আজ ৫ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৮ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

021813Zahid Malek kalerkantho pic

উৎসবের আমেজে গণটিকাদান শুরু

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:টিকা নিয়ে নানামুখী গুজব ও শঙ্কা পেছনে ফেলে গতকাল রবিবার থেকে সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে করোনাভাইরাসের গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রথম দিনই প্রধান বিচারপতিসহ ৫৫ জন বিচারপতি, সাবেক প্রধান বিচারপতি, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ ১০ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য, মেয়র, মাঠপ্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা টিকা নিয়েছেন। সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে সবচেয়ে বেশি টিকা নিয়েছেন চিকিৎসক, নার্স, অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীসহ মনোনীত অন্য পেশার ব্যক্তিরা। তাঁরা টিকা নিয়ে ভয়কে জয় করতে সবাইকে টিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রথম দিন রাজধানীসহ সারা দেশের সহস্রাধিক কেন্দ্রে মোট ৩১ হাজার ১৬০ জন নাগরিক টিকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৮৫৭ জন পুরুষ এবং সাত হাজার ৩০৩ জন নারী। ঢাকা মহানগরে টিকা নিয়েছেন পাঁচ হাজার ৭১ জন। ঢাকার ৪৭টি কেন্দ্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৬০ জন টিকা নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। যাঁরা টিকা নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ২১ জনের সামান্য উপসর্গ দেখা যাওয়া ছাড়া বড় কোনো সমস্যা হয়নি।

গত ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয়ভাবে দেশে করোনার টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। আর গতকাল সকাল ১০টায় ভার্চুয়ালি মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কনফারেন্স রুম থেকে ভার্চুয়ালি দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা সংসদ সদস্য, মেয়র, জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে টিকাদান কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিয়েও কথা বলেন। আনুষ্ঠানিভাবে সকাল ১০টায় শুরু হলেও কোথাও কোথাও সকাল ৮টা থেকেই টিকা দেওয়া শুরু হয়।

গতকাল দেশের মোট এক হাজার ১৫টি কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বুথ বা টিম প্রস্তুত ছিল দুই হাজার ৪০২টি। প্রতি বুথে ১৫০ জনের টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও অনেক কেন্দ্রের বেশির ভাগ বুথ ছিল ফাঁকা। ঢাকায় বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, কোনো কোনো বুথে ভিড় থাকলেও অন্য বুথের কর্মীরা ঘুরে-ফিরে বা বসে থেকে সময় কাটিয়েছেন। কেন্দ্রে কেন্দ্রে নিবন্ধনের তুলনায় উপস্থিতি ছিল কম। এসএমএসের মাধ্যমে ডাকাও হয়েছে কম। আজ সোমবারও একই পদ্ধতিতে চলবে টিকা দেওয়ার কাজ।

রাজধানীর মহাখালীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে গিয়ে একে একে টিকা নিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, বন ও পরিবেশ মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, স্বাচিপ সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান প্রমুখ। টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ আমাদের আনন্দের দিন। এই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। এই টিকা নিয়ে যেন কোনো রিউমার না হয়।’

দুপুরের পর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে টিকা নেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও তাঁর সহধর্মিণী। পরে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার স্ত্রী ও আমি টিকা নিয়েছি। আমার এ পর্যন্ত কোনো অসুবিধা হয়নি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগের আমিসহ সাত বিচারপতি এবং হাইকোর্ট বিভাগের ৪০ জন বিচারপতি টিকা নিয়েছেন। সুতরাং দেশবাসীকে বলব, সবাই যেন দ্রুত নিবন্ধন করেন। স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে সবার আগে দেওয়া হয়েছে, এটা প্রধানমন্ত্রীর বিশাল কৃতিত্ব।’ সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সুপ্রিম কোর্টের মোট ৫৫ জন বিচারপতি রবিবার টিকা নিয়েছেন।

এদিকে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে গিয়ে টিকা নেওয়ার পর আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেন, ‘এই টিকার অপেক্ষায় ছিলাম। টিকা দিতে পেরে স্বস্তি বোধ করছি।’ ৭৬ বছর বয়সী খায়রুল হক সবাইকে অভয় দিয়ে বলেন, ‘এই টিকা না দিলে নিজেরই ক্ষতি। সকলকে টিকা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

সকালে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে টিকাদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খান কামাল। এই কেন্দ্রেই টিকা নেন দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। প্রায় একই সময় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে টিকা নেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। আর রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন টিকা নিয়েছেন সচিবালয় ক্লিনিক ভবন কেন্দ্রে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে টিকা নিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘খুব ভালো আছি। ভয়ের কোনো কারণ নাই। দেশবাসীকে আহ্বান করছি, যার যখনই তারিখ আসবে, আপনারা এসে টিকা নেবেন। এটা আপনার কর্তব্য, জাতির কর্তব্য, দেশের কর্তব্য।’ একই কেন্দ্রে টিকা নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। এই কেন্দ্রের ১ নম্বর বুথে টিকা নিয়েছেন উচ্চ আদালতের বিচারপতিরা।

দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে টিকা নেন ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। টিকা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের সৌভাগ্য যে অতি সহজেই টিকা পেয়েছি। অতি সাধারণ জিনিস এটা (টিকা)। ছোটবেলায় এমন টিকা নেওয়ার অভ্যাস আমাদের সকলের আছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যারা টিকা নিয়ে সমালোচনা করছে, তা ভিত্তিহীন। আমি বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে দেখেছি, এটা নিরাপদ ভ্যাকসিন।’

