আজ ২৭শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১০ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

poribohon

দিনে বাসচালক ও হেলপার, রাত হলেই ভয়ংকর ডাকাত

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:‌রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় বাসচালক ও তার সহকারীর (হেলপার-সুপারভাইজার) বেশ ধরে সক্রিয় রয়েছে ভয়ংকর কয়েকটি ডাকাতচক্র। সারাদিন যাত্রী টানলেও সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় তাদের ডাকাতির মিশন, চলে সারা রাত। গাবতলী, আমিনবাজার, সাভার, নবীনগর, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের সড়কগুলোতে এসব চক্র বেশি সক্রিয়। এদের একেকটি দলে ৭ থেকে ১৫ জন সদস্য থাকে। গভীর রাত পর্যন্ত চলা ডাকাতির মিশনে তারা যাত্রীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় সর্বস্ব। আর ডাকাতির সময় বাধা দিলে বা চিৎকার করলে তার মৃত্যু অবধারিত। খুন করে রাস্তার পাশের ঝোপঝাড়ে ফেলে দেওয়া হয় মরদেহ।

এদিকে বাসের ড্রাইভার, হেলপার ও যাত্রীবেশে ডাকাতি করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ সহজেই ফাঁকি দিতে পারে এসব ডাকাতচক্রের সদস্যরা। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দুয়েকজন গ্রেফতার হলেও থামে না তাদের তৎপরতা। এছাড়া এসব ডাকাতির ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানায় মামলাও করেন হাতেগোনা। শুধু বড় ধরনের জখম বা খুনের ঘটনা ঘটলেই থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী ও তার স্বজনরা। আর থানায় অভিযোগ করলেও তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না পুলিশ।

গত ৫ অক্টোবর সাভারের বলিয়ারপুরে রাস্তার পাশের ঝোপ থেকে উদ্ধার হয় একটি মরদেহ। উদ্ধার হওয়া মরদেহ ছিল হোটেল ব্যবসায়ী লস্কর রবিউল ইসলামের (৪২)। এ ঘটনায় হওয়া মামলার তদন্তে নেমে পরিবহন শ্রমিকের বেশে বাসে ডাকাতির একাধিক চক্রের সন্ধান পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একই সঙ্গে পিবিআইয়ের তদন্তে চিহ্নিত হয় আসবাবপত্র ব্যবসায়ী মাইদুল ইসলামকে নির্যাতনকারী ডাকাতরা। গত ২৪ জুলাই মধ্যরাতে সাভারের হেমায়েতপুরে বাসে ডাকাতদের কবলে পড়েন তিনি।

ডাকাতির শিকার মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘রাত ২টার দিকে গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাট যাওয়ার জন্য হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি ‘অফিস স্টাফ’ লেখা বাসে উঠি। বাসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাসচালকসহ সাত-আটজন লোক আমার হাত, পা, চোখ বেঁধে বাসের মেঝেতে শুইয়ে ফেলে এলোপাতাড়ি মারধর করতে থাকে। আমার কাছে থাকা মোবাইল সেট, কাপড়চোপড়, নগদ টাকা এবং বিকাশে থাকা টাকাসহ প্রায় ৫৬ হাজার টাকা নিয়ে সাভারে তুরাগ নদীর পাড়ের রাস্তার পাশে ফেলে দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ডাকাত দলের নির্মম নির্যাতনের চার দিন পর কিছুটা সুস্থ হয়ে সাভার থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করি। কিন্তু এক মাস পার হলেও থানা থেকে কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তাই বাধ্য হয়ে ঘটনার এক মাস পর আদালতে মামলা করি। পরে পিবিআই আসামি গ্রেপ্তারের পর গত ২৫ অক্টোবর সাভার থানায় মামলা করি।’

পিবিআইয়ের অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে পরিবহন শ্রমিক বেশে ডাকাতির ভয়ংকর চিত্র।  গ্রেফতার হওয়া একটি চক্রের হোতা বশির মোল্লার বিরুদ্ধে অন্তত আটটি ডাকাতি ও অস্ত্র মামলা আছে। সে শতাধিক ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে স্বীকার করেছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছয় থেকে সাতটি ডাকাতচক্র এভাবে বাস ভাড়া নিয়ে ডাকাতি করে থাকে বলে পিবিআইয়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমিনবাজার, সাভার, নবীনগর, আশুলিয়া ও ধামরাইসহ রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকাতে মাঝেমধ্যেই নির্জন সড়কের পাশে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ পাওয়া যায়। এদের অনেকেই ডাকাতচক্রের হাতে পড়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ডাকাতচক্রের সদস্যরা সবাই মাদকাসক্ত ও খুবই হিংস্র। মানুষকে নির্মমভাবে মারতে একটুও দ্বিধা করে না তারা।’

বাসে যেভাবে হচ্ছে ডাকাতি : বাস ডাকাতচক্রের বিষয়ে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই থেকে তিন দিনের জন্য বাস ভাড়া নেয় এসব চক্র। কোনো কোনো চক্র আবার গার্মেন্টসের স্টাফ বাসের চালককে দলে ভেড়ায়। যারা দিনে যাত্রী টানে আর রাতে করে ডাকাতি। বড় বাসে ২০ থেকে ২৫ জন আর ছোট মিনিবাসে ৭ থেকে ৮ জন ডাকাত থাকে। এরা প্রতি আসনে একজন করে বসে। তাদের সঙ্গে কাপড়, রশি ও ধারালো অস্ত্র থাকে। যাত্রাপথে বিভিন্ন ফাঁকা বাসস্ট্যান্ড থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সিঙ্গেল (একা) যাত্রী বাসে তোলে তারা। একসঙ্গে দুই বা তিনজন থাকলে বাসে তোলা হয় না। একাধিক যাত্রী একসঙ্গে উঠতে চাইলে দুর্ব্যবহার করে নামিয়ে দেওয়া হয়। একজন যাত্রী বাসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জানালা-দরজা ও লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর চালক দ্রুত বাস চালাতে থাকে। আর ওই যাত্রী কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুখ বেঁধে তাকে বেদম মারধর করা হয়। তার কাছে থাকা সবকিছু নিয়ে ফাঁকা রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে ডাকাতরা। এ সময় ওই যাত্রী কোনো ধরনের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে খুন করে রাস্তার পাশের ঝোপে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। প্রতিটি ঘটনা ঘটাতে সবমিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট সময় নেয় ডাকাতরা। টানা তিন-চার দিন ডাকাতি করে দুর্গম এলাকায় চলে যায় তারা। যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ধরতে না পারে।

পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সালেহ ইমরান বলেন, ‘সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া ডাকাতদের বিষয়ে অনুসন্ধান করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে ডাকাতি করে আসছে। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে ছয় থেকে সাতটি মামলা রয়েছে।’ এ পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এসব ডাকাত সবাই মাদকাসক্ত। মাদকের টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা ডাকাতি করে বলে জানিয়েছে। চক্রের অন্য সদস্যরা গা ঢাকা দিয়েছে। আগেও বিভিন্ন অপকর্ম করে এরা গ্রেপ্তার হয়েছে। পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার একই কাজ করে।’

  

রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় পরিবহন শ্রমিকের বেশে ডাকাতির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘আমাদের এলাকায় যেকোনো অপরাধ রুখতে পুলিশের টহল অব্যাহত আছে, সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা আছে।  ইতোপূর্বে প্রায় সব অপরাধমূলক ঘটনার রহস্য আমরা উদঘাটন এবং অপরাধ বন্ধ করেছি। আমাদের তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। কেউ অপরাধ করে পার পাবে না।’  সূত্র : দেশ রূপান্তর