আজ ২৩শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৬ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

Screenshot 2020 1013 093318

করোনা, বন্যা, ঘুর্ণিঝড় দুশ্চিন্তা কাটছেই না নিম্ন আয়ের মানুষের

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: করোনাভাইরাসের ধাক্কায় দোকানপাট, শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাকরি হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। অনেক প্রতিষ্ঠান চাকরিচ্যুতি না ঘটালেও কমিয়েছে কর্মীদের বেতন। ফলে করোনার আগে মানুষের যে আয় ছিল, করোনার প্রভাবে সেই আয় কমে গেছে। আয় কমে যাওয়ায় শহর ছেড়ে গ্রামমুখী মানুষের স্রোতও দেখা গেছে গত কয়েক মাসে।

বেসরকারি দুটি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, করোনার প্রভাবে দেশের ৭০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের আয় কমে গেছে। আর সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জরিপে দেখা গেছে, করোনাকালে দেশে নতুন করে এক কোটি ৬৩ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। তথ্য বলছে, করোনার প্রভাবে মানুষের আয় কমলেও সে অনুপাতে ব্যয় কমেনি। বরং গত কয়েক মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে মানুষের জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে উঠেছে। খরচ কাটছাঁট করে কমে যাওয়া আয়ের মধ্যেই সংসার চালাতে হচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষকে।

সরকারি সংস্থা বিআইডিএসের তথ্য বলছে, একজন দরিদ্র মানুষ যদি ১০০ টাকা আয় করে, তার মধ্যে ৬০ টাকাই খরচ হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে। অন্যদিকে একজন ধনী ব্যক্তির ১০০ টাকা আয়ের মাত্র ২৫ টাকা খরচ হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে ধনীদের তুলনায় দরিদ্র মানুষই বিপাকে পড়ে বেশি। করোনার সময় পেঁয়াজের দাম সেঞ্চুরিতে গিয়ে ঠেকেছে। টানা ৪৩ দিনের দীর্ঘস্থায়ী বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় বেড়ে গেছে চালের দাম। মরিচের দাম উঠেছে ২০০ টাকায়। নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের ভরসা গণপরিবহন। করোনার সময় বেড়েছে গণপরিবহনের খরচ। ফলে বাসভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়েছে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের ওপর। করোনাকালীন বেড়েছে স্বাস্থ্য খরচও। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও প্রতি মাসে বেতন গুনতে হচ্ছে অভিভাবকদের। সারা দেশে বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিলের কারণে বাড়তি টাকা গুনতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে।

আবার করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে স্বাস্থ্যবিধি মানতেও খরচ বেড়েছে। বাড়িভাড়া গুনতে হচ্ছে আগের মতোই। মোটা চালের দাম কেজিতে বেড়েছে পাঁচ টাকা। যে পাস্তুরিত দুধের দাম ছিল ৬৫ টাকা, সেটি এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। এভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ প্রথমবার্তাকে বলেন, করোনার সময় মানুষের আয় ব্যাপক হারে কমে গেছে। কিন্তু আয় কমলেও সেই হারে ব্যয় কমেনি। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। অনেক গ্রামে চলে গেছেন। তার পরও বেঁচে থাকার তাগিদে অন্য কোনো উপায়ে সংসার চালিয়েছেন। পণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ।

করোনার সময় আয় কমে গেলেও খরচ যে ততটা কমেনি তা উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গত মাসের এক জরিপে। তাতে দেখা গেছে, করোনায় একটি খানায় (একসঙ্গে খাওয়া পরিবার) মাসিক আয় কমেছে তিন হাজার ৯৩৩ টাকা। করোনার আগে মার্চে একটি খানায় মাসিক আয় হতো ১৯ হাজার ৪২৫ টাকা। আগস্টে সেটি কমে হয়েছে ১৫ হাজার ৪৯২ টাকা। শতাংশের দিক থেকে আয় কমেছে ২০.২৪ শতাংশ। অন্যদিকে খানাভিত্তিক মাসিক ব্যয় কমেছে মাত্র এক হাজার ২৮৪ টাকা। করোনার আগে মার্চে একটি খানায় মাসিক ব্যয় ছিল ১৫ হাজার ৪০৩ টাকা। আগস্টে সেই খরচ কমে হয়েছে ১৪ হাজার ১১৯ টাকায়। শতাংশের দিক দিয়ে মাত্র ৬.১৪ শতাংশ। অর্থাৎ আয়ের তুলনায় ব্যয় তুলনামূলক বেশি হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন—নিম্ন আয়ের একজন মানুষ আয় কমে যাওয়ার পরও কিভাবে দৈনন্দিন খরচ মেটাচ্ছে। বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, ৪৬ শতাংশ খানা তাদের সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছে। আত্মীয় স্বজন থেকে সাহায্য নিয়ে চলছে ৪০ শতাংশ খানা। বেসরকারি ঋণ গ্রহণ করেছে ১৮ শতাংশ খানা। এভাবে কেউ সঞ্চয় ভেঙে, কেউ আত্মীয় স্বজন থেকে নিয়ে, কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসার পরিচালনা করছে। বিআইজিডি ও পিপিআরসির জরিপেও উঠে এসেছে, মানুষ আশানুরূপ সরকারি সহযোগিতা না পেলেও আত্মীয় স্বজন, বেসরকারি ঋণ ও সঞ্চয় ভেঙে সংসার পরিচালনা করছে। প্রবাস থেকে পাঠানো টাকাও বড় ধরনের সহযোগিতা করছে।

জানতে চাইলে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপসচিব এবং জরিপ পরিচালনার সমন্বয়কারী দিপঙ্কর রায় প্রথমবার্তাকে বলেন, ধরুন, কোনো কারণে আপনি অফিস থেকে বেতন পাননি, অর্থাৎ ওই মাসে আপনার আয় শূন্য। আপনি আয় করতে না পারলেও খরচ কিন্তু আপনার হচ্ছেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা থেকে শুরু করে বাসাভাড়া, চিকিৎসা খরচ এবং স্বাস্থ্য সেবায়ও আপনার টাকা খরচ হচ্ছে। এই টাকা আপনি যে কোনো উপায়ে জোগাড় করছেন। আমাদের জরিপে দেখা গেছে, একজন মানুষের আয় কমে গেলেও সেই তুলনায় ব্যয় ততটা কমেনি।

বিআইডিএসের তথ্য বলছে, করোনার আগে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ শতাংশ। করোনার পর দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৯ শতাংশ হয়েছে। সংখ্যায় যা এক কোটি ৬৩ লাখ। অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির গবেষণায় উঠে এসেছে, করোনায় দারিদ্র্যের হার ৩৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। করোনার সময় মানুষের আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেলেও তুলনামূলক মানুষের ব্যয় সেই হারে কমেনি।

বিবিএসের গত মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে ০.২৯ শতাংশ। আগস্টে যেখানে জাতীয় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫.৬৮ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে তা ৫.৯৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। প্রায় ৬ শতাংশ ছুঁই ছুঁই। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে বেশি। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬.০৮, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৬.৫০। গ্রাম ও শহর দুই জায়গায় খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার প্রবণতা বেশি। অর্থাৎ মানুষের আয় না বাড়লেও খরচ কমেনি। বরং বেড়েছে।