আজ ২৪শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৭ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

bd pratidin 4 2021 01 27 01

টাকাগুলো কবে আসবে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: সিঙ্গাপুরের এক ব্যাংকে এক বাংলাদেশির ৮ হাজার কোটি টাকা রয়েছে বলে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রয়াত অ্যাটর্নি জেনারেলকে দীর্ঘ আলাপচারিতায় জানিয়েছিলেন। সম্প্রতি এক টকশোয় দুদকের বিজ্ঞ আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

 

নির্ভরযোগ্য মহলের খবর হলো- এ টাকার মালিক ছিল যুদ্ধাপরাধ মামলায় ফাঁসির দন্ডে দন্ডিত কুখ্যাত রাজাকার সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা), যে বহু দিন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী ছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশ থেকে কেউ এ টাকার মালিকানা দাবি করে তা উদ্ধারের চেষ্টা করছে না। না করার কারণ এটি করলেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেবে, যার জন্য সাকার স্ত্রী এবং সন্তানরা চুপ করে আছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত। যুদ্ধাপরাধের মামলায় ফাঁসির দন্ডে দন্ডিত হওয়া আরও এক কুখ্যাত রাজাকার মীর কাসেম আলী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লবিস্ট প্রতিষ্ঠান কেসেডি অ্যান্ড কোংকে বাংলাদেশের টাকার হিসাবে ১৮০ কোটি টাকা দিয়েছিল যুদ্ধাপরাধ বিচার বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে। মীর কাসেম আলী সে অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে ডলার করে পাঠিয়েছিল আমাদের দেশের মানি লন্ডারিং আইন ভঙ্গ করে। সম্প্রতি দুদক এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকারের কাছে জানতে চেয়েছে সে টাকা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকার কী উদ্যোগ নিয়েছে। পি কে হালদার নামক এক ব্যবসায়ী প্রচুর অর্থ বিদেশে পাচার করার খবর পেয়ে দুদক সে টাকা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তা জানতে চেয়েছে। এরই মধ্যে দুদক পি কে হালদারের কয়েক শ কোটি টাকা জব্দ করেছে। তার বান্ধবীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আরও অনেকের বিদেশযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এমপি পাপুলের ব্যাপারেও তদন্ত চলছে।

 

ওপরে উল্লিখিত কথাগুলোই নাটকের শেষ অধ্যায় নয়। জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার গুণধর পুত্র তারেক রহমান এবং তার বন্ধুর প্রচুর টাকা রয়েছে বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে যা সে তুলতে পারছে না। কারণ টাকাগুলো (বিদেশি মুদ্রায়) এমন ভল্টে রাখা হয়েছে যেখানে তারেক রহমান এবং গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের চোখ না মিললে ভল্ট খুলবে না। গিয়াসউদ্দিন আল মামুন জেলে থাকার কারণে সে টাকা তোলার জন্য যেতে না পারায় তারেক রহমানও সে টাকা তুলতে পারছে না। বিএনপি-জামায়াত সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খান এবং তদ্বীয় পুত্র ফয়সাল মোর্শেদের হংকংয়ে প্রচুর টাকা এবং শেয়ার থাকার ব্যাপারেও দুদক কর্মপন্থা গ্রহণ করছে। এভাবে বিদেশে পাচার করা বহু টাকার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং দুদক মাঠে নেমেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এ টাকাগুলো আনা যাবে কিনা এবং তা কবে নাগাদ হতে পারে।

বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বে উন্নয়নের বিমূর্ত প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আজ আমাদের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে যা সবাইকে বিস্মিত করেছে। সম্প্রতি হল্যান্ডের রাজা-রানী বাংলাদেশের উন্নয়নে অভিভূত হয়ে তা দেখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে তার হাইকমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ কীভাবে এত উন্নতি করল তা জেনে নিতে। এতে আমরা গর্বিত। কিন্তু যে অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে তা আমাদের বর্তমান অর্থনীতিকে অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তারেক রহমান, গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, সাকা চৌধুরী, পি কে হালদার, এমপি পাপুল, মোর্শেদ খান, মীর কাসেম আলীসহ আরও অনেকে যে পরিমাণ টাকা পাচার করেছে, তা বিশ্বাসের জগৎকেও হার মানায়। এগুলো প্রমাণ করছে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কত ব্যাপক আকারে দুর্নীতি হয়েছে। তদুপরি সাকা চৌধুরী এবং মীর কাসেমের মতো রাজাকারদের সম্পদের পাহাড় গড়ার সুবিধা করে দিয়েছিল জিয়াউর রহমান।

