আজ ২৭শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১১ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

image 192881

পেঁয়াজ বীজের আবাদেই কোটিপতি সাহিদা বেগম

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:স্বামী ব্যাংকার। আর দশ জন নারীর মতো গৃহবধূ আটপৌরে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু সাহিদা বেগম ভিন্ন ধাতুর মানুষ। তিনি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন। আর সেই চ্যালেঞ্জে জয়ীও হয়েছেন।

সাহিদা বেগম এখন একজন সফল কিষানি। পেঁয়াজের বীজ চাষ করে আত্মনির্ভরশীল তো বটেই; বরং অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন ফরিদপুর জেলার সাহিদা বেগম।

সাহিদা বেগম বলেন, প্রায় ১৮-১৯ বছর ধরে পেঁয়াজের বীজের আবাদ করে চলেছেন তিনি। আর চলতি বছর প্রায় ২০০ মণ পেঁয়াজের বীজ বিক্রি করেছেন।

মৌসুমে এই বীজ মণপ্রতি ২ লাখ টাকা করে বিক্রি করেছেন। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে পেঁয়াজের বীজ বিক্রি হয়েছে ৫-৬ হাজার টাকা কেজি দরে।

সাহিদা বেগম বলেন, এ বছর এরই মধ্যে বীজ উৎপাদনের কাজ শুরু হয়ে গেছে। বাছাই করার পর পেঁয়াজের বাল্ব জমিতে লাগাতে মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কাজ করছে ১২ জন শ্রমিক।

তাদের দুপুরের খাবার প্রস্তুতিতেই ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। আর সেই সাথে পেঁয়াজ লাগানো এবং তা থেকে বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়ার তদারকি তো আছেই।

সাহিদা বলেন, এখন আমাদের সিজন। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আমরা পেঁয়াজ লাগাই। অনেক লেবার থাকে। ৩০-৪০, এমনকি ৫০ জনও থাকে। তবে বছরের এ সময়টাতে অন্য বছর আরও বেশি শ্রমিক থাকে। এবার কিছু জমির মাটিতে পানির পরিমাণ বেশি থাকায় কাজ কিছুটা ধীরে চলছে।

বীজ উৎপাদনের জন্য যে পেঁয়াজ এখন লাগানো হচ্ছে তার ফলন আসবে আগামী এপ্রিল-মে মাসে।

সাহিদা বেগম বলেন, কৃষক পরিবারের বউ হওয়ার কারণে ‌আগে থেকেই নানা কৃষিকাজের সাথে পরিচয় ছিল তার। তিনি জানান, তার শ্বশুর মূলত পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু কখনোই আসলে বেশি পরিসরে চাষ করা হয়নি। তিনি নিজেও অনেকটা শখের বশেই এই চাষ শুরু করেন।

সাহিদা বেগম জানান, ২০০৪ সালে দ্বিতীয় সন্তান জন্মের আগে ২০ শতক জমিতে পেঁয়াজের বীজ চাষ করেন তিনি। সে বছর মাত্র দুই মন বীজ উৎপাদিত হয়েছিল।

সেগুলো বিক্রি করে পেয়েছিলেন ৮০ হাজার টাকা। পরের বছর আরও বেশি পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজের চাষ করতে শুরু করেন তিনি। সে বছর পান ১৩ মণ বীজ।

সাহিদার ভাষায়, বীজ বিক্রি করে দেখলাম যে আমি ভালোই লাভবান। পরের বছর আরও জমি বাড়াইলাম। ৩২ মণ বীজ উঠলো। এভাবেই আমার ওঠা।

এর পর আর থেমে থাকেননি। সাহিদা বেগম জানান, গত বছর ১৫ একর আর চলতি বছর ৩০ একর জমিতে পেঁয়াজের বীজের চাষ করেছিলেন। ঘরে তুলেছিলেন ২০০ মন বীজ।

অনেক শ্রম দিতে হয়, কষ্ট করতে হয়। পেঁয়াজের বীজের অনেক যত্ন করতে হয়। এখন লাগাবে, দুই দিন পর নিড়াবে (আগাছামুক্ত করা)। বার মাসই লেবার থাকে।

