আজ ৮ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২১শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

032703Mollah kalerkantho pic

‘দ্বিতীয় ঘর’ ছেড়ে যাচ্ছেন মোল্লা

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন। শব্দগুলো প্রতিধ্বনি হয়ে লোকটির কানে বাজে বারবার। এফডিসির রঙিন আঙিনায় তাঁর কেটেছে প্রায় পাঁচ দশক। বাংলা ছবির আঁতুড়ঘরটাই ছিল মোল্লা আব্দুল মান্নানের (৭৫) ‘দ্বিতীয় ঘর’। তাই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (বিএফডিসি) তাঁর কাছে ভীষণ মায়াবী চত্বর, চুম্বক ভালোবাসার নাম।

১৯৭২ সালে ২৫ বছর বয়সে এফডিসিতে নোঙর করেন মোল্লা। সেখানেই ঝালমুড়ির পসরা সাজান। কখন যে জীবনের শেষ বেলায় এসে পৌঁছলেন, টেরই পেলেন না। রাজ্জাক-শাবানা থেকে ববিতা-আলমগীর, মৌসুমী-সালমান শাহ থেকে শাবনূর-রিয়াজ কিংবা হালসময়ের শাকিব-বুবলী—মোল্লার ঝালমুড়ির স্বাদ থেকে বাদ পড়েননি কেউই।

এবার যে মোল্লার ভালোবাসার ঘর এফডিসিকে বিদায় জানানোর পালা। ফিরবেন আপন নীড়ে, কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের মির্জাপুর গ্রামে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এফডিসির একদল তরুণ বিনোদন সাংবাদিক মোল্লার বাড়ি ফিরে যাওয়ার এই মাহেন্দ্রক্ষণে আয়োজন করেছে তিন দিনের ‘মোল্লার মুড়ি উৎসব’। গতকাল রবিবার ছিল সেই আয়োজনের শেষ দিন। এই উৎসব থেকে পাওয়া টাকা তুলে দেওয়া হবে মোল্লার হাতে। সেই টাকা নিয়েই মোল্লা ফিরবেন বাড়ি। সব কিছু ঠিক থাকলে মোল্লা আজ কিংবা কাল রওনা দেবেন কুমিল্লার পথে।

জানা যায়, অর্ধশতাব্দী আগে মোল্লা আব্দুল মান্নান এফডিসিতে বিনা পারিশ্রমিকে খাদেম হিসেবে কাজ শুরু করেন। এখনো তিনি সেই পেশায় নিয়োজিত আছেন। পাশাপাশি ঝালমুড়ি বিক্রি করে চলছিল তাঁর সংসার। তবে এখন তিনি অসুস্থ, হাতে-পায়ে আর আগের মতো শক্তি নেই। প্যারালাইসিসে অবশ হয়ে গেছে শরীরের একপাশ। এক হাত দিয়েই করতে হয় সব কাজ। তার ওপর মহামারি করোনা। সব মিলিয়ে জীবনের শেষ ধাপে এসে মোল্লা ছাড়তে চান রঙের শহর ঢাকা। গ্রামে ফিরে দিতে চান ছোট্ট একটি দোকান, কিন্তু সেখানেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকা। দোকান সাজাতেও প্রয়োজন এক লাখ টাকা।

এ রকম প্রেক্ষাপটে মোল্লাকে আর্থিক সহযোগিতার জন্য মাজহার বাবু, আহম্মেদ তেপান্তর, রাহাত সাইফুল, এ এইচ মুরাদ, আসিফ আলম, রঞ্জু সরকার, রুহুল আমিন ভূঁইয়াসহ বেশ কয়েকজন চলচ্চিত্র সাংবাদিক এগিয়ে আসেন। তাঁদের আয়োজনে গত শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে এফডিসিতে শুরু হয় মুড়ি উৎসব, যা চলে রাত ৮টা পর্যন্ত। তিন দিনের এই আয়োজনের শেষ দিনে গতকাল উৎসবে অংশ নেন চলচ্চিত্রের একঝাঁক তারকা, পরিচালকসহ অন্য শিল্পীরা। উৎসবে মোল্লা মুড়ি বিক্রি করেন। তাঁকে সহযোগিতা করতে সবাই মোল্লার কাছ থেকে সৌজন্য মূল্যে মুড়ি কিনেছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় দিনের মতো গতকালও দারুণ সাড়া পড়ে উৎসবে।

মোল্লাকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন অরুণা বিশ্বাস, জায়েদ খান, ইমন, আলমগীর, বাপ্পী চৌধুরী, নাসরিন, নিপুণ, বিপাশা কবির, হুমায়রা সুবাহ, আদর আজাদসহ অনেকে। পাশাপাশি পরিচালকদের মধ্যে শামীমুল ইসলাম শামীম, শাহ আলম কিরন, শাহীন সুমন, সাইমন তারিক, আরিফুর জামান আরিফ, জসিম উদ্দিন জাকির, আবু রায়হান জুয়েল, রফিক সিকদার, শফিক হাসান, নাসির উদ্দিন মাসুদ এবং প্রযোজক রাজীব সারোয়ার, রিজভী, নজরুল রাজ, এস এইচ ভিশন, সিডাব, সানোয়ার, রুবেলসহ আরো অনেকে।

এফডিসি ফেলে গ্রামে গিয়ে মন টিকবে কি না, এমন জিজ্ঞাসায় চোখ ছলছল মোল্লার। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই জায়গাটার প্রতি টান ছিল বলেই যুবকবেলায় এসে এখানে উঠেছিলাম। অনেক মায়া জন্মেছে এফডিসি ঘিরে। এইখানে অনেক স্মৃতি। আমার জীবনের অনেক সুখ আর দুঃখ লেখা আছে এখানে। এই মায়া ছেড়ে আমি যেতে চাইনি কোনো দিন। তবে এখন না গিয়েও তো আর উপায় নেই আমার।’ তিনি বলেন, ‘যাওয়ার পর প্রথম প্রথম অনেক খারাপ লাগবে। কারণ এফডিসিকে আমি আমার নিজের ঘরবাড়ি বলেই ভাবতাম চিরকাল। তবুও আজ যেতে হবে, কারণ শরীরে আর কুলায় না। তবে গ্রামে গিয়ে যখন মন খারাপ লাগবে তখন আবার এসে এফডিসি ঘুরে যাব।’