আজ ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৭ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

দীপন

দীপন হত্যায় ৮ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: প্রায় ছয় বছর পর জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ও ব্লগার ফয়সল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলার রায় দেওয়া হয়েছে। মামলার আট আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তাঁরা নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য বলে জানানো হয়েছে। দণ্ডিতদের মধ্যে জঙ্গি সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রধান ও সেনাবাহিনীর বরখাস্তকৃত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়াসহ দুজন পলাতক।

 

গতকাল বুধবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেওয়া আসামিদের সবাইকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।

 

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে বাকি সাতজন হলেন মইনুল হাসান শামীম ওরফে সামির ওরফে ইমরান, আবদুর সবুর সামাদ ওরফে সুজন ওরফে রাজু ওরফে সাদ, খাইরুল ইসলাম ওরফে জামিল ওরফে জিসান, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাব, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন ওরফে শাহরিয়ার, শেখ আব্দুল্লাহ ওরফে জুবায়ের ওরফে জায়েদ ওরফে জাবেদ ওরফে আবু ওমায়ের ও আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব ওরফে আবির ওরফে আদনান ওরফে আব্দুল্লাহ।

 

দেশে লেখক, প্রকাশক, ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর হামলার ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর দীপনকে হত্যা করা হয়। রাজধানীর শাহবাগের আজিজ কো-অপারেটিভ সুপারমার্কেটের তিনতলায় নিজের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে কুপিয়ে, গলা কেটে তাঁকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছিল আনসার আল ইসলাম। একই দিন লালমাটিয়া এলাকায় শুদ্ধস্বর নামের একটি প্রকাশনীর কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান।

 

জাগৃতি ও শুদ্ধস্বর প্রকাশনী লেখক অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশ করে। অভিজিৎকেও একই বছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আক্রান্ত হন তাঁর স্ত্রীও। এই ঘটনায়ও আনসার আল ইসলামের নাম আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের ছেলে দীপন। দুই আসামিকে পলাতক দেখিয়ে বিচার শুরুর এক বছর তিন মাসের মাথায় আলোচিত এই মামলার রায় হলো।

 

গতকাল সকাল ৮টার দিকে কাশিমপুর কারাগার থেকে ছয় আসামিকে আদালতে আনা হয়। তাঁদের কারাগারের গারদে রাখা হয়। সাকাল সোয়া ১১টায় গারদ থেকে প্রিজন ভ্যানে করে তাঁদের আদালতে আনা হয়। এ সময় তাঁদের গায়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও মাথায় হেলমেট ছিল। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাঁদের এজলাসে তোলা হয়। এজলাসে ছয় জঙ্গি নিজেদের মধ্যে খোশগল্প শুরু করেন। মাঝে মাঝে তাঁরা হাসছিলেন। দুপুর ১২টার পর বিচারক রায় পড়া শুরু করেন। ১২টা ১০ মিনিটে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের সাজার আদেশ দিয়ে রায় ঘোষণা শেষ করেন। এরপর আসামিদের আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

 

৫৩ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক বলেন, লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকদের হত্যার অংশ হিসেবে অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশের জন্য জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার দীপনকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হলেন চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়া। তাঁর মূল কাজ ছিল জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং মূল হত্যাকারীদের অর্থায়ন করা। আর দীপন হত্যার পরিকল্পনা করেন আসামি আকরাম হোসেন। আরেক আসামি মইনুল হাসান শামীম অস্ত্র সংগ্রহ, খুনের পরামর্শ এবং মূল হত্যাকারীদের দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব দেন।

 

আসামি মোজাম্মেল হুসাইন সায়মন দীপন হত্যার পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ ও ঘটনাস্থল রেকি করেন। অন্য আসামি মো. আবদুর সবুর সামাদ হত্যাকারীদের প্রশিক্ষণ এবং আসামি মো. সিদ্দিক সোহেল ও খাইরুল ইসলাম ঘটনাস্থল রেকি করেন। আসামি মো. শেখ আব্দুল্লাহ অর্থ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আনা-নেওয়া করে দীপন হত্যাকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের অভিন্ন অভিপ্রায় ছিল ব্লগার, প্রকাশক ও সমকামীদের হত্যার অংশ হিসেবে ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা।

 

কাজেই আসামিদের কারো ভূমিকা ছোট-বড় করে দেখার সুযোগ নেই। যাঁরা বই প্রকাশের দায়ে মানুষ হত্যা করতে পারেন, তাঁরা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু। দীপন হত্যায় অংশগ্রহণকারী অপরাধীরা বেঁচে থাকলে আনসার আল ইসলামের বিচারের বাইরে থাকা সদস্যরাসহ অন্য সদস্যরা একই অপরাধ করতে উৎসাহী হবেন। তাই প্রত্যেক আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং এটা হবে একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। এতে একদিকে নিহত ব্যক্তির আত্মীয়রা মানসিক শান্তি পাবেন, অন্যদিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করতে অন্যরা ভয় পাবে এবং নিরুৎসাহ হবে।

