আজ ৮ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২১শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

022843Tika kalerkantho pic

টিকা নিয়ে প্রচারণার ভাটায় অপপ্রচার

প্রথমবার্তা প্রতিবেদকঃ  গত বৃহস্পতিবার ভারত থেকে উপহারের টিকা এসেছে ২০ লাখ চার হাজার ডোজ; আজ সোমবার আসছে কেনা আরো ৬০ লাখ ডোজ। টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি, কর্মসূচি—সব ঠিকঠাক।

 

তবে করোনার এই টিকা দেওয়ার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার মতো জোরালো কোনো প্রচার-প্রচারণা কর্মসূচি এখনো শুরু করতে পারেনি সরকার। এই সুযোগে টিকা নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিমূলক ও অবৈজ্ঞানিক তথ্য, গুজব ও অপপ্রচার চলছে। বিশেষ করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের ঢেউ বইছে।

 

এই কাজে যোগ দিয়েছেন কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা এবং তাঁদের মতাদর্শের বুদ্ধিজীবীরা। তাঁরা সভা-সমাবেশে টিকা নিয়ে নানা ধরনের টিপ্পনী-কটূক্তি করছেন, মনগড়া তথ্য দিচ্ছেন নিয়মিত। সমাজের দায়িত্বশীল সুধীজনদেরও কেউ কেউ টিকা না দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যেই এক ধরনের উসকানি বা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা নিয়ে অপপ্রচার ছড়ানোর নেপথ্যে রয়েছে সরকারিভাবে সঠিক তথ্য দিয়ে প্রচার-প্রচারণার অভাব এবং সরকারবিরোধীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।

 

এ জন্য টিকা নিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে দ্রুত বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরে বড় পরিসরে প্রচার-প্রচারণা শুরুর পাশাপাশি অপপ্রচার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, কেউ গুজবে কান দেবেন না।

 

জানতে চাইলে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে টিকা দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি আরো আগেই শুরু করে দেওয়া উচিত ছিল।

 

এটা কেন হলো না বুঝতে পারছি না। ফলে ইতিমধ্যে যে অপপ্রচার শুরু হয়ে গেছে, এখন তা বন্ধে বা ঠেকানোর জন্য বাড়তি সময় নষ্ট করতে হবে। মানুষের মধ্যে অযথা বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ জন্য আজ (গতকাল) আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বৈঠকে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, দ্রুত প্রচার-প্রচারণা শুরু করতে হবে।’

 

তিনি বলেন, ‘টিকার বিষয়টি পুরোটাই বৈজ্ঞানিক। ফলে এটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা যা কিছু হবে, তা হতে হবে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে। এখানে রাজনৈতিক বক্তব্য বা উদ্ভট তথ্য প্রচার করা রীতিমতো জঘন্য কাজ হচ্ছে।’

 

অপপ্রচারের বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছেন ডা. রুহুল হক। তিনি জানান, কমিটির সভাপতি শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরো ছিলেন কমিটির সদস্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক, মুহিবুর রহমান মানিক, মো. মনসুর রহমান, মো. আব্দুল আজিজ, সৈয়দা জাকিয়া নূর, রাহিগর আল মাহি এরশাদ ও মো. আমিরুল আলম মিলন।

 

অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক বলেন, ‘যাঁরা অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করছেন যে বাংলাদেশে পাঠানো টিকা অক্সফোর্ডের নয়, এটা ভারতের তৈরি, তাঁদের উদ্দেশে বলব—আগে টিকা আবিষ্কার ও উৎপাদন সম্পর্কে জেনে তারপর কথা বলতে হবে।

 

বিশ্বে টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট। সে জন্যই অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা তাদেরকে টিকা উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে।

 

এটি ভারতীয় কোনো টিকা নয়। ফলে যাঁরা ভারতবিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে অপপ্রচারে নেমেছেন, তাঁরা রাজনৈতিক মতাদর্শ দিয়ে মানুষকে টিকা থেকে বঞ্চিত রাখার চক্রান্তে নেমেছেন। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের উচিত সঠিক তথ্য তুলে ধরা।’

 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘টিকা নিয়ে কারোরই গুজবে কান দেওয়া ঠিক হবে না। ভারতের দেওয়া অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা সব ধরনের পরীক্ষা শেষেই দেশে এসেছে। অন্যান্য টিকার তুলনায় আমাদের দেশের আবহাওয়ায় এই টিকা সবচেয়ে বেশি মানানসই। তবে যেকোনো টিকাতেই সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতেই পারে।’

 

তিনি বলেন, ‘টিকা দেওয়ার পর কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তার জন্য বিশেষ টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সুতরাং সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়ে করোনার মতো জীবনঘাতী ভাইরাস প্রতিরোধে টিকা না নেওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে টিকা নিতে সরকার কাউকে বল প্রয়োগ করবে না।’

