আজ ৩০শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৩ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

040145Tika 02 kalerkantho pic 1

টিকা বিতরণের সব বাধা ভেঙে ফেলতে হবে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: কভিড-১৯-এর সঙ্গে লড়াই করে একটি বছর পার করার পর আমরা এখন বিশ্বব্যাপী অনেক কার্যকর টিকা বাজারে আসতে দেখছি। এই টিকাগুলোর মধ্যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা রয়েছে, যার উদ্ভাবন প্রক্রিয়ায় আমিও অংশ নিয়েছি। এখন আশা করা হচ্ছে যে মানুষ জানতে চাওয়া শুরু করবে—জীবনযাত্রা কবে স্বাভাবিক হবে।

স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মূল ইঙ্গিতটা পাওয়া যাবে যদি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর থেকে চাপটা কমতে শুরু করে। এখন পর্যন্ত একটা লক্ষণ ইতিবাচক যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, জনসন অ্যান্ড জনসন, নোভাভ্যাক্স, মডার্না ও ফাইজার-বায়োএনটেক টিকা মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো অবস্থা থেকে প্রায় সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়ার তথ্য দিচ্ছে। এমনকি যেসব দেশে ভাইরাসটির নতুন ধরন রয়েছে, সেখানেও এগুলো কার্যকর। তবে এই ভালো খবরের বিপরীতে বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী টিকাবিহীন থেকে যাচ্ছে। এসব মানুষকে গুরুতর রোগ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আমাদের অবিলম্বে টিকার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের এই অবস্থায় রেখে না দিয়ে আমাদের এবং আমাদের রাজনীতিবিদদের অবশ্যই টিকা বিতরণের সব বাধা ভেঙে ফেলতে হবে।

আলোচ্য বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক যে আমরা ভাইরাসটির নিত্যনতুন ধরনের উত্থান দেখছি। ভাইরাসের এই মিউটেশনগুলো (রূপান্তর) এমন জনগোষ্ঠীতে উদ্ভূত হতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে মানুষের বড় একটা অংশ আক্রান্ত হয়েছে, যার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের প্রাসঙ্গিক প্রতিরোধব্যবস্থাও (ব্যাকগ্রাউন্ড ইমিউনিটি) গড়ে উঠেছে। ফলে ভাইরাসটিকে বেঁচে থাকার জন্য নিজেকে পরিবর্তন করে নিতে হচ্ছে। আমরা দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলে যে মিউটেশন দেখছি, তাতে ভাইরাসটি এরই মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করা ব্যক্তিদেরও আক্রান্ত করতে পারছে। ফলে মানুষকে হয় প্রাকৃতিক সংক্রমণ কিংবা টিকার দিকে যেতে হবে।

তবে কিছুটা উদ্বেগ সত্ত্বেও আশাবাদ থাকা উচিত। কারণ ভাইরাস আমাদের মেরে ফেলার জন্য আসেনি। এর মূল কাজ হচ্ছে বেঁচে থাকার জন্য ছড়িয়ে পড়া এবং তার সর্বোচ্চ প্রয়োজনেই আমাদের বেঁচে থাকা দরকার। বাস্তবে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। সংক্রমণ ও টিকাদানের ফলে বেশির ভাগ মানুষ শক্তিশালী টি-সেল রেসপন্স (যা একবার শুরু হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ) এবং অন্যান্য ধরনের বাইন্ডিং অ্যান্টিবডি (যা আক্রান্ত কোষকে টার্গেট করে মেরে ফেলতে পারে) উৎপন্ন করে। এই টি-সেল ও বাইন্ডিং অ্যান্টিবডি গুরুতর রোগ প্রতিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে মিউটেশনের দ্বারা তা সামান্য প্রভাবিত হওয়া স্বাভাবিক, যেটা আমরা দেখছি।

যাই হোক, এই নতুন ধরনের ভাইরাসের চলমান সংক্রমণ আগামী বছরগুলোতে প্রাকৃতিকভাবে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জিত এবং টিকাপ্রাপ্ত উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেই ঘটতে পারে। নতুন মিউটেশন নাক ও গলায় চলমান সংক্রমণ বৈশিষ্ট্যও অব্যাহত রাখবে তার টিকে থাকার জন্য। আর করোনাভাইরাসগুলো মানবজাতির খুব সাধারণ বিষয় এবং আমাদের প্রায় সবাই শৈশবে করোনাভাইরাসগুলোতে আক্রান্ত হয়েছি এবং আমরা এখনো পুনঃ আক্রান্ত হই। এর মধ্য দিয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের জীবনভর প্রতিরোধক্ষমতারও উন্নতি ঘটে। এটাই মহামারি করোনাভাইরাসের ভবিষ্যৎ নমুনা।

এই পরিস্থিতি ভাইরাসটির মিউটেশন ক্ষমতার কারণে আমাদেরও হয়তো এর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের সম্ভবত ভাইরাসটির পরিবর্তন কিংবা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে বছর অন্তর হালনাগাদ টিকার প্রয়োজন হতে পারে। যদি টিকার বর্তমান প্রজন্মটির মাধ্যমে ভবিষ্যতে গুরুতর রোগ ও হাসপাতালে ভর্তি থেকে সুরক্ষা বজায় রাখা যায়, তাহলে হয়তো আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর থেকে চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। সেই অর্থে মহামারির সমাপ্তি দেখা সম্ভবও হতে পারে। আবার বর্তমান প্রজন্মের টিকার প্রকৃত বৈশ্বিক প্রভাব মূল্যায়নে ব্যস্ত থাকলেও উদ্ভাবকরা এর মধ্যে পরবর্তী প্রজন্মের টিকা নিয়েও কাজ শুরু করেছেন, যাতে নতুন ভ্যারিয়েন্টগুলোকে আরো ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যদি প্রয়োজন হয়। সুতরাং আশার কারণ অবশ্যই আছে; কিন্তু এটি মোটেও আত্মতুষ্টির সময় নয়।

লেখক : অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের প্রধান এবং করোনাভাইরাস টিকার অক্সফোর্ড কার্যক্রমের প্রধান পরীক্ষক। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় ২৪ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন