বাবাসহ গুরুজনদের আদেশ মেনে চলা এবং তাঁদের সেবাযত্ন ও কাজে সাহায্য করা, নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও ধর্মকর্ম পালন করা, অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করা, মাদক থেকে দূরে থাকা, ভবিষ্যতে কোনো অপরাধের সঙ্গে নিজেকে না জড়ানোর বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য।

 

দিরাই উপজেলার রাজনগর গ্রামের

ইউসুফ আলী (৪০) নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘গ্রাম্য সংঘর্ষের এক মামলায় আমার স্কুলপড়ুয়া চার ভাতিজা আসামি ছিল। তাদেরকেও পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। এটি একটি বিরল রায়। আদালতের সব নির্দেশনা যাতে তারা মেনে চলতে পারে সে ব্যাপারে আমরা সজাগ থাকব।’

 

সুনামগঞ্জ নারী ও শিশু আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর নান্টু রায় বলেন, আদালতের নির্দেশনাগুলো শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে। শিশুরা তাদের আপন ঠিকানায় ফিরে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হবে। মা-বাবার দুশ্চিন্তারও অবসান ঘটবে। জেলা প্রবেশন কর্মকর্তা মো. শফিউর রহমান বলেন, ‘আদালত আমাদেরকে প্রবেশনের রায় কার্যকর হচ্ছে কি না তা নিয়মিত জানাতে নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা আদালতের নির্দেশ যথাযতভাবে পালন করব।’