আজ ২৮শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১১ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

024716cop kalerkantho pic25 1

এত দিন সামরিক বাহিনীর মুখোশ ছিলেন সু চি

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:‘আক্ষরিক অর্থেই জাতিগত নিধনযজ্ঞ’, ‘জেনোসাইড’, ‘গণহত্যা’, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’, ‘যুদ্ধাপরাধ’—গুরুতর এসব আন্তর্জাতিক অপরাধের সবই রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত হয়েছে গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির সরকারের আমলে। গত সোমবার সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে কালের কণ্ঠকে এ কথা বলেছেন কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) সভাপতি মুহিব উল্লাহ। ২০১৯ সালে হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এই রোহিঙ্গা নেতার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান।

মিয়ানমারে আবারও সামরিক বাহিনী ক্ষমতা কেড়ে নিল। এখন কী হবে?

মুহিব উল্লাহ : মিয়ানমারের রাষ্ট্রক্ষমতায় সামরিক বাহিনী মোটেও নতুন নয়। অং সান সু চির বেসামরিক সরকারে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সামরিক বাহিনীর লোকজন ছিলেন। মিয়ানমারের সংবিধানে সামরিক বাহিনীকে অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সু চির আমলে একটি দ্বৈত ব্যবস্থা ছিল। সামনে সু চি। তিনি বেসামরিক সরকারের প্রধান। আসলে তিনি ছিলেন সামরিক বাহিনীর মুখোশ। কারণ ক্ষমতাচর্চার স্থানগুলোতে ছিল সামরিক বাহিনী। সু চি হয়তো কিছু সংস্কার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সামরিক বাহিনীর প্রভাববলয়ের বাইরে যেতে পারেননি। এখন মিয়ানমারে কী হবে, তা বলা বেশ কঠিন। সম্ভবত সামরিক বাহিনী আবারও সব কিছু নতুন করে তাদের মনমতো সাজাবে।

কালের কণ্ঠ : সু চির সরকারের আমলে তো রোহিঙ্গারা চরমভাবে নির্যাতিত হলো। গণতন্ত্রপন্থী একজন নেত্রী, যিনি অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। তাঁর কাছ থেকে এটি কি প্রত্যাশিত ছিল?

মুহিব উল্লাহ : মোটেও না। সু চি আর সামরিক বাহিনী এক হয়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে তাড়াতে কাজ করছে। যখন রোহিঙ্গারা নির্যাতিত হয়ে মারা যাচ্ছিল, গ্রামের পর গ্রাম পুড়ছিল, প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছিল, তখন সু চি রোহিঙ্গাদের পক্ষে একটি কথাও বলেননি। পরে তিনি আবার মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পক্ষ নিয়ে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) গিয়ে মামলা লড়েছেন। এমনটি আদৌ কেউ ধারণা করতে পারে!

: যে সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে, তারাই এখন ক্ষমতায়। প্রত্যাবাসনের ওপর এর কি প্রভাব পড়বে?

মুহিব উল্লাহ : সমস্যার সমাধান মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে। তারা চাইলে এক মাস বা এক সপ্তাহের মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এত দিন যে মিয়ানমারে দ্বৈত ব্যবস্থা ছিল, সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা নেওয়ার ফলে এখন তারাই সর্বেসর্বা। সেদিক বিবেচনায় নিলে এখন প্রত্যাবাসনের জন্য সামরিক বাহিনী বা তাদের নিয়োগ করা মন্ত্রী বা প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা হবে। আমি আবার বলব, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী সদিচ্ছা দেখালেই এ সংকট সমাধান সম্ভব।

মিয়ানমার যদি এখন প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায়, তাহলে কি রোহিঙ্গারা ফিরে যাওয়া শুরু করবে?

মুহিব উল্লাহ : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য আমাদের মাতৃভূমি। আমরা সেখানেই ফিরে যেতে চাই। আমাদের নাগরিকত্ব প্রদানসহ অধিকারগুলো ফিরিয়ে দিতে হবে। আমাদের ওপর যে নিপীড়ন করা হয়েছে, তার বিচার হতে হবে। আমরা আমাদের দাবিগুলো বিভিন্ন সময় জানিয়েছি। মিয়ানমারও এ বিষয়ে অবগত। আমি আবারও বলব, আমরা মিয়ানমারে নাগরিক ও মানুষের মর্যাদা নিয়েই ফিরতে চাই। নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে মানবেতর জীবন যাপন করতে চাই না।

সু চির এই পরিণতির বিষয়ে রোহিঙ্গাদের প্রতিক্রিয়া কী?

মুহিব উল্লাহ : মিয়ানমারে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে রাখাইন রাজ্যে অবস্থানরত স্বজনদের নিয়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের অনেকেরই উদ্বেগ আছে। সু চির সরকারের সময় আমাদের ওপর অনেক নিপীড়ন হয়েছে। এগুলো ঠেকানোর জন্য তিনি চেষ্টা করেননি। আমাদের পরিণতির জন্য আমরা দুঃখিত। সু চির পরিণতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। কারণ আমরা রোহিঙ্গারাও মানুষ। আমরা মানবিক। কারো অমঙ্গল কামনা করি না।