 

যারা বিদেশে অর্থ পাচার করেছে তাদের নামের তালিকা অনেক বিশাল। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির কারণে তাদের সবার নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি হাই কোর্টও নামের তালিকা চেয়েছিল। অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, এখন তালিকা প্রকাশ করলে টাকা ফেরত আনার ব্যাপারে সহায়ক এক আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ হবে। এ ব্যাপারে হাই কোর্টের পরবর্তী আদেশ অপেক্ষমাণ রয়েছে। তবে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে উচ্চ আদালত চাইলে তাদের অবশ্যই তথ্য প্রদান করতে হবে।

 

অর্থ পাচার নিয়ে আজ গোটা বিশ্বই উদ্বিগ্ন। কেননা এর সঙ্গে জড়িত জঙ্গিবাদ। এ ব্যাপারে যেসব আন্তর্জাতিক কনভেনশন হয়েছে তাতে দেশে দেশে আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ প্রতিষ্ঠার বিধান রয়েছে যার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও ২০১২ সালের অর্থ পাচার রোধ আইনের এক বিধান দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে ‘ফাইন্যানশিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট’ বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে। যেসব দেশে সে কনভেনশনসমূহের বিধানমতে আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ রয়েছে, আমাদের ফাইন্যানশিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের সঙ্গে তাদের অনেকের চুক্তি রয়েছে অর্থ পাচারসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের। এ ব্যাপারে আরও একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা রয়েছে যার নাম ‘এগমন্ট গ্রুপ’ (EGMONT GROUP)। বাংলাদেশসহ এ সংস্থার সদস্য ১৬৭টি দেশ। এ সংস্থা বিভিন্ন দেশের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধের দায়িত্ব পালন করে। বিভিন্ন দেশের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদানে। পাচার করা অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে এগমন্ট গ্রুপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ গ্রুপের সঙ্গে চুক্তির একটি শর্ত হলো, তাদের সম্মতি ছাড়া বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের সম্পর্কে পাওয়া কোনো খবর কাউকে প্রদান করা যাবে না। আর তাই পাচারকারীদের যে তালিকা আগে প্রকাশিত হয়েছে তা ছাড়া নতুনভাবে কোনো তালিকা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিচারিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সে টাকা ফেরত পাওয়া যায় না।

 

