আজ ২রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৫ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

Prothombarta News 019524707

আশার আলোর নতুন বছর ২০২১

প্রথমবার্তা প্রতিবেদক:  ২০২০ সাল। দুঃসময়ের এই বছরকে সবাই ভুলে যেতে চাইবে। আশার আলোর পথ ধরে আজ যে এসে গেছে নতুন বছর ২০২১। কিন্তু অতীতের সব কিছু ভুললে কি চলে, নাকি মুছে ফেলা যায়! জীবন থেকে মৃত্যু, অর্থনীতি থেকে সংস্কৃতি, শিক্ষাঙ্গন থেকে বিচারাঙ্গন—সব ক্ষেত্রেই সময়টা মহাবিপর্যয়ের সন্ধিক্ষণ। এক নজিরবিহীন সময়বলয় ধরে এগিয়ে চলেছে মানুষ।

 

পুরনো আর নতুনকে যেন এক করে ফেলছে করোনাকাল। বিশেষ করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা গুনতে গুনতেই শেষ হলো বছরের শেষ রাত। আর শুরু হলো আরেক বছরের প্রথম ভোর। বাংলাদেশের মতো বিশ্বজুড়ে হাসপাতালের বিছানায়, মৃত্যুশয্যায়, লাইফ সাপোর্টে কিংবা অক্সিজেন সাপোর্ট নিয়ে কেটেছে হাজারো মানুষের বছরের শেষরাত। হাজারো মানুষ হয়তো বছরের প্রথম দিনের নতুন সূর্যও আর দেখতে পাননি। স্বজনদের কান্না-আহাজারিতেই ভোরের আলো ফুটল।

 

এমন জগদ্দল বাস্তবতায় বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন বছরে পা ফেলতে হলো বিশ্বকে, বাংলাদেশকেও। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বদলে যাওয়া পৃথিবীর তাবৎ মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থ-বাণিজ্য, জীবন-জীবিকা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য—সব কিছু স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে আনতে নতুন বছরটিকে পার করতে হবে বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে। এর প্রধান ধাপটিই হচ্ছে করোনাভাইরাসকে মোকাবেলা করা। কতটা দ্রুত, কতটা সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খলভাবে করোনা সংক্রমণ ঠেকিয়ে দেওয়া যাবে, কত দ্রুত মানুষকে নিরাপদ অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যাবে তার ওপরই নির্ভর করছে মানুষের জীবনযাত্রার অন্য সব অনুষঙ্গ স্বাভাবিক করে তোলার বিষয়টি।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় যত দ্রুত দেশে করোনার টিকা আনা যাবে, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খলভাবে প্রয়োগ করা যাবে এবং মানুষের শরীরে সেটা কার্যকর হবে, ততই দ্রুত মানুষের জীবন-জীবিকা, শিক্ষা, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। এই কাজগুলো যদি সঠিকভাবে করা না যায় তাহলে নতুন বছরেও নিরাপদ জীবন অধরাই থেকে যেতে পারে। থাকতে হতে পারে অনিশ্চিত অপেক্ষায়।

 

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী, বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. রুহুল হক প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘নতুন বছরে সামগ্রিকভাবে আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলা করা। এ জন্য সবার আগে প্রয়োজন যেকোনো মূল্যে সংক্রমণ ঠেকানো। তাহলে আর প্রতিদিন করোনায় আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা গুনতে হবে না, দুর্বিষহ খবর শুনতে হবে না।’ তিনি বলেন, এই মুহূর্তে বড় অপেক্ষা হচ্ছে, কবে দেশে টিকা আসবে আর কবে মানুষকে টিকা দেওয়া শুরু করা যাবে তার জন্য। টিকা আসার পর যাতে প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো বিশৃঙ্খলা না ঘটে, মানুষের মধ্যে যাতে কোনো রকম অসন্তোষ না হয়, তালিকা যেন সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও সতর্কতার মাধ্যমে হয়—সেগুলো নিশ্চিত করতে হবে।

 

