আজ ২৭শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১০ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

উল্টো

উল্টো পথই এদের পথ!

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর আগে বেশ আলোচনায় এসেছিল রাজধানী ঢাকায় উল্টো পথের গাড়ির বিরুদ্ধে চলা অভিযান। বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ আটকে দিয়েছিল আইন ভেঙে চলা মন্ত্রী, এমপি, বিচারক, আমলা, রাজনীতিবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমের কর্মীসহ অনেকের গাড়ি।

 

এর ফলে কমেছিল উল্টো পথে গাড়ি চালানোর প্রবণতা। তবে এখন পরিস্থিতি আগের চেয়েও ভয়াবহ। গত দুই দিন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি সড়কে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে ইচ্ছামতো উল্টো পথে গাড়ি চলাচল করছে।

 

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে শ্যামলী বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাওয়ার পথে মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে চোখে পড়ে তিনটি রিকশা ও দুটি মোটরসাইকেলের উল্টো পথে চলার দৃশ্য।

 

শ্যামলী থেকে কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে রাস্তা পার হতে ইউ টার্ন নিতে যেতে হয় বেশ কিছু দূরের টেকনিক্যাল মোড়ের কাছ দিয়ে। এত দূর ঘুরে আসতে হয় বলে অনেকের উল্টো পথে গাড়ি নিয়ে আসার প্রবণতা বাড়ছে বলে জানান কল্যাণপুরের বাসিন্দা আবীর রহমান।

 

তিনি বলেন, ‘রাতে যখন এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করি তখন প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও রিকশা সবই উল্টো পথে যাতায়াত করে। ফলে আমি সঠিক লেনে থাকলেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাড়িগুলো চলেও বেপরোয়া গতিতে।’

 

প্রায় একই চিত্র দেখা যায় রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় গিয়েও। একমুখী চলাচলের এই চক্রাকার পথে অহরহই চলছে উল্টো পথে গাড়ি। মহানগর ব্রিজ পার হয়ে প্রায়ই প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলগুলো মহানগর মূল গেট দিয়ে না ঢুকে বরং মহানগর ৩ নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশ করে। ফলে এই পথে গাড়িগুলো চলে উল্টো পথে।

 

উল্টো পথে চলতে দেখা যায় পুলিশের গাড়িও। গত সোমবার দুপুরে বিজয় সরণির সিগন্যালে দেখা গেল, একটি পুলিশ কাভার্ড ভ্যান ফার্মগেটের দিক থেকে উল্টো পথে আসছে। এর সঙ্গে মোটরসাইকেল, বাইসাইকেলও।

 

বিজয় সরণি সিগন্যাল থেকে তেজগাঁও ব্রিজের দিকে যেতে এক চায়ের দোকানি বলেন, ‘হুন্ডাগুলা হরহামেশাই উল্ডা পতে যায়। তয় রাত্তিরে বেশি যায়, দিনে কম।’ রাজধানীর রামপুরা এলাকায় ভেতরে রোগী নেই এমন অ্যাম্বুল্যান্সকেও সাইরেন বাজিয়ে উল্টো পথে যাতায়াত করতে দেখা গেছে।

 

এ বিষয়ে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘প্রথমত, উল্টো পথে গাড়ি আসার কারণে সড়কে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়।

 

দ্বিতীয়ত, এটা সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে মহাসড়কে যখন বিপরীত দিক থেকে গাড়ি চলে আসে তখন সঠিক লেনের গাড়িগুলো তার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, ফলে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

 

আবার অনেক সময় দেখা যায়, পথচারী যেদিক থেকে গাড়ি আসে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। ফলে উল্টো দিক থেকে গাড়ি এলে পথচারী কনফিউশনে পড়ে যায় এবং দুর্ঘটনা ঘটে।’

 

কিভাবে উল্টো পথে গাড়ি আসা রোধ করা সম্ভব—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উল্টো পথে গাড়ি আসছে কি না, সেটা মনিটরিং সব সময় করতে হবে এবং কেউ উল্টো পথে এলেই তাকে সরাসরি আইনের আওতায় আনতে হবে।

 

গত সোমবার রাজধানীর কাকরাইল, মিন্টো রোড, শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণি, বাড্ডা ও রামপুরা এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে উল্টো পথেও প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল ও রিকশা চলছে। কোথাও কোথাও ট্রাফিক পুলিশ চেষ্টা করেও গাড়িচালকদের সঠিক পথে আনতে পারছেন না।

 

কাকরাইল এলাকায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ নিখিল দাশ বলেন, ‘আমরা প্রায়ই তাদের (উল্টো পথে গাড়ি) আটকিয়ে শাস্তি দিই এবং জরিমানা করি। তার পরও তারা মানছে না। অনেক সময় দ্রুতগতিতে গাড়ি টান দেওয়ায় তাদের আটকাতেও চেষ্টা করি না দুর্ঘটনার ভয়ে। এসব কারণে আমাদের বিভিন্ন সময় বিপাকে পড়তে হয়।’

 

এর আগে দুপুর দেড়টার দিকে মিন্টো রোড এলাকায় পুলিশ বক্সের সামনের সড়কে দেখা গেছে, উল্টো পথে দেদার সাইকেল ও রিকশা চলছে। অনেক সময় ঠিক পথে থাকলেও জ্যাম লাগলে কিছু আরোহী বাইসাইকেল কাঁধে উঠিয়ে রাস্তার অন্য পাশে গিয়ে উল্টো পথে চলে যাচ্ছে।

 