এ ব্যাপারে কয়েকটি আন্তর্জাতিক কনভেনশনের কারণে বিভিন্ন দেশ পাচার করা টাকা যে দেশ থেকে পাচার হয়েছে সে দেশে ফেরত পাঠায়। এসব কনভেনশন অনুযায়ী বহু দেশই প্রণয়ন করেছে নিজ দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং চুক্তি করেছে এগমন্ট গ্রুপের সঙ্গে। এসব কনভেনশনকে বাস্তবায়ন করার জন্য আমাদের দেশে যেমন সৃষ্টি করা হয়েছে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ফাইন্যানশিয়াল গোয়েন্দা সংস্থা, তেমনি প্রণয়ন করা হয়েছে অপরাধ সম্পর্কিত বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা আইন-২০১২। অপরাধ বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা আাইন অনুযায়ী আমাদের কর্তৃপক্ষগণ যদি বিদেশে অর্থ পাচারের খবর পান তখন এগমন্ট গ্রুপের সহায়তায় পাচারকৃত দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা থেকে তথ্য এবং প্রমাণাদি প্রাপ্ত হয়ে বাংলাদেশের আদালতেই পাচারকারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে পারেন। আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং এগমন্ট গ্রুপের সঙ্গে চুক্তির কারণে বাংলাদেশের আদালতে এমন মামলা করা হলে বিদেশের যে ব্যাংকে পাচার করা টাকা রক্ষিত আছে আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে দেশের সেই ব্যাংক এবং কর্তৃপক্ষকে আন্তর্জাতিক কনভেনশনের অধীনে সে অর্থের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং জমা অর্থ আটক করার অনুরোধ করলে সে ব্যাংক এবং দেশের সরকার সাধারণত সে অনুরোধ রক্ষা করে, যদি আমাদের কর্তৃপক্ষ টাকাগুলো বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া মর্মে যথোপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ পাঠাতে পারেন। তবে বিদেশি ব্যাংক টাকা আটক করে রাখলেও তা বাংলাদেশে পাঠাতে পারে না যতক্ষণ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত পাচারকারীর বিরুদ্ধে রায় না দেয়। অর্থাৎ শুধু বিচারিক আদালত রায় দিলেই চলবে না, পাচারকারী ব্যক্তি হাই কোর্টে এবং পরবর্তীতে আপিল বিভাগে আপিল করলে, আপিল বিভাগের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সেই রায় পেতে বহু সময় চলে যায়। এরই মধ্যে আমরা খালেদা জিয়ার দুই পুত্র তারেক রহমান ও কোকোর পাচারকৃত টাকা ফেরত পেয়েছি। কোকোর সিঙ্গাপুরে পাচার করা ২১ কোটি টাকা সিঙ্গাপুর সরকার কয়েক বছর আগেই এ শর্তে ফেরত দিয়েছে যে সে অর্থ ব্যবহার করা হবে অর্থ পাচার রোধকারী ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য। তারেক রহমানের ভল্টে রাখা টাকা ছাড়া কিছু টাকাও ফেরত পাওয়া গেছে। তারেক রহমানের বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের ২০ কোটি টাকার সমপরিমাণ ব্রিটিশ পাউন্ড বিলেতের ন্যাশনাল ওয়েস্ট মিনস্টার ব্যাংক (নেটওয়েস্ট) আমাদের দেশের বিচারিক আদালতের রায় অনুযায়ী আটক করেছে। পরবর্তীতে গিয়াসউদ্দিন আল মামুন হাই কোর্টে আপিল করলে হাই কোর্টও নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখে। মামলাটি এখন আপিল বিভাগে রয়েছে। আল মামুনের এ টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য আপিল বিভাগে কী হয় তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। যদিও বিলেতের নেটওয়েস্ট ব্যাংকের অ্যাকাউন্টটি তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু এবং তার বহু অপকর্মের শরিক গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের নামে, তবু গণমানুষের ধারণা টাকাগুলো তারেক রহমানের। সে ধরা না পড়ার জন্য বেনামিতে তার টাকাগুলো গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের নামে করা অ্যাকাউন্টে রেখেছে। তারেক এবং আল মামুনের যৌথ ট্রায়ালে মামুনকে বিচারিক আদালত সাত বছর জেল এবং জরিমানা করেছে। কিন্তু তারেককে দিয়েছে খালাস। পরে অবশ্য হাই কোর্ট নিম্ন আদালতের রায় পাল্টিয়ে তারেককে সাত বছর জেল দিয়েছে। তা ছাড়া সোনালী ব্যাংকে তারেক ও গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের যে ২০ কোটি টাকা জব্দ ছিল তাও রাষ্ট্র বরাবর বাজেয়াপ্ত করা হয়। জিয়া অরফানেজ দুর্নীতির মামলায়ও তারেক রহমানের ১০ বছর জেল হয়েছে, সাত বছর জেল হয়েছে মানি লন্ডারিং মামলায়।

 

এখানে উল্লেখ্য, নিম্ন আদালতের মোতাহার নামক যে বিচারক তারেক রহমানকে খালাস দিয়েছিল, সেই বিচারক সে রায় দেওয়ার পরই বহু টাকা নিয়ে মালয়েশিয়া চলে গিয়ে সেখানে বাড়ি-ঘর কিনেছেন বলে কর্তৃপক্ষের কাছে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। আরও উল্লেখ্য, একই বিচারক পুলিশের এক এসপিকে এমন এক মামলায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছিলেন যে মামলায় সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর। সে মামলায়ও ওই বিচারকের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। আমাদের দেশের অন্যতম শীর্ষ অর্থ পাচারকারী হচ্ছেন বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খান যিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ মূল্যের রোলস রয়েসে গাড়ির মালিক, হংকংয়ে তার ২০ লাখ শেয়ার এবং ২০ লাখ হংকং ডলার আছে বলে সে দেশের কর্তৃপক্ষ আমাদের জানিয়েছেন যে শেয়ার এবং টাকা হংকং কর্তৃপক্ষ আটক করে রেখেছেন। এ খবর পেয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করে রায় পাওয়া গেছে। সে রায় হাই কোর্টও বহাল রেখেছে। আইনের হাত থেকে বাঁচার জন্য তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি আওয়ামী লীগে প্রবেশের চেষ্টা করছেন বলেও খরব রয়েছে।