ডা. রুহুল হক বলেন, ‘শুধু টিকা দিলেই হবে না, আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, টিকা দেওয়ার পরও সবাইকেই সুরক্ষামূলক স্বাস্থ্যবিধি পরিপূর্ণভাবে মেনে চলতে হবে। কারণ টিকা দেওয়ার পরও অনেক ধরনের অনিশ্চয়তা থাকতে পারে।’

 

করোনা মোকাবেলায় সরকার গঠিত জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন বছরে রাষ্ট্রীয় বা সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তিপর্যায়েও অনেক চ্যালেঞ্জ থাকছে করোনা মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। সবাইকেই সমানভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। যাঁরা এখনো অবহেলা করছেন, তাঁরা কিন্তু বড় ভুল করছেন। যেন আমরা সবাই এই ভুল থেকে বের হয়ে আসতে পারি সেটাই হওয়া উচিত নতুন বছরের প্রত্যয়।’

 

করোনা মহামারির প্রভাবে অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও আরো চ্যালেঞ্জ আসতে পারে সামনের দিনগুলোতে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘নতুন বছরে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমটি হলো, আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অনেক কমে গেছে। এটাকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। আমাদের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, করোনার ধাক্কায় অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। এতে দেশে দরিদ্রের হার বেড়ে গেছে। এটা কমানো একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। তৃতীয়ত, আমাদের আয়বৈষম্য বেড়েছে। এটা দূর করা না গেলেও নতুন বছরে কমাতে হবে। চতুর্থত, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলো অবদান রাখে। অথচ প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে এরা বঞ্চিত। এরা যাতে সঠিকভাবে প্রণোদনা পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। পঞ্চমত, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে যে বরাদ্দ ছিল তা যথাযথ বিতরণ করতে হবে।’

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথমবার্তাকে বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে পোশাক রপ্তানিতে সমস্যা হচ্ছে। এটি কাটিয়ে উঠতে হবে। রেমিট্যান্সও দ্বিতীয় ঢেউয়ে কমতে পারে। তিনি বলেন, নতুন বছরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা। এটি আগের মতোই রয়ে গেছে। এখনো এখানে বাইরের হস্তক্ষেপ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের শক্ত অবস্থান প্রয়োজন। নতুন বছরে দুর্নীতি ও ব্যয়নীতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

 

বিশ্ব ব্যাংকের ‘লুজিং লাইভলিহুড: দ্য লেবার মার্কেট ইমপ্যাক্টস অব কভিড-১৯ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে করোনাকালে ঢাকায় ৭৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫৯ শতাংশ চাকরিজীবী কাজ হারিয়েছে। বস্তিবাসীদের মধ্যে চাকরি হারিয়েছে ৭১ শতাংশ। আর অন্য এলাকায় হারিয়েছে ৬১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন বছরে সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। পাশাপাশি পুরনো যারা চাকরি হারিয়েছে তাদের আবার কাজে ফিরিয়ে আনা।

 

করোনার কারণে ১০ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই সময়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে শিক্ষাসূচি। বছরের চারটি বড় পরীক্ষার মধ্যে তিনটিই নেওয়া সম্ভব হয়নি; এমনকি স্কুলগুলোতে হয়নি বার্ষিক পরীক্ষা। ফলে শুধু গত শিক্ষাবর্ষই নয়, নতুন শিক্ষাবর্ষও পড়েছে হুমকির মুখে; যা উত্তরণে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে শিক্ষা খাতকে।

 

শিক্ষাবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক শিক্ষার্থীই গত এক বছর পড়ার টেবিলে ঠিকমতো বসেনি। তাদের ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এতে ঝরে পড়ার হারও বাড়তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও বড় সেশনজটে পড়তে হবে। করোনাকালে সবচেয়ে দুরবস্থায় দিন পার করছে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান প্রথমবার্তাকে বলেন, শিক্ষার্থীরা গত বছর ঠিকমতো পড়ালেখা করতে না পারলেও ঠিকই পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। এতে তাদের শিখনফলে ঘাটতি থেকে গেল। পরবর্তী ক্লাসের পড়ায় তাদের সমস্যা হবে। শিক্ষকদেরও পড়ালেখা করাতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হবে।