আজ ২৩শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৬ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

025809Student kalerkantho pic

জিপিএ ৫ বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:করোনা মহামারির কারণে শিক্ষার্থীদের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও এসএসসি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে ২০২০ সালের এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে পাস করেছে শতভাগ শিক্ষার্থী। তবে আগের বছরের তুলনায় জিপিএ ৫ বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন গুণ। গতকাল শনিবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডসহ ১১টি বোর্ডের ফল একযোগে প্রকাশ করা হয়। শিক্ষার্থীরা এসএমএস, ওয়েবসাইটসহ অনলাইনের নানা মাধ্যমে গতকাল সকাল থেকেই ফল জানতে পারছে।

২০২০ সালে ৯ হাজার ৬৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৩৭৭ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করে। তাদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ৬১ হাজার ৮০৭ জন শিক্ষার্থী। জিপিএ ৫ প্রাপ্তির হার ১১.৮৩ শতাংশ। তবে ২০১৯ সালে ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছিল ৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৭২ জন। তাদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৪৭ হাজার ২৮৬ জন। জিপিএ ৫ প্রাপ্তির হার ছিল ৩.৫৪ শতাংশ।

প্রতিবছর গণভবনে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানদের সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফলাফলের অনুলিপি হস্তান্তর করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকে শিক্ষার্থীর ভিড়, তবে এবার সেই পরিস্থিতি ছিল না। গতকাল রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ২০২০ সালের এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে গণভবন থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়ে ডিজিটালি এই পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে এইচএসসির ফলাফলের সারসংক্ষেপ গ্রহণ করেন। এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।

এবার ঢাকা বোর্ডে তিন লাখ ২৬ হাজার ৪১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৫৭ হাজার ৯২৬ জন, রাজশাহী বোর্ডে এক লাখ ৪৯ হাজার ৯৭৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ২৬ হাজার ৫৬৮ জন, কুমিল্লা বোর্ডে এক লাখ দুই হাজার ৪৩৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৬৪ জন, যশোর বোর্ডে এক লাখ ২১ হাজার ৫২৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১২ হাজার ৮৯২ জন, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৯৭ হাজার ৯৬৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১২ হাজার ১৪৩ জন, বরিশাল বোর্ডে ৬৮ হাজার ৯২০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে পাঁচ হাজার ৫৬৮ জন, সিলেট বোর্ডে ৭৫ হাজার ৩২৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে চার হাজার ২৪২ জন, দিনাজপুর বোর্ডে এক লাখ ১৮ হাজার ৭৩৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১৪ হাজার ৮৭১ জন, ময়মনসিংহ বোর্ডে ৮৪ হাজার ৪০৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১০ হাজার ৪০ জন, মাদরাসা বোর্ডে ৮৮ হাজার ৩০২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে চার হাজার ৪৮ জন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এক লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে চার হাজার ১৪৫ জন।

২০২০ সালের এইচএসসি ও সমমানের ফলে জিপিএ ৫ প্রাপ্তির দিক দিয়ে ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে আছে মেয়েরা। সাত লাখ ছয় হাজার ৮৮৫ জন ছেলে শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৭৮ হাজার ৪৬৯ জন। তবে ছয় লাখ ৬০ হাজার ৪৯২ জন মেয়ে শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৮৩ হাজার ৩৩৮ জন।

৯টি সাধারণ বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগে দুই লাখ ৬৮ হাজার ২৪৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ২৩ হাজার ৬২০ জন। মানবিক বিভাগে ছয় লাখ ২৭ হাজার ৬৪২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১৯ হাজার ৬৬৪ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষায় দুই লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১০ হাজার ৩৩০ জন। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ৮৮ হাজার ৩০২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে চার হাজার ৪৮ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এক লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে চার হাজার ১৪৫ জন। এবার বিদেশের আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২১৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৬২ জন।

শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি জানান, সাধারণ ও মাদরাসা বোর্ডের ক্ষেত্রে জেএসসি ও সমমান এবং এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার বিষয়গুলোকে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ফল প্রস্তুত করা হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ক্ষেত্রে এসএসসি ও সমমান এবং একাদশ শ্রেণির পরীক্ষার বিষয়গুলোকে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রস্তুত হয়েছে ফল।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরামর্শক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সাবজেক্ট ম্যাপিং করে ফল প্রকাশ করা হয়। সমন্বয়কৃত বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বরের গড় মানের ভিত্তিতে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার বিষয়ভিত্তিক নম্বর প্রতিস্থাপন করে বিদ্যমান পদ্ধতিতে গ্রেড পয়েন্ট নির্ধারণের মাধ্যমে জিপিএ চূড়ান্ত করা হয়। এ ছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে গ্রুপ বা বিভাগ পরিবর্তনকারী শিক্ষার্থী, বোর্ড পরিবর্তনকারী শিক্ষার্থী, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা শিক্ষার্থী, অনিয়মিত শিক্ষার্থী, মানোন্নয়ন শিক্ষার্থী, সমতুল্য সনদপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের ফল পরামর্শক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে করা হয়।

পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যদি মূল্যবোধ তৈরি না হয়, তাহলে শুধু বেশি নম্বর পেয়ে কী হবে, মানবিক গুণে গুণান্বিত হও, চারপাশে তাকাও, মানুষকে ভালোবাসো। নীতি-নৈতিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠো, স্বদেশপ্রেমে উজ্জীবিত হও, নিঃস্বার্থ চিত্তে মানবকল্যাণে নিবেদিত হও।’

অভিভাবকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনার সন্তানকে অসুস্থ প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দেবেন না, স্বার্থপর হিসেবে গড়ে তুলবেন না। দেশের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত হওয়ার শিক্ষা যদি আপনার সন্তান না পায়, মনে রাখবেন, এ শিক্ষা অর্থবহ হবে না, শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।’ শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যাঁরা শিক্ষকতা পেশায় আছেন, আপনাদের দায়িত্ব অনেক অনেক বেশি। শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনে বিষয়ভিত্তিক মানসম্পন্ন শিক্ষাদানে আপনাদের ভূমিকাই প্রধান। মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রেও আপনারাই রাখতে পারেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।’

মন্ত্রী জানান, এবারের ফলাফলে কোনো শিক্ষার্থী সংক্ষুব্ধ হলে আগের মতোই রিভিউ চেয়ে আবেদন করতে পারবে। এ ছাড়া এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা না হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণ বাবদ আদায় করা অর্থের অব্যয়িত অংশ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জানা যায়, গত বছরের ১ এপ্রিল ২০২০ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে শুরু করলে ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও পরীক্ষা নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হওয়ায় গত ৭ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া যাচ্ছে না বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। কিন্তু আইনে পরীক্ষা ছাড়া ফল প্রকাশের বিধান না থাকায় এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছিল না। গত সপ্তাহে বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা ছাড়াই ফল প্রকাশের বিধান যুক্ত করে জাতীয় সংসদে আইন সংশোধন করা হয়। এরপর জেএসসি-জেডিসির ফলাফলকে ২৫ শতাংশ এবং এসএসসির ফলকে ৭৫ শতাংশ বিবেচনায় নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ করা হলো।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খান।