আজ ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৯শে মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

টিকা

টিকা নেওয়া বাড়ছে, নজর পরের চালানে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: হাতে থাকা ৭০ লাখ ডোজ টিকা নিয়ে দেশে চার দিন ধরে চলছে টিকা দেওয়া। এই ৭০ লাখ ডোজের মধ্য থেকে প্রথম মাসে ৬০ লাখ ডোজ টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

 

পরে সেখান থেকে সরে এসে প্রথম মাসে ৩৫ লাখ ডোজ টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করা হয়। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ডোজের মেয়াদ দুই দফা পরিবর্তন হয়। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল প্রথম ডোজের চার সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে।

 

পরে তা পাল্টে আট সপ্তাহে নেওয়া হয়। গত ৬ ফেব্রুয়ারি আবার সেই সিদ্ধান্ত থেকে পুরনো চার সপ্তাহেই ফিরে যাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যাঁরা এখন টিকা নিচ্ছেন তাঁরা দ্বিতীয় ডোজ পাবেন চার সপ্তাহ পর। পরিকল্পনার এমন অদলবদলের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, সেরাম থেকে সরকারের কেনা টিকার দ্বিতীয় চালান কবে আসবে।

 

তবে এরই মধ্যে সুসংবাদ মিলেছে কোভ্যাক্স থেকে। চলতি মাসের শেষ দিকেই কোভ্যাক্স থেকে এক কোটি ২৭ লাখ ডোজ টিকা দেশে আসার কথা রয়েছে।

 

সেই সঙ্গে সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে বেক্সিমকোর মাধ্যমে সেরাম থেকেও চলতি মাসে দ্বিতীয় লটের ৫০ লাখ টিকা চলে আসবে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এ মাসেই এক কোটি ৭৭ লাখ ডোজ টিকা দেশে আসার কথা, যার সবই অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার। আর সব টিকাই আসছে সরকারের জন্য; সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার জন্য।

 

এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে পৌনে দুই লাখ মানুষের টিকা দেওয়া হয়েছে। গতকাল এক দিনেই লাখ ছাড়িয়েছে টিকা গ্রহণকারীর সংখ্যা। আর রাত পর্যন্ত টিকা নিতে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাত লাখ।

 

স্বাস্থ্যসেবা সচিব মো. আব্দুল মান্নান গতকাল গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘চলতি মাসের শেষ দিকে কোভ্যাক্সের টিকা দেশে আসবে।’স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘কোভ্যাক্স থেকে তো টিকা আসছেই, বেক্সিমকো আমাদের জানিয়েছে তাদের মাধ্যমে যে টিকা আমরা নিচ্ছি তার দ্বিতীয় লটের ৫০ লাখও সময়মতোই চলে আসবে।’

 

এদিকে দেশের প্রাইভেট সেক্টর থেকে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার শুরু হয়েছে সরকারি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রাইভেট সেক্টরের হাসপাতালগুলোতেও টিকাদান কার্যক্রম শুরুর জন্য। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে নীতিমালা ঠিক হয়নি। কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে মাত্র।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, কোনো কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে থাকা টিকা থেকেই নির্দিষ্ট সংখ্যায় টিকা নিতে চায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে শর্ত দেওয়া হচ্ছে, সরকার প্রাইভেট সেক্টরে টিকা দিলে সেই টিকা বিনা মূল্যে দিতে হবে এবং টিকা দেওয়ার নামে কোনো সার্ভিস চার্জ নেওয়া যাবে না। কিন্তু এই শর্তে রাজি হচ্ছে না প্রাইভেট সেক্টর। ফলে বিষয়টি ঝুলে আছে।

 

প্রাইভেট কোনো কম্পানির মাধ্যমে এখনো দেশে টিকা কিনে আনার পথ তৈরি হয়নি। এমনকি সেরাম থেকেও এখন পর্যন্ত সরকারের বাইরে প্রাইভেটভাবে টিকা সরবরাহ শুরু হয়নি। কিন্তু দেশে বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও বেশ কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠান এত দিন প্রাইভেট মার্কেটের টিকার জন্য চেষ্টা করছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, প্রাইভেটের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে, নীতিমালার খসড়া তৈরি হয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ে আছে। এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

 

তবে দেশে টিকা সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া, সেই সঙ্গে এখন পর্যন্ত টিকা দেওয়া স্বচ্ছন্দভাবে চলায় অনেকেই প্রাইভেটের অপেক্ষায় না থেকে সরকারি নিবন্ধন করা শুরু করেছেন। গত তিন দিনে এমন অনেকে টিকা নিয়েছেন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বড় ওষুধ কম্পানির উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘সরকারি ব্যবস্থাপনায় টিকা পাওয়া যে এত সহজ হবে এবং একই টিকা সবাই দেবে এটা আগে বুঝতে পারিনি।

 

তবে আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানের তিন শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য আলাদাভাবে প্রাইভেট কম্পানির টিকার জন্য বুকিং দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই টিকা কবে আসবে তার কোনো হদিস পাচ্ছি না।

 

আবার এখন যে টিকা দেওয়া হচ্ছে আর আমাদের বুকিংয়ের টিকা সেরাম ইনস্টিটিউটেই তৈরি একই টিকা। তাই এখন আর কেউ অপেক্ষা করতে চায় না। আমরা এরই মধ্যে কয়েকজন নিবন্ধন করে টিকা নিয়ে ফেলেছি।’

 

এখন পর্যন্ত সেরামে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আর রাশিয়ার এক হাজার ডোজ স্পুিনক-ভি টিকা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মীদের জন্য আনা ছাড়া আর কোনো টিকা বাংলাদেশে আসা নিশ্চিত হয়নি।

 

ভেতরে ভেতরে কোনো কোনো কম্পানি চেষ্টা করছে অনেক দিন ধরেই। কিন্তু ওই চেষ্টা গতি পাচ্ছে না নানা কারণে। এর মধ্যে একটি কম্পানি মডার্নার টিকা আনার কাজ অনেকটাই গুছিয়ে এনেছে।

 

পাশাপাশি ফাইজারের টিকা আনার কাজ এগোচ্ছে বলে জানা গেছে। এর সঙ্গে আছে জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা দেশে আনার চেষ্টার খবরও। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এর কোনোটিই নিশ্চিত করতে পারেনি।

 

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা শাখার পরিচালক ডা. মিজানুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুসারে দেখা যায়, প্রথম দুই দিন কিছুটা কম থাকলেও তৃতীয় দিনে এসেই টিকা দেওয়ার গতি বেড়েছে।

 

গতকাল এক দিনেই সারা দেশে টিকা নিয়েছেন এক লাখ এক হাজার ৮২ জন। গত তিন দিনে এবং ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি মিলিয়ে দেশে এ পর্যন্ত টিকা নিয়েছেন এক লাখ ৭৯ হাজার ৩১৮ জন।

 

এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৭ হাজার ৯২৩ জন টিকা নিয়েছেন ঢাকা বিভাগে। ঢাকা মহানগরীতে মোট টিকা নিয়েছেন ২৫ হাজার ৩৩৩ জন। এর মধ্যে গতকাল ঢাকা মহানগরীতে টিকা নিয়েছেন ১২ হাজার ৫১৭ জন।

 

মোট টিকা গ্রহণকারীর মধ্যে এক লাখ ৩৪ হাজার ৭৩৫ জন পুরুষ ও ৪৪ হাজার ৫৮৩ জন নারী। এ ছাড়া এ পর্যন্ত মোট টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল ২০২ জনের মধ্যে। যাঁরা সবাই সুস্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।