আজ ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৪ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

পুঁজিবাজার

পুঁজিবাজার জুয়াড়িদের কাঁধে!

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:  দেশের পুঁজিবাজারে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে লেনদেন প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। এ সময়ে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন বেড়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণ রোধে দেশব্যাপী সরকারের ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ ও নানা প্রণোদনায় যখন শিল্প-কারখানাগুলো কোনো রকমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখছে, সেই পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে টানা উল্লম্ফন শঙ্কা তৈরি করছে।বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে টালমাটাল অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক ধারা অনেক দেশেই দেখা গেছে।

 

কিন্তু সেসব দেশে মৌলভিত্তির শেয়ার ঘিরে চাঙ্গাভাব তৈরি হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের পুঁজিবাজার পরিস্থিতি পুরো ভিন্ন। এখানে মৌলভিত্তির পরিবর্তে জাঙ্ক শেয়ার এবং পরিশোধিত মূলধনের স্বল্পতাকে ‘বিশেষ যোগ্যতা’ হিসেবে আমলে নিয়ে জুয়াড়িদের মাধ্যমে কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ানো হচ্ছে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানা প্রণোদনা এবং বিশেষ ছাড়ে ব্যাংক, বীমাসহ আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলোর মুনাফায় সাময়িক যে উন্নতি দেখা গেছে, তাও শেয়ারদর বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো হচ্ছে। এভাবেই করোনার মধ্যে গত এক বছরে দেশের পুঁজিবাজারে চাঙ্গাভাব ফিরিয়ে আনা হয়েছে। দৃষ্টান্তমূলক কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় কারসাজি আরও বাড়ছে। স্বল্প সময়ে অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীকে প্রলোভিত করা হচ্ছে। ফলস্বরূপ এক মাসে প্রতিদিনই লেনদেন ও সূচক বাড়ছে।পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত মে মাসের শুরু থেকে ডিএসইতে গড় লেনদেন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

 

আর্থিক খাতের ওপর ভর করে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ছয় হাজার পয়েন্টে উন্নীত হওয়ার পর থেকে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে লেনদেন দুই হাজার কোটি টাকার ওপরে। গতকালও ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যা সাড়ে ১০ বছরে সর্বোচ্চ। দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় বাজার ধসের ঠিক আগে ডিএসইতে এমন ধারার লেনদেন দেখা গেছে। এর আগে ২০১০ সালের ৬ ডিসেম্বর ডিএসইতে ২ হাজার ৭১১ কোটি টাকা কেনাবেচা হয়েছিল। ডিএসইতে লেনদেনের রেকর্ডও সেই সময়েই হয়েছিল। ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ৩ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের আগের দিন ২ জুন থেকে যেভাবে লেনদেন বাড়ছে, তাতে খুব শিগগির লেনদেনের ওই পুরনো রেকর্ড ভাঙবে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

তবে দেশের পুঁজিবাজারের সামর্থ্য বিবেচনায় বর্তমান লেনদেনের এই ধারাকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের ধারণা, ডিএসইতে সর্বোচ্চ এক হাজার থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা লেনদেন হতে পারে। স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ডিএসইতে যে কেনাবেচা হয়, তার ৯০ শতাংশই ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীর লেনদেন। বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে ২৩ হাজার কোটিপতি বিনিয়োগকারী রয়েছেন, যার মধ্যে ২১ হাজারের বেশি ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারী। লেনদেনের উল্লেখযোগ্য অংশই তাদের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

 

কয়েক বছর ধরে পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা মূলত ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন সুবিধা দিয়েও পুঁজিবাজারে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি ব্যাংকের বন্ড অনুমোদনের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের শর্ত দিচ্ছে। তারপরও অনেক ব্যাংক ওই তহবিল গঠন করেনি। ব্যাংকের অংশগ্রহণ ছাড়াই পুঁজিবাজার বড় লেনদেনে এগিয়ে চলছে শুধু কারসাজির কারণে। বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানির কারসাজির সঙ্গে জড়িত অন্তত ৪০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। যাদের অধিকাংশই বীমার শেয়ার নিয়ে কারসাজি করছে।

 

বীমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইডিআরএর কিছু পদক্ষেপে সাধারণ বীমা কোম্পানির আয় বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে কারসাজি আরও সহজ হয়েছে। বর্তমানে বীমা করার ক্ষেত্রে কোনো এজেন্ট কমিশন দিতে না হওয়ায় অধিকাংশ বীমা কোম্পানির মুনাফা বেড়েছে। তবে যে হারে আয় বেড়েছে, শেয়ারের দর বেড়েছে কয়েকগুণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ গুণ পর্যন্ত শেয়ারের দর বেড়েছে। অথচ শেয়ারদর অস্বাভাবিক হারে বাড়লেও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে কোনো তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি রোধে এসইসি থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় দুই মাসে বীমা খাতের বাজার মূলধন ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

 

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বীমায় কারসাজির মাধ্যমে ১০ বছর পর পুঁজিবাজারে চাঙ্গাভাব ফিরে এসেছে। আর করোনার কারণে খেলাপি ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি রাখতে না হওয়ায় ব্যাংক খাতে সাময়িক যে মুনাফা বাড়ার চিত্র দেখা গেছে, তা-ও খাতটির শেয়ারদর বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। মার্জিন বিতরণের হার বাড়িয়ে দেওয়াও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

 

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, গত দুই মাসে সূচক ও লেনদেন যেভাবে বেড়েছে, তাতে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুজাতিক ও দেশীয় ভালো কোম্পানিগুলের শেয়ারদর এ সময়ে তেমনটা বাড়েনি। কারসাজির মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম চাঙ্গাভাব দেখানো হচ্ছে। দুর্বল মৌলভিত্তির উৎপাদন বন্ধ থাকা ও স্বল্প মূলধনীর বীমার শেয়ার কারসাজির মাধ্যমে বাড়ানো হচ্ছে। এতে একসময় বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে পড়বেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাদের এখনই সতর্ক হওয়া উচিত।

 

২০২০ সালের এপ্রিলে খায়রুল হোসেনের নেতৃত্ব বিদায় নেওয়ার পর অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের কমিশন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব নেয়। এরপরই করোনা সংক্রমণ রোধে দেশব্যাপী ‘লকডাউনের’ কারণে বন্ধ থাকা পুঁজিবাজার চালুর উদ্যোগ নেন শিবলী রুবাইয়াত। ‘লকডাউনে’ প্রায় দুই মাসের বেশি সময় পর পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু হলে জুয়াড়িদের তৎপরতা শুরু হয়। আর এই জুয়াড়িদের কাঁধে সওয়ার হয়েই দীর্ঘদিন পর পুঁজিবাজার চাঙ্গাভাবে ফিরে আসে। বীমা খাত দিয়ে শুরু এই কারসাজি এখন অন্যান্য খাতের শেয়ারেও দেখা যাচ্ছে।