আজ ১০ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ইসি পুনর্গঠন ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরব রাজনৈতিক অঙ্গন
ইসি পুনর্গঠন ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরব রাজনৈতিক অঙ্গন

ইসি পুনর্গঠন ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরব রাজনৈতিক অঙ্গন

প্রথমবার্তা প্রতিবেদকঃ পাঁচ মাস পর আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠিত হতে যাচ্ছে। আর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে বাকি এখনো দুই বছরের বেশি। ২০২৩ সালের শেষ দিকে এ নির্বাচন হতে পারে। এরই মধ্যে এ দুই ইস্যুতে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। কোন প্রক্রিয়ায় কাদের নিয়ে নতুন ইসি গঠন হবে এবং আগামী জাতীয় নির্বাচন কেমন হবে সেটা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন সরব।

 

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা এখনো রাষ্ট্রপতি গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে ইসি পুনর্গঠন খুবই গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি বলে মনে করছেন। একই সঙ্গে সংবিধান অনুসারে এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের বিষয়টিও তাঁদের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। তবে আগামী নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের আগে এ আইন প্রণয়নের সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে বিএনপি নেতারা বর্তমান সরকার ও সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন হবে, সে আস্থা রাখতে পারছেন না।

 

আর সুধীসমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ইসি পুনর্গঠন ও পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, এর সুফল নির্ভর করছে সরকার এসব আলোচনাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে তার ওপর। এ ছাড়া কোনো বিষয়ে জনমত যদি জোরদার না হয়, শক্তিশালী কোনো আন্দোলন যদি গড়ে না ওঠে, তাহলে সে বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দেবে এমন আশাও দুরাশা।

 

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়ন ও বর্তমান পদ্ধতিতে সার্চ কমিটির মাধ্যমে ইসি পুনর্গঠন—এ দুটিই আওয়ামী লীগের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। আইনি কাঠামো তৈরি হওয়ার তাগিদ ও বিবেচনাবোধ সরকারের মাথায় রয়েছে।’

 

দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর পদ্ধতি হলো সার্চ কমিটির মাধ্যমে ইসি গঠন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি সব রাজনৈতিক দলের মতামত নিয়ে এই কমিশন গঠন করেন। স্থায়ী একটি পদ্ধতিও চায় আওয়ামী লীগ।’

 

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনপ্রথমবার্তাকে বলেন, ‘অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারার মতো একটি কমিশন গঠনে আওয়ামী লীগ আন্তরিক। আশা করছি, বিদ্যমান আইনি কাঠামোতেই একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে।’

 

দলটির দপ্তর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে উদারতা দেখিয়েছেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কেউ দেখায়নি। বর্তমানে সার্চ কমিটির মাধ্যমে যেভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন হয় তা খুবই গ্রহণযোগ্য একটি পদ্ধতি।’

 

এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠনে সরকার আইন করলে এবং মতামতের সুযোগ দেওয়া হলে দলটি তাতে অবদান রাখবে। সরকার চাইলে বা ওই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে বিএনপি লিখিত মতামত দেবে। সরকার যদি একতরফাভাবে সব কিছু করে অথবা আগের মতো সার্চ কমিটি করার পর নিজেদের পছন্দের লোক দিয়ে কমিশন গঠন করে, বিএনপি তাতে সায় দেবে না। এমন পরিস্থিতিতে দলটি সমমনা দলগুলোকে নিয়ে আন্দোলনে যাবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন গঠন হবে তখনই যখন সত্যিকার অর্থেই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন হতে পারে, সেই ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। আইন করা হবে বলা হচ্ছে। আইন করা হবে পার্লামেন্টে, যেখানে আর কেউ নেই। আওয়ামী লীগ নিজেদের সুবিধার জন্য একতরফা আইন পাস করলে সেটা দেশের মানুষ মেনে নেবে না।’ তিনি বলেন, নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে, সেই নির্বাচন হতে হবে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায়।

 

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘জনগণ একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন প্রত্যাশা করে। এ জন্য একটি নিরপেক্ষ সরকারও জরুরি। যে প্রক্রিয়ায় ইসি গঠন হয়, তাতে তারা সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের নির্বাচন কমিশন গঠন করতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা দলীয় ফোরামে আলোচনা করেছি। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়ে জনগণের সামনে তা উপস্থাপন করা হবে।’

 

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান প্রথমবার্তা কে বলেন, ‘নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়, তাহলে বিএনপি আলোচনায় অংশ নেবে। অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় গেলে বিএনপি আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করবে।’

 

দলের আরেক ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘যে নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা থাকবে, ভোটে মানুষের আস্থা থাকবে, সে ধরনের কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া হলে আমরা আলোচনায় বসব।’

 

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘সংবিধানসম্মত নির্বাচন সর্বদলীয় মতের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।’

 

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘পরবর্তী নির্বাচন কমিশন গঠন হয়তো আগের দুইবারের মতো রাষ্ট্রপতি গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমেই হবে। কারণ সংবিধান অনুসারে আইন তো এখনো তৈরি হয়নি। আইন হবে এমন নিশ্চয়তাও পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু আগের মতো নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলে আস্থার সংকট হবে। নির্বাচন কমিশন যথাযথভাবে ফাংশন করতে পারবে না। আগের দুই কমিশনের কার্যকলাপ মূল্যায়নে এ কথা বলা যায়।’

 

ড. সাখাওয়াত বলেন, সুষুম, অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নির্ভর করছে সরকারের ইচ্ছার ওপর। গতবার সরকার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চেয়েছিল। সেটা হয়েছে। কিন্তু রাতে ভোট হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ আছে। সরকারি দলের প্রতিপক্ষ প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে দাঁড়াতে পারেননি। ওই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের যে ধরনের ভূমিকা থাকার প্রয়োজন ছিল, তা পালিত হয়নি। নির্বাচনের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। শুধু নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। সরকারের অ্যাটিট্যুডই বলে দেয় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কি হবে না। এসব নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকবে কি থাকবে না সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে এবারও আগের দুইবারের মতো করেই নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন হবে। আমরা দেশের ৪২ জন নাগরিক বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে তাদের অপসারণের দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের এই দাবি আজও আমলে নেওয়া হয়নি। সে ক্ষেত্রে আস্থা রাখা যায়, এমন লোকজনকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে তা আশা করতে পারছি না।’ তিনি বলেন, অনেকের দাবি সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইন প্রণয়ন করে সে আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হোক। সরকার এ দাবি মেনে নিলে আইনটি এমনভাবে করা দরকার, যাতে এর মাধ্যমে সৎ, নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচন কমিশনে আসতে পারেন। ওই আইন অনুসারে সার্চ কমিটি করা হলে সে কমিটির মাধ্যমে বেশি নাম সুপারিশের সুযোগ রাখা ঠিক হবে না। তাহলে ক্ষমতাসীনরা তাদের পছন্দের লোকজনকে বেছে নিতে পারবে। আর সার্চ কমিটি প্রস্তাবিত নামের তালিকা আগেই প্রকাশ করতে হবে। এটা হলে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে জনগণ তাদের মতামত জানানোর সুযোগ পাবে।

 

হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ‘সব কিছু নির্ভর করছে নিয়তের ওপর। নিয়ত যদি ভালো হয় তাহলে কোনো সমস্যা থাকে না।’