আর মোটরসাইকেলের চালকরা সিগন্যাল কম মানছে। নির্দিষ্ট সিগন্যালে এলে তারা যেন অপেক্ষা করতেই চায় না। অনেক সময় খালি অ্যাম্বুল্যান্সও মানবিকতার সুযোগ নিয়ে ট্রাফিক আইন অমান্য করছে।

 

মিন্টো রোডে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য গাজীউর ও তালেব বলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করেও কিছু সাইকেল ও মোটরসাইকেলকে নির্দিষ্ট পথে আনতে পারছি না।

 

আমরা দিন-রাত চেষ্টা করছি তাদের নির্দিষ্ট লাইনে ফেরাতে।অনেক সময় প্রাইভেট কারও উল্টো পথে চলে যাচ্ছে। এসব একটা ঘটনার পেছনে ছুটতে গেলে অন্যদিকে আমাদের একটু অনুপস্থিতিতে দশটা ঘটনা ঘটে যাবে।

 

তাই সচেতন মানুষ হিসেবে সবার স্বার্থেই ট্রাফিক আইন মেনে উল্টো পথে গাড়ি না চালানো উচিত। এ ছাড়া ঊর্ধ্বতন স্যারদের নিষেধ আছে, কারো সঙ্গে এ নিয়ে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। তাদের বুঝিয়ে লাইনে ফেরাতে হবে।’

 

গতকাল রাজধানীর শাহবাগ, জিগাতলা, ধানমণ্ডি, গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া ও পল্টন এলাকায়ও উল্টো পথে গাড়ি চলতে দেখা গেছে। গুলিস্তান মোড় থেকে ফুলবাড়িয়ার দিকে উল্টো পথে যেতে দেখা গেল একটি মোটরসাইকেলকে।

 

কিছু দূর গিয়েই আটকে গেল। তার জন্যই জটলা বেঁধে গেল আরো কয়েকটি বাসের। সেই জটলা কাটিয়ে উল্টো পথে আসার কারণ জানতে চাইলে এর চালক জানান, তাঁর জন্য এক যাত্রী অপেক্ষা করছেন ফুলবাড়িয়া মার্কেটের সামনে, কয়েক কদমের রাস্তার জন্য পুরাটা ঘুরে আসতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে।

 

ফুলবাড়িয়ার বিআরটিসি মার্কেটের কোনায় গতকাল বিকেলে দাঁড়িয়ে আধাঘণ্টার মধ্যে দেখা গেল, উল্টো পথে চলছে অন্তত ১০টি মোটরসাইকেল। গুলিস্তানে ট্রাফিকের দায়িত্বে ছিলেন সার্জেন্ট মো. মোকাররম হোসেন।

 

তিনি প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ বাস্তবায়নের পর সব ধরনের অপরাধের জরিমানা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এখন উল্টো পথে যাওয়ার ঘটনা আগের থেকে অনেক কম ঘটে। তবু কেউ উল্টো পথে গাড়ি চালালে আমরা জরিমানা করছি, দ্বিতীয়বারের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হারে জরিমানা করছি।’

 

প্রতিদিন কতসংখ্যক গাড়িকে উল্টো পথে যাওয়ার জন্য জরিমানা করা হয়, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটার কোনো ঠিক নেই, কোনো দিন পাঁচ-ছয়টাও হয় আবার কোনো দিন বেশিও হয়। তবে জরিমানা করার বিষয়টা সকালের দিকে বেশি হয়ে থাকে।

 

এদিকে ধানমণ্ডির রাসেল স্কয়ারসহ অন্য প্রধান সড়কেও উল্টো পথে গাড়ি চলতে দেখা গেছে। প্রায় প্রতিটি গলি থেকে প্রধান সড়কে সবাই উঠছে উল্টো পথে। তাদের দু-একজন জানাল, প্রধান সড়কে ওঠার জন্য কিছুটা উল্টো পথ ব্যবহার করলে শর্টকাটে মূল রাস্তায় পৌঁছানো যায়।

 

শুধু মোটরসাইকেলই নয়, মাঝেমধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি ও রিকশাও চলছে উল্টো পথে। রিকশাচালক রহিম মিয়া বলেন, ‘আমি সব সময় উল্টা রাস্তায় যাই না। তবে মাঝে মাঝে জ্যাম থাকলে যাই।’ আরেক রিকশাচালক জানান, রাস্তা কাটা ও ভাঙা থাকার কারণেই কিছুটা পথ উল্টো যেতে হচ্ছে তাঁর।

 

নিউ মার্কেট থেকে গুলিস্তান পথে লেগুনা চালান রুবেল। তিনি হুট করেই বকশীবাজার এলাকায় উল্টো পথে গাড়ি চালানো শুরু করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পেছনের গেটের রাস্তায় আসতেই আবার নিজের সঠিক লেনে ফিরে যান।

 

তাঁর এমন উল্টো পথে যাওয়া-আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওদিকে বড় বাসের পিছে পইড়া থাকলে আইতে অনেক সময় লাগব। তাই উল্টা আইয়া লাইনে ঢুইকা গেলাম।

 

এদিকে আবার পুলিশ থাকে, ওদিকে তো থাকে না।’সড়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আবারও অভিযান জোরদার করতে হবে। ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

আইন ভঙ্গকারীদের পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে শাস্তি দিলে উল্টো পথে গাড়ি চলাচল কমে যাবে। এতে কমবে দুর্ঘটনা, কমবে যানজট। একই সঙ্গে ট্রাফিক আইন মানার জন্য গাড়িচালকদের সচেতনও করতে হবে।