আজ ৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ইহুদি

ইহুদি পরিবার থেকে আসা মুসলিম কিংবদন্তি

প্রথমবার্তা প্রতিবেদকঃ মুহাম্মদ আসাদ ২ জুলাই ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে তত্কালীন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির লেম্বার্গে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল লিওপোল্ড ওয়াসিস। পারিবারিকভাবে তাঁরা ছিলেন ইহুদি ধর্ম যাজক। মুহাম্মদ আসাদ পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে ২২ বছর বয়সে মধ্যপ্রাচ্য সফর করেন।

 

ইসলাম গ্রহণের পর তিনি মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণে কাজ করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি পশ্চিম পাঞ্জাবের ‘দ্য ডিপার্টমেন্ট অব ইসলামিক রিকনাস্ট্রাকশন’-এর পরিচালক নিযুক্ত হন এবং জাতিসংঘে পাকিস্তানের বিকল্প প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

 

মক্কার পথ, সংঘাতের মুখে ইসলাম ও কোরআনের বার্তা তাঁর বইগুলোর মধ্যে বিখ্যাত। মুহাম্মদ আসাদকে ইউরোপে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম পণ্ডিত মনে করা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ তিনি স্পেনের গ্রানাডার মিজাসে ইন্তেকাল করেন।

 

১৯২২ সালে আমি ইউরোপের শীর্ষ কয়েকটি পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে জন্মভূমি অস্ট্রিয়া ছেড়ে এশিয়া ও আফ্রিকার উদ্দেশে বের হয়েছিলাম এবং পুরো বছরটাই মুসলিম প্রাচ্যে কাটিয়েছিলাম। এ সময় বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর সঙ্গে একজন বহিরাগত হিসেবেই আমার যোগাযোগ হয়েছিল।

 

আমি তাদের সামাজিক শৃঙ্খলা এবং জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনা করি, যেখানে ইউরোপীয়দের সঙ্গে তাদের মৌলিক পার্থক্য ছিল। তাদের দেখে ইউরোপের নিথর জীবন; বরং আমার বলা উচিত ইউরোপের যান্ত্রিক জীবনের জন্য সহানুভূতি জাগল। এই সহানুভূতিই আমাকে দুই সমাজব্যবস্থার পার্থক্য খতিয়ে দেখতে উদ্বুদ্ধ করল এবং মুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলল।

 

আমার মনের ভেতর যখন বহুবিদ প্রশ্ন কাজ করছে, তখন আগ্রহটা ইসলামের সঙ্গে জীবন কাটানোর মতো শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু তা আমার সামনে সত্যিকার ভ্রাতৃত্ববোধ এবং অগ্রসর মানবসমাজ গঠনের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছিল।

 

বাস্তবতা হলো, ইসলাম মানবজাতিকে যে উন্নত জীবনের শিক্ষা দিয়েছে তা থেকে বর্তমান মুসলিম বহুদূরে। ইসলাম একটি উন্নয়ন প্রত্যাশী ও বৈপ্লবিক ধর্ম; কিন্তু মুসলিমরা স্থবিরতা বেছে নিয়েছে, ইসলাম শেখায় উদারতা ও উন্নয়নে তৎপর হতে, অন্যদিকে মুসলিমরা সংকীর্ণ ও সাধারণ জীবনে সন্তুষ্ট। এই অসঙ্গতি আমাকে বিস্মিত করে।

 

আমি সমস্যার আরো গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করি, নিজেকে মুসলিম সমাজের একজন বিবেচনা করেই তা করতে থাকি। এটা ছিল সম্পূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজ্ঞতা এবং খুব অল্প সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে ছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম মুসলিম সমাজের বর্তমান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের কারণ তারা ধীরে ধীরে ইসলামের আধ্যাত্মিক শিক্ষার অনুশীলন বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে তারা পরিণত হয়েছে আত্মাহীন দেহে।

 

ইসলামের শিক্ষা এতটা সুদৃঢ় ও প্রায়োগিক হওয়ার পরও মুসলিমরা কেন তার পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ ছেড়ে দিয়েছে তা বোঝার চেষ্টা করি। এই প্রশ্নটি নিয়ে আমি লিবিয়ার মরুভূমি থেকে পামির মালভূমি এবং বসফরাস থেকে আরব সাগরের মধ্যবর্তী বহু চিন্তাশীল মুসলিমকে জিজ্ঞাসা করেছি। আর এটা আমার একটি আবেশে পরিণত হয়েছিল, যা মুসলিম বিশ্ব নিয়ে আমার সব বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রহকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। প্রশ্নটি ক্রমেই আমার ভেতর জোরালো হয়ে উঠছিল। এমনকি একজন অমুসলিম হয়ে আমি মুসলিমদের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছিলাম, যেন আমি তাদের অবহেলা থেকে ইসলামকে রক্ষা করতে চাইছি। অথচ অগ্রগতি ছিল দুঃসাধ্য।

 

১৯২৫ সালের শরৎকালে আফগানিস্তানের একজন তরুণ গভর্নর আমাকে বললেন, ‘আপনি একজন মুসলিম; কিন্তু আপনি নিজেকে চেনেন না।’ তাঁর কথাগুলো আমাকে দারুণভাবে নাড়া দেয়। ১৯২৬ সালে আমি ইউরোপে ফিরে আসার পর বুঝতে পারি, আমার মানসিক অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে ইসলাম গ্রহণ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

‘ইসলাম আওয়ার চয়েজ’ বই থেকে

আতাউর রহমান খসরুর ভাষান্তর।