আজ ৩রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৭ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

164010Kamrul Islam Noakhali Dudok 1

নিম্ন আদালতের রায় বাতিল, সাজা থেকে অব্যাহতি নির্দোষ কামরুলকে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:দুদকের ভুল তদন্তের শিকার নোয়াখালীর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতের সহকারী নিরপরাধ মোহাম্মদ কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দেওয়া রায় বাতিল করে তাকে সাজা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে শিক্ষাগত সনদ জালিয়াতির মামলায় পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিম্ন আদালতের জারি করা সাজা পরোয়ানা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়াও নিরপরাধ কামরুল যদি ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তবে তা দুদককে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।

বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ নির্দেশ দেন। নিরাপরাধ মোহাম্মদ কামরুল ইসলামের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মিনহাজুল হক চৌধুরী। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান।

রায়ের আগে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে দুদকের আইনজীবী বলেন, এটা এই তদন্ত কর্মকর্তার জীবনের প্রথম চার্জশিট (অভিযোগপত্র)।

এ সময় আদালত বলেন, প্রথমটাই তো তার ভালো মতো করা উচিত ছিলো।

দুদকের আইনজীবী বলেন, আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। পুরো কমিশন দুঃখিত, লজ্জিত। আমরা চাই, আবার বিচার হোক। সত্যিকার আসামি সামনে আসুক। আমরা দুদক আইনের ৩১ (সরল বিশ্বাসের ভুল) এর কথা বলে সব মামলায় পার পেতে চাচ্ছি না।

আদালত বলেন, কমিশন অনেক ভালো কাজ করছে। কিন্তু এরকম দু’একটা ভুলের কারণে আপনার গোটা প্রতিষ্ঠান (দুদক) প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কিছু কিছু লোক আছে, জায়গা আছে যেখানে মানুষের প্রত্যাশা হলো, তাদের ফেরেশতার মতো থাকতে হবে। আদালত বলেন, যদি কমিশনের কমিশনারসহ সকল জনশক্তি তাদের হিসাব বিবরণী প্রকাশ করেন, তাহলে মানুষের কাছে কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা আরও বেশি বাড়বে।

খুরশীদ আলম খান বলেন, আদালতের এ বার্তা পাঠিয়ে দিবো। এরপর রায় দেন আদালত।

এসএসসি পাস না করেও সনদ জালিয়াতি করে নোয়াখালীর মাইজদি পাবলিক কলেজে ভর্তির অভিযোগে বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর পরিদর্শক মো. শহীদুল আলম ২০০৩ সালের ২৭ জানুয়ারি কুমিল্লায় কামরুল ইসলামকে আসামি করে মামলা করেন। কামরুল ইসলামের কলেজে দেওয়া ঠিকানায় গ্রামের নাম পশ্চিম রাজারামপুর, পিতা মো. আবুল খায়ের থাকলেও মামলার বাদী দুদকের পরিদর্শক ঠিকানা বদলে পূর্ব রাজারামপুর লিখে দেন। একইসঙ্গে পিতার নামের আগে ‘মো.’ বাদ দেন। দীর্ঘ ১০ বছর পর তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর যে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তাতেও এফআইআর অনুযায়ী আসামির নাম-ঠিকানা লেখা হয়। এরপর এই মামলায় আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও আসামি পলাতক থাকেন। এরপর আসামির বিরুদ্ধে ক্রোকি পরোয়ানা জারি হয়। এ সময় পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন দিয়ে বলে যে, পূর্ব রাজারামপুর গ্রামে ওই আসামির অস্তিত্ব নেই। এরপরও নোয়াখালীর আদালত পুলিশের প্রতিবেদন আমলে না নিয়ে বিচার কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। বিচার শেষে নোয়াখালীর বিশেষ জজ শিরীন কবিতা আখতার ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর রায় দেন। রায়ে তিনটি ধারায় ৫ বছর করে মোট ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে বলা হয়, সাজা একসঙ্গে কার্যকর হবে। আসামির বিরুদ্ধে সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এরপর নির্দোষ কামরুল ইসলাম আইজীবীর শরনাপন্ন হন। পুরো বিষয়টি জেনে গতবছর হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়। রিট আবেদনে কামরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার ও হয়রানি না করতে নির্দেশনা চাওয়া হয়। এ রিট আবেদনে হাইকোর্ট গতবছর ৫ নভেম্বর রুল জারি করেন। দুদকের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এ ঘটনার ব্যাখ্যা চান। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা ভুল স্বীকার করে আদালতে প্রতিবেদন দেন। গত ২৫ জানুয়ারি এ প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করেন দুদকের আইনজীবী। এরপর শুনানি শেষে আদালত রায়ের দিন নির্ধারণ করেন। নির্ধারিত দিনে শুনানি শেষে রায় দেন হাইকোর্ট।

জানা যায়, প্রকৃত আসামির জন্ম ১৯৭৭ সালে। কলেজে দাখিল করা এসএসসি’র সনদে পাস দেখানো হয় ১৯৯৮ সালে। তার বাড়ি নোয়াখালী সদরের পশ্চিম রাজারামপুর গ্রামে। তার পিতার নাম মো. আবুল খায়ের, মায়ের নাম ফাতেমা বেগম। আর নির্দোষ মোহাম্মদ কামরুল ইসলামের জন্ম ১৯৯০ সালে। হরিনারায়ণপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন ২০০৬ সালে। তার বাড়ি পূর্ব রাজারামপুর গ্রামে। পিতার নাম মো. আবুল খায়ের। মায়ের নাম রওশন আরা বেগম। পিতার চাকরির সুবাদে ১৯৯৪ সালে নির্দোষ কামরুল ইসলাম সপরিবারে পৈত্রিক ঠিকানা ছেড়ে লক্ষ্মীপুরে চলে যান। ২০০৮ সালের ৮ জুলাই মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতের সহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন কামরুল। পরে ২০১৯ সালে ২৯ জানুয়ারি নোয়াখালীতে বদলি হন। তিনি সেখানেই কর্মরত।