 

তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান বলেন, ‘টিকাসংক্রান্ত প্রচারণার জন্য আমাদের তথ্য অধিদপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারাই সব কিছু করছে।’ তিনি বলেন, ‘টিকা নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যেসব অপপ্রচার চলছে, তার কোনো ভিত্তি নেই।

 

একসময় বলা হচ্ছিল টিকা আসবেই না, কিন্তু টিকা এসেছে। এখন বলছে এই টিকা নিরাপদ না, যুক্তরাজ্যে তৈরি না। তবে মানুষ ঠিকই বুঝতে পারছে, এগুলো আসলে মিথ্যা, অপপ্রচার।’

 

সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সুরত কুমার সরকার প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘আমাদেরকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এখনো খুব বেশি কোনো উপাদান দেওয়া হয়নি। মূলত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যা তৈরি করে দেবে, আমরা সেটা প্রচার করব। এ পর্যন্ত পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন গেছে, আর একটি স্ক্রল যাচ্ছে। আর যদি কিছু পাঠায়, আমরা তখন সেগুলো প্রচারের ব্যবস্থা করব।’

 

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকাকেন্দ্রিক মিডিয়া সেলের সদস্য অধ্যাপক ড. তাহমিনা শিরীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক জায়গা থেকে আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট স্তরে মতামত দিয়েছি।

 

বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তুলে ধরে সর্বাত্মক প্রচার-প্রচারণার কথা বলেছি। আশা করি, প্রচারণা শুরু হবে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয় থেকেও কিছু কাজ করছে।’

 

তিনি আরো বলেন, ‘গণমাধ্যমেরও উচিত এমন পরিস্থিতিতে কোনটি বৈজ্ঞানিক আলোচনা আর কোনটি রাজনৈতিক আলোচনা, তা বিবেচনায় নিয়ে তথ্য প্রচার করা।’

 

এদিকে বুদ্ধিজীবী, কবি-গবেষক ফরহাদ মজহার তাঁর ফেসবুক পেজে বড় এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “এটা বিলাতের অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন না, অর্থাৎ বিলাতে উৎপাদিত হয়ে বাংলাদেশে আসেনি।

 

ভারতের উৎপাদিত ভ্যাকসিন। ভারতের ড্রাগ কন্ট্রোলার কম্পানির দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এর অনুমোদন দিয়েছেন। কিন্তু তথ্যের স্বচ্ছতা এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ে খোদ ভারতেই তর্ক রয়েছে।

 

কভিড-১৯-এর ভয়াবহ সংক্রমণ মোকাবিলায় ভ্যাকসিন দরকার আছে, তাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু ভ্যাকসিন নিয়ে দিল্লির নব্য ‘উপহার কূটনীতি’ বোঝার দরকার আছে।

 

যারা নিয়মিত কাঁটাতারের বর্ডারে বাংলাদেশিদের হত্যা করে, বাংলাদেশিরা যাদের কাছে ‘উইপোকা’, তখন ঠাকুরের গান গাইতে সাধ হয়, ‘ওহে এত প্রেম আমি কোথা পাব নাথ তোমারে হৃদয়ে রাখিতে’।”

 

ফরহাদ মজহার তাঁর স্ট্যাটাসের ভেতরে উল্লেখ করেছেন, “যে দেশে গণতন্ত্র নাই, মত প্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ, শক্তিশালী কোনো বায়োমেডিক্যাল গবেষণার কার্যকর নীতি বা আইন নাই, সর্বোপরি জনগণ ভ্যাকসিনে মারা বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এবং তা প্রচার করলে সেটা ‘গুজব’ বলে শাস্তি দেবার মানবাধিকারবিরোধী ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন রয়েছে, তেমনি একটা দেশকে ভারত মানবদেহে ভ্যাকসিন পরীক্ষার জন্য বেছে নিয়েছে। দিল্লির কূটনৈতিক বুদ্ধির তারিফ না করে পারা যাচ্ছে না।”

 

বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলোর অনেক নেতাই টিকা নিয়ে নানা ধরনের কটূক্তি ও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী টিকা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি করেছেন।

 

তাঁর কটূক্তির জবাবে দুই দিন আগে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ এক অনুষ্ঠানে বক্তব্যের মাঝে বিএনপির সমালোচনা করতে গিয়ে আগে বিএনপিকে টিকা দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানান।

 

এর জবাবে গতকাল রিজভী বলেছেন, ‘খুন, গুম দিয়ে বিএনপিকে নিধন করার চেষ্টা করেছিল, এখন ভ্যাকসিনের নিরাপত্তার জন্য বিএনপিকে আগে দিয়ে নিধন করার চেষ্টা চলছে।’