সাহিদা বেগম বলেন, আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি জমিতে পেঁয়াজের বীজের চাষ করলেও অনেক সময় চাহিদা পূরণ করতে পারেন না তিনি। ফরিদপুর জেলার স্থানীয় কৃষক তো বটেই, পুরো বাংলাদেশে তারা বীজ সরবরাহ করে থাকেন তারা।

আমাদের বীজ ভাল বলে চাহিদা থাকে। কৃষকরা অনেক খুশি। কারণ এর মধ্যে কোনো ঝামেলা নাই। নিজের প্রোডাক্ট, কোনো ভেজাল নাই। এবছর আরো ৫০০ মণ থাকলেও বিক্রি করতে পারতাম। এতো চাহিদা।

তবে পেঁয়াজ চাষে খরচও কম নয় বলে জানান তিনি। পেঁয়াজের বাল্বের দাম অনেক বেশি থাকে। এছাড়া কীটনাশক, সার, সেচ দেয়ার ক্ষেত্রে খরচ বেশ ভালো পরিমাণে হয়।

এছাড়া অতিরিক্ত কুয়াশা, শিলাবৃষ্টি, ঝড়-বৃষ্টি বেশি হলেও বীজ নষ্ট হয়ে যায় বলে জানান তিনি।

সাহিদা বেগমের পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের কাজে সহায়তা করেন তার স্বামী বক্তার উদ্দিন খানও। যিনি পেশায় একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। স্বামী ছাড়াও পরিবারে দুই মেয়ে নিয়ে চারজনের সংসার সাহিদা বেগমের।

সাহিদা বেগম নিজেই গড়ে তুলেছেন পেঁয়াজের বীজের কারখানা। সেখান থেকেই বীজ প্যাকেটজাত করা এবং ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করা হয়। তার তৈরি করা বীজ ক্রেতাদের কাছে পরিচিত খান সিডস নামে।

সাহিদা বেগম বলেন, তার এই কারখানায় কাজ করে স্থানীয় অনেকে। আর তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে পেঁয়াজের বীজ চাষ করতে শুরু করেছেন স্থানীয় আরও অনেক নারীও।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর পেঁয়াজের বীজের চাহিদা বেশি থাকার কারণে দাম ছিল বেশ চড়া। প্রতি কেজি বীজ বিক্রি হয়েছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা দরে। সে হিসেবে সাহিদা বেগম প্রায় চার কোটি টাকার বেশি বীজ বিক্রি করেছেন।

ফরিদপুরের নগরকান্দা এলাকার পুরাপাড়া বাজারের কৃষিঘর বীজ ভান্ডারের মালিক মিজানুর রহমান জানান, বীজের মান ভাল হওয়ার কারণে খান সিডস থেকে ৫০০ কেজির মতো বীজ কিনেছিলেন তিনি। এই বীজ থেকে চারা গজানোর হার বেশি থাকে বলে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে চাহিদা রয়েছে প্রচুর।

ফরিদপুর জেলায় পেয়াজের বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সেরা চাষী হিসেবে পুরষ্কারও পেয়েছেন সাহিদা বেগম।

বর্তমানে উৎপাদন করছেন, রাজশাহী তাহিরপুর, সুপারকিং, সুখসাগর ও নাসিরকিং নামে পেঁয়াজের বীজ। এছাড়া হাইব্রিড পেঁয়াজের বীজও উৎপাদনও করছেন তিনি।

সাহিদা বেগম বলেন, প্রতি বছরই আমরা নতুন জাতের পেঁয়াজ আনি যাতে কৃষকদের প্রতিবছর নতুন কিছু দিতে পারি।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক কার্তিক চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশে পেঁয়াজ উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ফরিদপুরের অবস্থান দ্বিতীয়। আর পুরো দেশে পেঁয়াজের বীজের যে চাহিদা থাকে তার ৬০-৭০ ভাগ এককভাবে আসে ফরিদপুর জেলা থেকে। সূত্র: বিবিসি