 

রায় শুনে দীপনের স্ত্রী ডা. রাজিয়া রহমান বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরে কাঁদতে শুরু করেন। এ সময় তাঁকে সান্ত্বনা দেন স্বজনরা। পরে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আজকে আমরা যে রায় পেয়েছি, এর জন্য সংশ্লিষ্ট যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’ রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

 

রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) গোলাম সারোয়ার খান জাকির। আসামিপক্ষে ছিলেন এ বি এম খাইরুল ইসলাম লিটন ও এম নজরুল ইসলাম।

 

অ্যাডভোকেট জাকির বলেন, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। এ জন্য আদালত আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এই রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট।’

 

আসামিপক্ষের আইনজীবী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এই মামলায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা কেউ এই হত্যার সাথে জড়িত নয়। এমনকি তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেনি। এ ছাড়া আদালতে সাক্ষীদের কেউ জবানবন্দিতে আসামিদের জড়িত থাকার কথা বলেনি। এখানে রাষ্ট্রপক্ষ কোনোভাবেই মামলাটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি। এ রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।’

 

রক্তাক্ত ২০১৫ : দেশে লেখক, প্রকাশক, ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর হামলার ঘটনার শুরু ২০০৪ সালে। ওই বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক হুমায়ুন আজাদকে কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে ১২ আগস্ট তিনি মারা যান। এরপর ২৪ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউনুসকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি হত্যা করা হয় ব্লগার রাজীব হায়দারকে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের শুরুর পর ওই দিন রাতে তিনি পল্লবী এলাকায় তাঁর বাসার কাছে আক্রান্ত হন।

 

২০১৪ সালেও বেশ কয়েকজন আক্রান্ত হন। তবে ২০১৫ সাল ছিল বিভীষিকাময়। ওই বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি লেখক অভিজিৎ রায়কে টিএসসি এলাকায় কুপিয়ে হত্যার পর একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটে চাপাতি হামলায়। ওই বছর অন্তত ২২ জনকে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে নব্য জেএমবি, আনসার আল ইসলামসহ নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের নাম আসে।

 

কার্যালয়ে দীপনের লাশ : দিনটি ছিল ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর। আজিজ সুপারমার্কেটের তিনতলার ১৩০ নম্বর কক্ষ। এটিই দীপনের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জাগৃতির কার্যালয়। দরজা বন্ধ, ভেতরে আলো জ্বলছে। বিকেল ৪টার দিকে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ওই কক্ষের সামনে এসে দরজা বন্ধ দেখে চলে যান। লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে হামলার খবর শুনে তিনি লোকজন নিয়ে আবার ছেলের কার্যালয়ে আসেন।

 

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সেদিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, দুপুর দেড়টা পর্যন্ত দীপন তাঁর সঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু দুপুরের খাবার না খেয়ে শাহবাগের কার্যালয়ে যাচ্ছেন বলে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এরপর একাধিকবার ফোন করে বন্ধ পাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি চলে আসেন শাহবাগে। এরপর দরজা খুলে দেখতে পান ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন।

 

দীপন ছিলেন অভিজিৎ রায়ের বন্ধু। তাঁরা দুজন উদয়ন স্কুলে পড়তেন। দীপনের প্রকাশনী থেকে বিজ্ঞান লেখক অভিজিতের ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ ও ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ বই দুটি প্রকাশিত হয়।লাশ উদ্ধারের পর ২ নভেম্বর দীপনের স্ত্রী ডা. রাজিয়া রহমান শাহবাগ থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

 

মামলার পর বিভিন্ন সময় ছয় আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে মোজাম্মেল হুসাইনসহ কয়েকজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সহকারী পুলিশ সুপার মো. ফজলুর রহমান আটজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর মামলাটির অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। ২৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা, যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গত ২৪ জানুয়ারি রায় ঘোষণা দিন ধার্য করেন আদালত। সে অনুযায়ী গতকাল রায় দেওয়া হলো।

 

উল্লেখ্য, দীপন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আসামিরা জবানবন্দি দিয়ে স্বীকার করেছেন যে অভিজিৎ খুনেও আনসার আল ইসলাম জড়িত ছিল। আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণার দিন রয়েছে। এই মামলায়ও আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান জিয়া আসামি।

মন্তব্য