আজ ২৪শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৭ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ঢাকা

পাল্টে যাচ্ছে ঢাকা ঘিরে থাকা নদীতীরের দৃশ্য

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদ দীর্ঘদিন ধরে দখল-দূষণে জর্জরিত। নদীগুলো রক্ষায় সরকার এরই মধ্যে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যার ফলে এসব নদীর তীরের দৃশ্য বদলে যাচ্ছে।

 

নদীতীরে তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে ও ইকো পার্ক। গড়ে তোলা হচ্ছে সবুজ বাগান। স্থায়ীভাবে নদী দখল রোধ করতে বসানো হচ্ছে সীমানা পিলার। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে নির্মাণ করা হবে নদীবন্দর।

 

সরকারের নিজস্ব অর্থে ৮৪৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প শেষ হবে ২০২২ সালের জুন মাসে। সরকারের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ)।

 

কাজ শুরু করা হয়েছে ২০১৮ সালে। এর আগে ২০০৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। পরের বছরই জরিপকাজ চালানোর পাশাপাশি উচ্ছেদও শুরু হয়। চলমান এই উচ্ছেদ অভিযানে ভাঙা পড়েছে সমাজের নানা স্তরের, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের অনেক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের স্থাপনাও।

 

বিআইডাব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর পর্যন্ত এক দশকে চারটি নদীর তীরে অবৈধভাবে গড়ে তোলা ২০ হাজার ১৫৯টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১৫ হাজার ৪৭১টি এবং নারায়ণগঞ্জে উচ্ছেদ করা হয়েছে চার হাজার ৬৮৮টি।

 

দুই জেলায় নদীগুলোর ৭২৬.১৭ একর জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড চার নদীর তীরে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে প্রায় ৩৫২ একর ভূমি দখলমুক্ত করেছে।

 

বিভিন্ন ব্যক্তিকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে ১৯ কোটি ৭৫ লাখ ৪৯ হাজার ১৬০ টাকা। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার দখলে থাকা ভূমিও উদ্ধার করা হয়েছে।

 

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী শহরের চারপাশে নদীবেষ্টিত সীমানা ১১০ কিলোমিটার। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে উভয় তীরে। নদীর দুপারেই নির্মিত হবে ওয়াকওয়ে। সে হিসাবে পর্যায়ক্রমে উভয় তীর মিলে ২২০ কিলোমিটার হচ্ছে প্রকল্প এলাকা।

 

পর্যায়ক্রমে উভয় তীরেই একইভাবে ওয়াকওয়ে, ইকো পার্কসহ বনায়ন করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ঢাকা শহর পারের ৫২ কিলোমিটার এলাকায় নির্মিত হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে।

 

২০০৯ সালে একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদিত হওয়ার পর থেকে ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক ও নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকের যৌথ নেতৃত্বে শুরু হয় জরিপকাজ। জরিপকাজ শেষ হয় ২০১৬ সালে। ওই সময় থেকে শুরু হয় সীমানা পিলার স্থাপনের কাজ।

 

এরই মধ্যে ১০ হাজার ৮২০টি সীমানা পিলার স্থাপনের মাধ্যমে বেশ কিছু এলাকায় সীমানা নির্ধারণের কাজ শেষ করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রধান অঙ্গ হিসেবে ধরা হয়েছে নদীতীরের ওয়াকওয়ে।

 

ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে উঁচু ভূমি, নিচু ভূমি ও কলামের ওপর। নদীতীরের ভূমি কোথাও উঁচু কোথাও নিচু এবং বেশ কিছু জায়গায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখার জন্য কলামের ওপর ওয়াকওয়ে করা হবে।

 

বিআইডাব্লিউটিএর হিসাব অনুসারে, উঁচু তীর ভূমিতে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে ১০ হাজার ২৭৩ মিটার, নিচু তীর ভূমিতে ৩৫ হাজার ৫১০ মিটার এবং কলামের ওপর নির্মিত হবে পাঁচ হাজার ৯২০ মিটার। নদীতীর প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হবে ৪৪ হাজার ৭৮৩ মিটার।

 

‘কি ওয়াল’ করা হবে এক হাজার মিটার। নির্মিত হবে তিনটি ইকো পার্ক। একই সঙ্গে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদীবন্দরকে সচল করার জন্য ১৯টি জেটি নির্মাণ করা হচ্ছে। নদীর উভয় তীরে ২২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বনায়নের কাজ শুরু হয়েছে।

 

সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুরান ঢাকার রামচন্দ্রপুর মৌজা থেকে বসিলা পর্যন্ত নদীতীর ও রায়েরবাজার খাল থেকে কামরাঙ্গীর চর পর্যন্ত ৩.৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, ‘কি ওয়াল’, ‘ওয়াকওয়ে অন পাইল’ নির্মাণের কাজ চলছে।

 

ঢাকা ও টঙ্গী নদীবন্দরে ছয়টি ভারী জেটি নির্মাণের কাজ চলমান। এগুলো হচ্ছে মুন্সীখোলা বাজার এলাকায় একটি, পাগলা বাজার এলাকায় দুটি, মিরপুর এলাকায় একটি, গাবতলী এলাকায় একটি ও আমিনবাজারে একটি।

 

টঙ্গী বাজার এলাকায় ইকো পার্ক তৈরির কাজ চলছে। রামচন্দ্রপুর থেকে বসিলা, কামরাঙ্গীর চর এলাকায় এবং তুরাগের তীরে বীরুলিয়া মৌজা থেকে তুরাগ থানার রানাভোলা মৌজা, বালু নদের বড়কাউ মৌজার হরদি বাজার থেকে ভোলানাথপুর পর্যন্ত এবং গাবতলীর দীপনগর থেকে দিয়াবাড়ী ও ঝাউচর এলাকায় বনায়নের কাজ শুরু হয়েছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওয়াকওয়ে নির্মাণের প্রথম ধাপের কাজের অগ্রগতি ৬৮ শতাংশ। নদীবন্দরগুলোর জেটি নির্মাণের অগ্রগতি ৫ শতাংশ। নদীর ভেতরে মাটি খননকাজের অগ্রগতি ৫ শতাংশ।

 

প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সচিব মো. নুরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে স্থায়ীভাবে দখল ও দূষণমুক্ত করা এবং রাজধানী শহরকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলার জন্য এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

 

এটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প ছিল, কারণ প্রভাবশালীদের দখল থেকে সরকারি ভূমি উদ্ধার, বিপুল পরিমাণ স্থাপনা উচ্ছেদ খুব সহজ কাজ নয়। সরকার কোনো প্রকার পক্ষপাত না করে নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে। এখন সৌন্দর্যবর্ধনসহ নদীতীরের কাজগুলো সহজে করা যাচ্ছে।’

 

প্রকল্প পরিচালক বলেছেন, ‘প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২২ সালে। আমরা আশা করছি, যে গতিতে কাজ চলছে তাতে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, যদি না ফের বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে।’ তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দখল ও দূষণ থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে এবং ঢাকা শহর হবে সৌন্দর্যময়।