এদিকে ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। এ সময় তাপস বলেন, ‘আমি সবাইকে অনুরোধ করব, যত শিগগির সম্ভব সবাই নির্ভয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিবন্ধিত হবেন এবং এই টিকা গ্রহণ করবেন। এর মাধ্যমেই করোনাভাইরাস থেকে আমরা মুক্তি অর্জন করব এবং করোনাকে আমরা জয় করব।’ সিএমএইচে টিকা নিয়েছেন সেনা, বিমান, নৌ ও পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা।

টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘টিকায় জয়, ভয় নয়—গুজব ছড়ালে ছাড় নয়। আমরা টিকা দিয়ে একসঙ্গে আনন্দঘন পরিবেশে প্রায় ৩০ মিনিট বসে কথা বললাম। আমাদের কারো শরীরেই কোনো রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। আমরা সবাই সুস্থ আছি। কাজেই দেশব্যাপী যে ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু করা হলো, তাতে দেশের সব শ্রেণির মানুষই ভ্যাকসিন নিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসবে বলে আশা করি।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী টিকা দেওয়ার জন্য চালু করা সুরক্ষা অ্যাপে নানা রকম সমস্যার বিষয়ে বলেন, ‘অ্যাপে সাময়িক কিছুটা সমস্যা হতেই পারে। এটি প্রথম প্রথম ব্যবহারে খানিকটা অসুবিধাও হতে পারে। সমস্যাগুলো সমাধানে আইসিটি মন্ত্রণালয় তৎপর রয়েছে। আশা করা যায়, খুব দ্রুতই এসংক্রান্ত সব সমস্যা সমাধান হবে। আর ধীরে ধীরে দেশের সব এলাকায় এই অ্যাপ কাজ করবে।’

এদিকে মন্ত্রীরা যখন টিকা নেন, তখন উপস্থিত বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসক, কর্মকর্তা, টেলিভিশন, প্রিন্ট ও অন্যান্য গণমাধ্যমের ক্যামেরাপারসনদের হুড়াহুড়িতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। টিকাদানকারী কর্মীরা বারবার ভিড় কমানো এবং দূরে সরার জন্য সবাইকে অনুরোধ করেও লাভ হয়নি। বরং এক ধরনের ঠেলাঠেলির মধ্যেই টিকা দিতে বাধ্য হন স্বাস্থ্যকর্মীরা।

ঢাকার অন্য কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা যায়, কোথাও বেশি ভিড়, কোথাও প্রায় ফাঁকা ফাঁকা অবস্থা। কোনো কোনো কেন্দ্রে আগে থেকে নিবন্ধন না করা কেউ কেউ তাৎক্ষণিকভাবে এসে নিবন্ধন করে টিকা দিয়েছেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভিড় এড়াতে পরিচালকের কক্ষে আলাদা ব্যবস্থাপনায়ও টিকা দিতে দেখা গেছে।

অন্যদিকে রাজধানীর সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে করোনার টিকা নেওয়ার জন্য উপচে পড়া ভিড় ছিল। আগে থেকে নিবন্ধন হওয়ার তালিকায় নাম নেই, এমন বহু মানুষ ফিরে গেছেন। এই হাসপাতালে নিবন্ধন করার কোনো ধরনের সুযোগ ছিল না।

হাসপাতালটির সহকারী পরিচালক ডা. আনোয়ারুল আজিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপাতত প্রতিদিন ৪০০ জনকে আমরা করোনার টিকা দিতে পারব। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে। যাঁরা ফিরে যাচ্ছেন তাঁরা মূলত আগে থেকে নিবন্ধিত ছিলেন না। এখানে আজকে নিবন্ধন করেও তো কোনো লাভ হবে না। আজ নিবন্ধ করলে আজই টিকা পাবেন, বিষয়টি এমন নয়। আমাদের এখানে ইতিমধ্যে এক হাজার জনের বেশি নিবন্ধিত হয়ে আছেন। ফলে আজ যাঁরা নিবন্ধন করবেন, তাঁরা আগামী দুই দিনেও সিরিয়াল পাবেন না।’

ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন টিকা দেওয়ার সক্ষমতা আছে ৩০০ জনের। তবে প্রথম দিনের জন্য এখানে নিবন্ধন করেন মাত্র ৫৪ জন, যাঁদের বেশির ভাগই এই হাসপাতালে কর্মরত। এই ৫৪ জনের মধ্যে দুপুর ১টা পর্যন্ত টিকা নেন ২৪ জন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভেনশন সেন্টারের আটটি বুথে (পুরনো শেরাটন হোটেলের উত্তর দিকে) ৫৬০ জন টিকা নিয়েছেন। এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি ১৯৯ জন টিকা নিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে এই সেন্টারে ৭৫৯ জন কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন বা টিকা নিলেন। এই কেন্দ্রে টিকাদান কর্মসূচির কার্যক্রম পরিদর্শন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া।

রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কেন্দ্রে টিকা নিতে আগ্রহীদের ভিড় দেখা গেছে। টিকা নিয়ে জিনাত আরা নাঈম নামের ষাটোর্ধ্ব এক নারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টিকা নিতে আমার কোনো সমস্যা হয়নি। নিজের ইচ্ছায় নিবন্ধনের পর টিকা নিয়েছি। আমি দেশের সবাইকে টিকা নিতে অনুরোধ জানাব। এতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।’ হাসপাতালটির সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. নন্দিতা পাল কালের কণ্ঠকে বলেন, সকাল থেকে সুন্দর পরিবেশে সবাই নিজের ইচ্ছায় টিকা নিচ্ছেন।

বাংলাদেশে দেওয়া হচ্ছে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের টিকা। সবাইকে এই টিকার দুই ডোজ নিতে হবে।