আজ ৭ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

025759Tika kalerkantho pic

টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: ব্যবস্থাপনায় রাখা হবে চিকিৎসকদল

প্রথমবার্তা প্রতিবেদকঃ যেকোনো সময় দেশে এসে পৌঁছতে পারে করোনাভাইরাসের টিকা। দেশে প্রথমে আসছে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা।

 

তবে বর্তমানে দেশজুড়ে তুমুল আলোচনার বিষয় টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে। সরকারও বিষয়টির ওপর নজর রাখছে। টিকা দেওয়ার আগে মানুষের মধ্যে যাতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে অহেতুক উদ্বেগ না ছড়ায় সেদিকে তীক্ষ নজর রাখছে সরকার।

 

মানুষ যাতে স্বাভাবিকভাবে টিকা নিতে উৎসাহী হয়, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে চলতি সপ্তাহেই শুরু করা হবে বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণা। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাপনায় টিকাদানকেন্দ্র এবং হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা টিম ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রস্তুত রাখা হবে বলে জানা গেছে।

 

এদিকে টিকা দিতে যে অ্যাপস ব্যবহার করা হবে তাতে রাখা হয়নি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দ্রুত শনাক্তকরণ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অবহিতকরণ অপশনটি। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

 

তাঁরা তাগিদ দিয়েছেন দ্রুত অ্যাপসটি পূর্ণাঙ্গ করার আগে সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জন্য প্রণীত টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিরূপণ ও ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত গাইডলাইন অনুসারে টিকার অ্যাপসে একটি অপশন তৈরি করার, যাতে টিকা গ্রহণকারীরা নিজেরাই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উপলব্ধি করলে তাৎক্ষণিক ওই অ্যাপসের অপশন ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীকে অবহিত করতে পারে। তাহলে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উপশম নিশ্চিত করা সহজ হবে।

 

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টি নিয়ে গতকাল সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক কথা বলেছেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে। সেখানে তিনি বলেন, ‘যেকোনো ওষুধ বা টিকায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতেই পাবে, কিন্তু সেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাময় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে টিকায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে চিকিৎসা হবে কি হবে না—এমন প্রশ্ন তোলা ঠিক না। সরকার বিষয়টি দেখবে। আর অক্সফোর্ডের টিকায় এখন পর্যন্ত বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তথ্য নেই।’

 

মন্ত্রীর কথার সূত্র ধরে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাপনার তথ্য খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, এরই মধ্যে এ ব্যাপারে একটি গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে। সে গাইডলাইন ধরেই এগোচ্ছে সব কাজ।

 

ওই গাইডলাইনে যে পদ্ধতিতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া শনাক্ত ও প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তা অনেকের কাছে জটিল মনে হতে পারে। বিশেষ করে পরিকল্পনার মধ্যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য স্তরে স্তরে হটলাইন নম্বর ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, কিন্তু অ্যাপসে কোনো অপশন রাখা হয়নি।

 

এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, করোনা টেস্টের সময় এ ধরনের হটলাইন নম্বরে সুযোগ না পাওয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়েছিল। বারবার কল করে সাড়া না পাওয়ার অহরহ অভিযোগ ছিল। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অবহিত করতে হটলাইন ব্যবস্থার পাশাপাশি অ্যাপসের মধ্যে বাড়তি একটি অপশন রাখা জরুরি।

 

টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাপনার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. শামসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তা হলো—টিকা দেওয়ার পর কারো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা কোনো ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে যে কর্মী টিকা দিয়েছেন, তাঁকে বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে অবহিত করতে হবে। এ ছাড়া টিকাদানকেন্দ্র এবং সব হাসপাতালে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত টিম কাজ করবে।

 

প্রতিটি টিকাদানকেন্দ্র এবং হাসপাতালে থাকবে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ। টিমের সদস্যরা প্রথমে শনাক্ত করার চেষ্টা করবেন টিকা গ্রহণকারীর ওই উপসর্গ টিকা গ্রহণের কারণে নাকি অন্য কোনো কারণে।

 

সে অনুসারে তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘অ্যাপসের মধ্যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার অপশন রাখা হয়নি। এটি নিয়ে যারা কাজ করছে তাদের সঙ্গে আমি কথা বলব। এটি রাখতে পারলে খুব ভালো হয়।’

 

বাংলাদেশ ফার্মাকোলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় যে অ্যাপস ব্যবহার করা হবে তাতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অবহিত করতে একটি ঘর রাখলে ভালো হয়।

 

এটা করা কঠিন কিছু না। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় টিকা দেওয়া। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করে টিকা বিমুখ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের সবার এখন একটা কাজ করা উচিত, সবার টিকা দেওয়া নিশ্চিত করা।’

 

এ বিষয়ে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, ‘অ্যাপসে যদি বেশি ডাটার অপশন রাখা হয় তবে সেটার গতি কমে গিয়ে অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

 

এ অবস্থায় টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তারা আমাদের হটলাইনে জানাবে, আমরা আইইডিসিআর থেকেই ফলোআপ করব।’

 

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অক্সফোর্ডের গবেষণা বিভাগের তথ্যানুসারে এই টিকা নেওয়ার পর খুব জটিল কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। উপসর্গ হিসেবে টিকা দেওয়ার স্থান কিছুটা ফুলে যাওয়া, মৃদু শরীর ব্যথা, হালকা জ্বর, জ্বর জ্বর ভাব, হালকা র‌্যাশ, চুলকানি, ক্লান্তি, মাথা ব্যথা, বমি ভাব দেখা দিতে পারে।

 

যা পরে এমনিতেই সেরে যায়। এর বাইরে খুব কমসংখ্যকের মধ্যে কিছুটা অস্বাভাবিক উপসর্গ যেমন ক্ষুধামন্দা, মাথা ঘোরানো, পেট ব্যথা, ঘাম দেওয়া, লসিকাগ্রন্থি ফুলে ওঠা ইত্যাদি হতে পারে। টিকা নেওয়ার পর এসব উপসর্গ দেখা দিলে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, টিকাদানকারী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

একই পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। প্রথমবার্তাকে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে, টিকা নেওয়ার পর কোনো ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে নিজেই হাসপাতালে চলে যাওয়া। কারণ মাঠপর্যায়ের সব চিকিৎসক করোনাভাইরাসের টিকার মতো নতুন একটি টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাপনায় সঠিক মাত্রায় দক্ষ নাও হতে পারেন।’