 

উল্লেখ্য, করোনাকালেই মোর্শেদ খান একটি গোটা প্লেন ব্যক্তিগতভাবে ভাড়া করে যুক্তরাজ্য চলে যান গৃহকর্মীসহ, যা প্রমাণ করে তার সম্পদের পাহাড় কত উঁচু। ২০০৯ সালে আমি হাই কোর্ট বিভাগে বিচারপতি থাকাকালে মোর্শেদ খানের ছেলে ফয়সাল মোর্শেদকে বিদেশে যেতে না দেওয়ায় আমার আদালতে সে রিট করলেও আমি সিঙ্গাপুরের সরকারি কাগজ দেখার পর তার বিদেশ যাওয়ার আবেদন নাকচ করেছিলাম। তার উদ্দেশ্য ছিল সিঙ্গাপুর গিয়ে টাকাগুলো সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা।

 

ফাঁসির দন্ডে দন্ডিত যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলী অর্থ পাচার আইনে অপরাধ করে যুক্তরাষ্ট্রের লবিং কোম্পানি কেসেডি অ্যান্ড কোম্পানিকে প্রদানের জন্য যে ১৮০ কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করেছিল, সে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে কিনা, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে, কেননা, কেসেডি অ্যান্ড কোম্পানি এই বলে সে টাকা ফেরত দেওয়ার বিরুদ্ধে যুক্তি তুলতে পারে যে তারা এক চুক্তির বলেই ওই অর্থ পেয়েছে বিধায় তা ফেরত-অযোগ্য। তবে কেসেডি কোম্পানির বিরুদ্ধেও এই মর্মে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করা সম্ভব যে অর্থ পাচার আইন ভঙ্গ করে ওই চুক্তি হওয়ায় তা চুক্তি আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ।

 

