আজ ৩০শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৩ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

031032Zia kalerkantho pic

কোথাও ‘নেই’ জঙ্গি জিয়া

প্রথমবার্তা প্রতিবেদকঃ তিনি সব কিছুর আড়ালে। দেশে কোনো জঙ্গি হামলা হলেই সবার আগে উঠে আসে তাঁর নাম। ২০১৬ সালে গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হামলার পর তাঁকে ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকার পুরস্কারও ঘোষণা করে সরকার।

 

তবে কয়েক বছরে এই জঙ্গি নেতার অবস্থান জানাতে ব্যর্থ পুলিশের জঙ্গি দমন ও তদন্তে নিয়োজিত ইউনিটগুলো। তিনি জঙ্গি স্লিপার সেলের প্রধান সমন্বয়ক মেজর (বহিষ্কৃত) সৈয়দ মো. জিয়াউল হক জিয়া।

 

তাঁর নির্দেশেই দেশে হয়েছে এক ডজন হত্যা। সংশ্লিষ্ট তদন্তকারীদের দাবি, একসময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহ্রীর মতাদর্শী জিয়া পরে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) ও আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, ঢাকা ও ঢাকার উপকণ্ঠ, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজারের টেকনাফসহ বিভিন্ন স্থানে জিয়া অবস্থান করে স্লিপার সেলের সমন্বয় করেছেন। আদালত বারবার এই শীর্ষ জঙ্গির অবস্থান জানতে চাইছেন তদন্তকারীদের কাছে।

 

গত ১২ জানুয়ারি ব্লগার নীলাদ্রি নিলয় হত্যা মামলার একমাত্র পলাতক আসামি জিয়াকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় তাঁর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ধীমান চন্দ্র মণ্ডলের আদালত।

 

২০১৯ সালের ৫ মে লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায়ও জিয়ার সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন আলাদা আদালত। দেশে কোনো পলাতক জঙ্গির এমন সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশের ঘটনা আগে ঘটেনি।

 

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) কর্মকর্তারা বলছেন, জিয়ার অবস্থান শনাক্ত করে তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে এখনো।

 

এদিকে এই দুর্ধর্ষ জঙ্গির নির্দেশে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক লেখক অভিজিৎ রায়, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন, ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, নাজিমুদ্দিন সামাদ, নীলাদ্রি নিলয়, মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও তাঁর বন্ধু মাহবুব রাব্বী তনয়কে হত্যা এবং প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ তিনজনকে হত্যাচেষ্টা চালানো হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

 

এ ব্যাপারে সিটিটিসির উপকমিশনার (কাউন্টার টেররিজম) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জিয়া আমাদের কাছে এখনো পলাতক। একাধিক মামলায় সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ায় তাঁকে আমরা খুঁজছি।’

 

তদন্তকারী সূত্র জানায়, জিয়া সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে কর্মরত ছিলেন। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনী এক সংবাদ সম্মেলনে সরকার উত্খাতে ধর্মান্ধ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার একটি অভ্যুত্থান পরিকল্পনা নস্যাৎ করার খবর দেয়।

 

তখন থেকেই জিয়া পলাতক। পরে তাঁকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়। পরে একের পর এক ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক-প্রকাশক, বিদেশি নাগরিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন হত্যার প্রেক্ষাপটে আবারও জিয়ার নাম আলোচনায় আসে।

 

ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেষ্টার সময় জিয়া হিযবুত তাহ্রীরের মতাদর্শী ছিলেন। একসময় ঢাকার বাড্ডা, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পালিয়ে ছিলেন তিনি। অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর জিয়া সাত দিন মধ্যবাড্ডায় হিযবুত তাহ্রীরের সদস্য আহমেদ রফিকের বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন।

 

সূত্র মতে, একপর্যায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) তাত্ত্বিক নেতা মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীর ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন জিয়া। ২০১৩ সালে ব্লগার রাজীব হায়দার খুনের পর এবিটিতে জিয়ার কার্যক্রম প্রকাশ পায়।

 

জসিমউদ্দিন রাহমানী গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে জেলে রয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেন, ধরা পড়ার আগে তিনি একাধিকবার ঢাকা ও চট্টগ্রামে জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। জসিমউদ্দিন রাহমানীর অবর্তমানে জিয়াই এবিটি নিয়ন্ত্রণ করেন।

 

সংগঠনের সদস্যদেও বোমা তৈরিসহ অন্যান্য সামরিক প্রশিক্ষণ দিতেন বলে তাঁকে সামরিক প্রধান ঘোষণা করা হয়। জিয়ার সঙ্গে শীর্ষ জঙ্গি নেতা আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (একিউআইএস) কমান্ডার এজাজেরও ঘনিষ্ঠতা ছিল।

 

পাকিস্তানের করাচিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এজাজ নিহত হন। পরে এবিটি বাংলাদেশে আনসার আল ইসলাম নামে কাজ শুরু করে। এই সংগঠনেও জিয়া সামরিক প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন বলে তথ্য পেয়েছে সিটিটিসি।

 

যে স্লিপার সেলগুলো হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় তাদের ডেরায় জিয়া ছদ্মনামে গিয়ে নির্দেশনা দেন। নীলাদ্রি, দীপন, নাজিমুদ্দিন সামাদসহ কয়েকজনকে হত্যার সময় ঢাকা ও ঢাকার কাছে কোনো প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে জিয়ার যাতায়াত ছিল।

 

তবে ২০১৬ সাল থেকে হত্যাকাণ্ডে তাঁর প্রত্যক্ষ নির্দেশনার তথ্য নেই। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজারের টেকনাফসহ কয়েকটি এলাকায় তাঁর যাতায়াত বেশি।

 

জিয়ার তত্ত্বাবধানে আনসার আল ইসলামে অন্তত আটটি স্লিপার সেল তৈরি হয়েছে। প্রতিটি সেলের সদস্যসংখ্যা চার থেকে পাঁচ। অন্তত ৩০ দুর্ধর্ষ স্লিপার কিলার জঙ্গি তৈরি করেছেন জিয়া, যাঁদের নিজেই প্রশিক্ষণ দিতেন।

 

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মেজর জিয়ার বাবার নাম সৈয়দ মোহাম্মদ জিল্লুল হক। তাঁদের গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারের মোস্তফাপুরে।

 

পলাতক হলেই জিয়াকে ধরতে পটুয়াখালী শহরের সবুজবাগ এলাকায় তাঁর শ্বশুর মোখলেছুর রহমানের বাসায় দফায় দফায় অভিযান চালায় পুলিশ। তাঁর শাশুড়ি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা হামিদা বেগম সেই সময় গণমাধ্যমকে জানান, জিয়া পটুয়াখালীর বাসায় কখনো আসেননি। মৌলভীবাজারের গ্রামের বাড়িতে তাঁর যাতায়াতের তথ্যও নেই প্রশাসনের কাছে।

 

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট তিন-চারজন ব্যক্তি বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা বলে গোড়ানের বাসায় ঢুকে ব্লগার নীলাদ্রি নিলয়কে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

 

অভিযোগপত্রে জিয়াসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার ১২ স্লিপার সেল সদস্য তাদের জবানবন্দিতে জিয়ার নাম প্রকাশ করে। গত বছরের ৬ অক্টোবর এই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

 

সেই পরোয়ানা তামিল বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের ধার্য দিন গত ১২ জানুয়ারি তদন্তকারীরা আদালতে জানান, জিয়ার হদিস মিলছে না। জিয়াকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় আদালত সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেন। ক্রোকি পরোয়ানা তামিলের জন্য আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন আদালত।