আজ ৮ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২১শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ওড়াকান্দি

গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দি মোদিকে বরণ করতে প্রস্তুত

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: গ্রামের নাম ওড়াকান্দি। রাষ্ট্রীয় অতিথি আসবেন। কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয়। এখন শুধু অপেক্ষা। কখন আসবেন তাদের কাংঙ্খিত অতিথি।বঙ্গবন্ধু সমাধিতে শ্রদ্ধার পর ওড়াকান্দির মন্দিরে পূজা দেবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার আগমন উপলক্ষে গোপালগঞ্জের নিভৃত গ্রাম ওড়াকান্দিতে তৈরি হয়েছে হেলিপ্যাড। সংস্কার করা হয়েছে রাস্তাঘাট। বাড়ী ঘর চুনকামসহ সংস্কার করা হয়েছে।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ঠাকুর বাড়িতে শ্রম দিচ্ছেন মতুয়া ভক্তরা। প্রস্তুত করা হচ্ছে ঠাকুরবাড়িসহ আশপাশের এলাকা। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের বেশ কয়েকজন ভক্ত এরই মধ্যে ঠাকুরবাড়ি এসেছেন এটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজে সাহায্য করতে। বেশকিছু মতুয়া ভক্ত সেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ঠাকুরবাড়ী পরিস্কার পরিছন্নতার কাজে নেমে পড়েছেন।

 

বাংলাদেশ মতুয়া মহাসংঘের সভাপতি সীমা দেবী ঠাকুর বলেন, ‘বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাদের এই ঠাকুরবাড়িতে আসছেন, এটা শুধু ঠাকুরবাড়ির নয়, সকল মতুয়ার কাছে গর্বের বিষয়। আমরা হিন্দুধর্মীয় মতে উলুধ্বনি, শঙ্খ ও ডঙ্কা-কাশি বাজিয়ে তাকে স্বাগত জানানোর সব আয়োজনই রেখেছি।’ঠাকুরবাড়ির অন্যতম সেবাইত পদ্মনাভ ঠাকুর জানান, মোদি হেলিকপ্টার থেকে নামার পর হরিচাঁদ- গুরুচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে আসবেন। সেখানে পূজা শেষে মন্দিরের সামনেই ঠাকুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।

 

এছাড়া মতুয়া সম্প্রদায়ের তিন শতাধিক প্রতিনিধির সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বাড়ির সামনেই আরেকটি মাঠে।ঠাকুরবাড়ির আরেক সদস্য কাশিয়ানী উপজেলা চেয়ারম্যান সুব্রত ঠাকুর হিটলু জানান, নরেন্দ্র মোদিকে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে বরণ করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন তারা। সম্প্রতি বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনের একটি প্রতিনিধিদল ওড়াকান্দি ঘুরে গেছেন।

 

বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ঠাকুরবাড়ির পরিবেশ-পরিস্থিতির খোঁজ রাখছেন। তিনি হেলিপ্যাড থেকে নামার পর যে রাস্তা দিয়ে ঠাকুরবাড়ি যাবেন, সে রাস্তার সংস্কার শেষ। মোট কথা একজন গুরুত্বপূর্ণ অতিথিকে বরণ করার জন্য তারা সাধ্যমত প্রস্ততি নিয়েছেন।ঠাকুরবাড়ির সদস্য দেবব্রত ঠাকুর জানান, ২৭ মার্চ পশ্চিমবাংলায় বিধানসভার নির্বাচন।

 

সেদিনই নরেন্দ্র মোদি ঠাকুরবাড়ি এলে অবশ্যই তার পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকবে। কেননা পশ্চিমবঙ্গে মতুয়াদের লাখ লাখ ভোটার রয়েছে। তার এখানকার সফরের বিষয়টি জানতে পারলে মতুয়া ভক্তদের মনে আস্থার জায়গা তৈরি হবে। তারা মোদিকে নিজেদের লোক ভেবে নেবে, যার ফসল ঘরে তুলতে পারবে মোদির দল।কাশিয়ানী থানার অফিসার ইনচার্জ আজিজুর রহমান জানান, নিরাপত্তা জন্য সকল প্রস্তুতি রয়েছে।

 

ওই এলাকায় পুলিশি নজরদাারী ও টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে, যাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফর সুন্দর ভাবে সম্পন্ন হয়।কাশিয়ানীর ইউএনও রথীন্দ্রনাথ রায় বলেন, ‘আমরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওড়াকান্দি ভ্রমণের কর্মসূচি পেয়েছি। তাঁর ভ্রমণের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে প্রায় শেষের পথে।’গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা জানিয়েছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সফর সম্পর্কে তাঁকে জানিয়েছে। বিদেশি ভিভিআইপির জন্য যে ধরণের প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন, আমরা তা নিয়েছি।

 