বিলেতে মোটামুটি চার ধরনের বাড়ি আছে। হতদরিদ্ররা থাকে কাউন্সিল বাড়িতে স্বল্প ভাড়ায়। নিম্নবিত্তরা থাকে টেরেস বাড়িতে যার দুই দিকের দেয়ালই অন্য বাড়ির সঙ্গে লাগানো। মধ্যবিত্তরা থাকে সেমি ডিটাস বাড়িতে যার এক দিক খোলা, উচ্চবিত্তরা থাকে উঁচু মূল্যের বা উঁচু ভাড়ার ডিটাস বাড়িতে যার উভয় দিক খোলা। আরও উচ্চবিত্তরা থাকেন অভিজাত এলাকায়। তারেক রহমান স্ত্রী-সন্তানসহ থাকে কিংস্টন আপন থেইমস নামক এক অভিজাত উচ্চবিত্তদের এলাকার গলফ ড্রাইভ নামক সড়কে, হোয়াইট চেইজ নামক দেখার মতো এক রাজকীয় ডিটাস ব্যয়বহুল বাড়িতে। বাড়িতে রয়েছে বেশ কজন গৃহকর্মী। তার মেয়ে সম্প্রতি ব্যারিস্টার হয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়তে প্রতি বছর টিউশিন ফি বাবদই দিতে হয় কয়েক হাজার পাউন্ড। বিলেতে রয়েছে সরকারি স্কুল যেখানে বেতন দিতে হয় না আর রয়েছে প্রাইভেট স্কুল যেখানে প্রচুর টাকা বেতন দিতে হয়। সে দেশের বিরাটসংখ্যক লোক সরকারি স্কুলেই পড়ে, এমনকি বহু এমপি-মন্ত্রীর সন্তানরাও। তবে অতি উচ্চবিত্তরা সন্তানদের পাঠান প্রাইভেট স্কুলে মোটা বেতন দিয়ে। আর একটু কম বেতনের স্কুলের নাম গ্রামার স্কুল। তারেক রহমান তার মেয়েকে মেরি মাউন্ট নামক প্রাইভেট স্কুলে মোটা বেতন দিয়ে পড়িয়েছিল। কোকোর বিধবা স্ত্রীও থাকে একই এলাকায় আরও একটি ডিটাস বাড়িতে Wontford Close নামের সড়কে। তার দুই মেয়েও পড়ে কম্বি গার্লস নামক উঁচু বেতনের প্রাইভেট স্কুলে। তারেক রহমান বিলেতে সম্পূর্ণ বেকার এক ব্যক্তি যার কোনো দৃশ্যমান উপার্জন নেই। বিলেতে অবশ্য বেকাররা রাষ্ট্রের ভাতা পায়; কিন্তু সে ভাতার অঙ্ক ততটুকু যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কোনোক্রমে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট, বিলাস-জীবনের জন্য ভাতা দেওয়া হয় না, প্রাইভেট স্কুলের খরচও দেওয়া হয় না। আমি যখন প্রবাসী ছিলাম, তখন উঁচু পদে উচ্চ বেতনে কর্মরত ছিলাম। আমার স্ত্রীও শিক্ষিকা হিসেবে ভালোই বেতন পেতেন। আমি বেশ কিছু সময় লন্ডনের প্রাচীনতম সাপ্তাহিক জনমতেরও একক মালিক ছিলাম। তা ছাড়া একাধিক বাড়ির মালিক হিসেবে আমি বাড়ি ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয় সত্ত্বেও আমার দুই মেয়েকে প্রাইভেট স্কুলে পড়ানোর কথা না ভেবে পড়িয়েছিলাম আরও কম খরচের গ্রামার স্কুলে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বেকার তারেক রহমান কীভাবে এত বিলাস-জীবন যাপন করছে। এটি তো বলার অপেক্ষা রাখে না যে বিলেতে তাকে পাচার করে অর্থ পাঠানো হচ্ছে।

 

বাংলাদেশ থেকে যারা বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করেছে তাদের তালিকা বেশ দীর্ঘ, পাচার করা অর্থের পরিমাণও আকাশচুম্বী। জাতি একসময় তা জানবে আশা করি। এর একটি অংশ ফেরত পাওয়া যেতে পারে আন্তর্জাতিক সহায়তার ভিত্তিতে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কখন? আর এক প্রশ্ন এ চলমান পাচার প্রক্রিয়া বন্ধ হবে কিনা। ১৯৪৭ বিদেশি মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া একটি পয়সাও বিদেশে পাঠানো যায় না। শুধু বিদেশ ভ্রমণকালে বছরে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ডলার সঙ্গে করে নেওয়া যায়। আর একই কারণে বাংলাদেশ থেকে এর বেশি টাকা নিলে সংশ্লিষ্ট দেশে পাচারকারীকে অর্থ পাচার আইনে শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। অর্থাৎ উভয় দেশেই এটা কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই টাকা সাধারণত এমন দেশ হয়ে, যথা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, পাঠানো হয় যেখানে বিদেশি মুদ্রার ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। পাচার রোধে সংশ্লিষ্টরা দায়িত্ববান না হলে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। সম্প্রতি মাননীয় হাই কোর্ট বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পদস্থ কর্মকর্তারাই অনেককে বেআইনি কাজে সহায়তা করছে। সরিষাতেই যদি ভূত থাকে তাহলে ভূত কীভাবে তাড়ানো হবে?

 

পাচার করা আরও হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে রয়েছে যেগুলো আনার প্রক্রিয়া চলছে, যার কথা এগমন্ট গ্রুপের শর্তের কারণে কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করতে পারছেন না। তবে সব ঠিকমতো চললে এগুলো আনা যাবে বলে আশ্বস্ত হওয়া যায়, যদি কর্মকর্তারা বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাদের ওপর বর্তিত দায়িত্ব পালন করেন। দেশপ্রেমকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখলেই আমরা পাচার করা টাকাগুলো ফিরিয়ে পেতে পারি।