আজ ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৩ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

জার্মানি

জার্মানিতে কোয়ারান্টিনের নির্দেশ ভাঙলে যেতে হতে পারে করোনা-জেলে!

প্রথমবার্তা প্রতিবেদকঃ জার্মানির কিছু রাজ্যে তৈরি হয়েছে করোনা-জেল। কোয়ারান্টিনের নির্দেশ ভাঙলে যেতে হতে পারে সেই জেলে। খবর ডয়চে ভেলের।উত্তর জার্মানির একটি ছোট শহরে জুভেনাইল ডিটেনশন সেন্টারের অ্যানেক্স বিল্ডিংয়ে তৈরি হয়েছে ‘কোভিড কারাগার’। ছয়টা ঘরের কারাগার। যারা করোনার কোয়ারান্টিন নিয়ম ভাঙবেন, তাদের জন্য এই জেল।

 

শ্লেসভিগ হলস্টাইন রাজ্যের নোয়েমুনস্টার ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের সদস্য শুলজ জানিয়েছেন, যারা করোনায় আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাদের বাড়িতে নিভৃতবাসে থাকার কথা। করোনাকে রুখতে গেলে এটা খুবই জরুরি।তিনি জানিয়েছেন, কেউ যদি এই নিয়ম না মানেন, তা হলে তারা অন্যদের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবেন। তাই নিয়মানুযায়ী, তাদের ঘরের ভিতরেই থাকতে হবে।

 

সেই নিয়ম না মানলে সোজা এই জেলে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই জানুয়ারিতেই চালু হয়েছে এই করোনা-জেল।করোনা-জেল ঠিক চিরাচরিত কারাগারের মতো নয়। এখানে টিভি, ল্যাপটপ, ফোন এবং অন্য ঘরোয়া সুবিধা পাওয়া যাবে। যাদের এখানে রাখা হবে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার ব্যবস্থা হবে। তাদের জন্য আরামদায়ক বিছানা থাকবে। হাঁটার জায়গা থাকবে।

 

শুলজ জানিয়েছেন, নিজের বাড়ির সমস্ত স্বাচ্ছন্দ্য মিলবে করোনা-জেলের নিভৃতবাসে।তফাৎ একটাই। মানুষকে তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে এই জেলে ঢোকানো হবে এবং তারা রক্ষীদের কথা মানতে বাধ্য হবেন। ৪০ জন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারকে নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়েছে, তারা রক্ষীর দায়িত্ব পালন করবেন।

 

তবে এও ঠিক, কেউ করোনা-আইন ভাঙলে একেবারে শেষ ব্যবস্থা হিসাবে তাকে এই জেলে ঢোকানো হবে। কেউ যদি নিজের বাড়িতে কোয়ারান্টিনে থাকতে বারবার অস্বীকার করেন, তাহলেই তাকে জেলে রাখা হবে।তবে তার আগে দেখতে হবে, তারা নির্দেশ অমান্য করে নিভৃতবাস থেকে বাইরে গিয়েছেন এবং তাদের থেকে অন্যদের করোনা হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কি না। তখন পুলিশ তাদের বাড়িতে যাবে এবং প্রথমে তাদের জরিমানা করা হবে। তারপর কোর্টের নির্দেশে তাদের করোনা-জেলে পাঠানো হবে।

 

শুলজ জানিয়েছেন, সাধারণ কোয়ারান্টিন সময়সীমার বাইরে কাউকে এই জেলে রাখা হবে না।অনেক রাজ্যে করোনা-জেল নেইজার্মানিতে কোয়ারান্টিন ভাঙার খবর হেডলাইন হয়। সংবাদপত্র বিল্ডের রিপোর্ট, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর একজনকে কোয়ারান্টিনে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। সেই নির্দেশ অমান্য করে ওই ব্যক্তি ট্রেনে করে একশ কিলোমিটার দূরে গিয়েছিলেন কুকুর কিনতে।তবে এই ধরনের কাহিনি সংখ্যায় কম। সেজন্যই প্যানডেমিকের পর থেকে জার্মানির ১৬ রাজ্যে করোনা-জেল নিয়ে প্রবল বিতর্ক হয়েছে।

 

২০২০-র মে মাসে জার্মানিতে যখন কড়াকড়ি অনেকটাই শিথিল করা হয়, তখন ব্র্যান্ডেনবুর্গ রাজ্যের বিমানবন্দরে আলাদা ঘর রাখা হয়েছিল। যারা কোয়ারান্টিন মানতে চাইবেন না, তাদের জন্য। কিন্তু ওই জায়গাটি আয়তনে বিশাল। সম্প্রতি এজন্য একটি ছোট ভবন নেয়া হয়েছে।ব্র্যান্ডেনবুর্গে মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কোয়ারান্টিন না মানার দুইশটি ঘটনা ঘটেছিল। তবে ওই আট মাসে ৩০ জনকে করোনা-জেলে ঢোকাতে হয়েছিল।অনেক রাজ্যের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের এরকম জেলের কোনও পরিকল্পনা নেই।

 

দুইটি রাজ্য জানিয়েছে, তাদের এরকম জেল নেই, বানাবার পরিকল্পনাও নেই। নর্থ রাইন ওয়েস্টফেলিয়া স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের আইন মেনে কোয়ারান্টিন নিয়ম চালু করার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু তাদেরও জেল নেই।ফ্রাঙ্কর্ফুটে ২০২০-তে একটি হোটেল এই কারণে রাখা হয়েছিল। কিন্তু চাহিদা না থাকায় তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

 

প্রতিরোধক ব্যবস্থা

জার্মানিতে এই ধরনের ব্যবস্থা শেষ পর্ষন্ত অনাবশ্যক বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, শ্লেসভিগ হলস্টাইনের ওই শহরে কেন করোনা-জেল খোলা হলো?স্থানীয় কাউন্সিলার পিটার সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন, আমরা একটি উদাহরণ তৈরি করতে চাই। আমরা আশা করি, করোনা জেলে খুবই কম মানুষকে রাখতে হবে। অন্তত, এখনও পর্যন্ত খুব বেশি মানুষকে রাখতে হয়নি।তবে শ্লেসভিগ হলস্টাইন একা নয়, বার্লিনেও একই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সেখানে একটি হাসপাতালকে এজন্য বেছে নেয়া হয়েছে।

 

পূর্ব জার্মানির রাজ্য স্যাক্সনির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদেরও একই ধরনের পরিকল্পনা আছে। তবে হাসপাতাল নয়, অন্য কোনও জায়গা এর জন্য চিহ্নিত করা হতে পারে। এই রাজ্যেই সব চেয়ে বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুর সংখ্যাও সব চেয়ে বেশি। তাই তারা জানুয়ারির শেষে এই ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছেন।রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদসংস্থা ডিপিএ-কে জানিয়েছেন, খুব কম মানুষকেই এখানে রাখতে হবে। এখনও পর্যন্ত কোয়ারান্টিন ভেঙেছেন এমন কেউ নেই। কেউ ভাঙলে আদালতের নির্দেশেই তাকে ওখানে রাখা হবে।

 

প্রবল সমালোচনা

সামাজিক মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের প্রচুর সমালোচনা হচ্ছে। কিছু সমালোচকের মতে, এও এক ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। কেউ বলছেন, এটা বেআইনি। অনেক রাজনৈতিক দলও এর বিরুদ্ধে।কতটা কার্যকর হবে এই ব্যবস্থা? শুলজ বলছেন, এখনও পর্যন্ত একজনও করোনা-জেলে থাকেননি। থাকলে তারপর বোঝা যাবে।