ওড়াকান্দি এবং এর আশপাশ এলাকার মতুয়া সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় লোকজেনের সাথে আলাপকালে জানা গেছে ‘গত লোকসভা নির্বাচনে মতুয়া অধ্যুষিত বনগাঁ আসনে জয় পেয়েছিল বিজেপি। তাদের প্রার্থী ছিলেন মতুয়া পরিবারের শান্তনু ঠাকুর। সেখানকার বিধায়ক তৃণমূলের মমতা ঠাকুরও মতুয়া পরিবারের সদস্য। সেই কারণেই নরেন্দ্র মোদি হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মস্থান গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে আসতে চান বলে মনে করা হচ্ছে। সফরসঙ্গী হিসেবে হরিচাঁদ- গুরুচাঁদ ঠাকুর বংশের উত্তরসূরী মতুয়া সংসদ সদস্য শান্তনু ঠাকুর ঠাকুরও ওড়াকান্দি আসবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

 

পশ্চিমবঙ্গে আগামী ২৭ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে বিধানসভা নির্বাচন। আট দফার এই ভোট শেষ হবে ২৯ এপ্রিল’।উল্লেখ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ মার্চ সকাল ১০ট ৫০ মিনিটে টুঙ্গিপাড়ায় যাবেন। সেখানে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ পরিদর্শন, পুষ্পস্তবক অর্পণ ও গাছের চারা রোপণ করবেন।

 

এরপর বেলা ১১ টা ৩৫ মিনিটে তিনি কাশিয়ানীর ওড়াকান্দি ঠাকুর বাড়ি মন্দির পরিদর্শনে যাবেন। সেখানে তিনি হরি মন্দিরে পুজা ও মতুয়া সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় করবেন।নিপীড়িত ও অবহেলিত মানুষের মুক্তির দূত আধ্যাত্মিক পুরুষ পূর্ণব্রহ্ম শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ১২১৮ বঙ্গাব্দে কাশিয়ানীর সাফলীডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

 

তার জন্মের জন্য সাফলীডাঙ্গা গ্রাম ধন্য হয়ে ওঠে। হরিচাঁদ ঠাকুরের বাল্য নাম হরি হলেও তার ভক্তরা তাকে হরিচাঁদ নামেই ডাকতেন। পিতা যশোবন্ত ঠাকুরের পাঁচ পুত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় পুত্র। পরে পাশ^বর্তী ওড়াকান্দি গ্রাম হরিচাঁদ ঠাকুরের অলৌকিকত্ব ও লীলার জন্য প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। এটি জেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

 

হরিচাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল খুবই সামান্য। পাঠশালা অতিক্রম করে তিনি কয়েক মাস মাত্র স্কুলে গিয়েছিলেন। পরে স্কুলের গন্ডিবদ্ধ জীবন ভালো না লাগায় স্কুল ত্যাগ করে তিনি মিশে যান সাধারণ মানুষের সঙ্গে। প্রতিকৃতির আকর্ষণে তিনি রাখাল বালকদের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন ভাবুক প্রকৃতির, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।

 

তিনি চৈতন্যদেবের প্রেম-ভক্তির কথা সহজ-সরলভাবে প্রচার করতেন। তাঁর এই সাধন পদ্ধতিকে বলা হয় ‘মতুয়াবাদ’। আর এই আদর্শে যাঁরা বিশ্বাসী, তাঁদের বলা হয় ‘মতুয়া’। মতুয়া শব্দের অর্থ মেতে থাকা বা মাতোয়ারা হওয়া। হরিনামে যিনি মেতে থাকেন বা মাতোয়ারা হন, তিনিই মতুয়া। মতান্তরে ধর্মে যার মত আছে, সেই মতুয়া।১৮৭২ সালের ব্রিটিশ আদম শুমারিতে ৩৬টি বর্ণের উদ্ভব দেখানো হয়েছিল। তার আগে থেকেই সমাজে বর্ণপ্রথা ও অস্পৃর্শতা প্রচলিত ছিল।

 

তাই হরিচাঁদ ঠাকুর আদর্শ গার্হস্থ্য ধর্ম ও মতুয়াবাদ প্রচার করেছিলেন। এই মতুয়া মতবাদ প্রচার করতে গিয়ে তিনি নীল কুঠির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। সমাজে জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে লড়েছেন।জমিদারের লোকজন মতুয়া মতবাদ প্রচারে হরিচাঁদ ঠাকুরের অনুসারীদের বাধা দিয়ে বর্বর নির্যাতন করেছেন।

 

হরিচাঁদ নিজেও অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তিনি এর প্রতিবাদ করে মতুয়াবাদ প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন।হরিচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা ও ধর্মীয় আন্দোলন বা মতুয়া মতাদর্শ প্রচারের আন্দোলনকে পরে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করেছিলেন তার ছেলে শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর। গুরুচাঁদ ১৮৩৬ সালের পর থেকে ব্যাপকভাবে পাঠশালা প্রতিষ্ঠা শুরু করেন। এগুলো এখনও আলো ছড়াচ্ছে।