আজ ২৮শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১১ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

025655Garment kalerkantho pic

পোশাক খাতে প্রহসনের মাতৃত্বকালীন ছুটি

প্রথমবার্তা প্রতিবেদক:দেশের শ্রম আইন কয়েক দফা সংশোধনের পরও পোশাক খাতে মাতৃত্বকালীন ছুটির নামে প্রহসন চলছে। কোনো শ্রমিক ছুটি নিলে পরে কাজে যোগ দিতে নিরুৎসাহ করা হয়।

 

অথবা কাজে নিলেও নতুন শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে ছুটি কাটিয়ে কাজে যোগ দেওয়া শ্রমিক আগের কর্মসময়ের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

 

অনেক সময় কৌশলে ছাঁটাই করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় গলদ রয়েছে।

 

মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে বৈষম্যও রয়েছে। যেখানে সরকারি খাতের শ্রমিকদের ছয় মাস ছুটি দেওয়া হয়, সেখানে পোশাক খাতে দেওয়া হয় চার মাস।

 

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) তথ্যানুযায়ী, বেশির ভাগ তৈরি পোশাক কারখানায় ক্রেতাদের চাপে মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া হলেও তা অপর্যাপ্ত ও অসম্পূর্ণ। কোনো না কোনো কারণে শ্রমিকরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

 

তবে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পরিচালিত (কমপ্লায়েন্স) কারখানায় মাতৃত্বকালীন ছুটি শতভাগ।

 

গর্ভবতী নারীদের সদ্যোজাত সন্তান বা সন্তানদের যত্ন নেওয়ার জন্য যে ছুটি দেওয়া হয় এটা হলো মাতৃত্বকালীন ছুটি। এটা গর্ভাবস্থার শেষ কয়েক সপ্তাহ থেকে দেওয়া হয়।

 

ডিআইএফইর পরিসংখানে দেখা গেছে, নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটিতে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি। অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে কারখানাগুলোতে মাতৃত্বকালীন ছুটি পেয়েছেন ১০ হাজার ৯৬১ জন শ্রমিক। এর আগের বছর ছুটি পেয়েছেন ১০ হাজার ৮১২ জন। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের অক্টোবরে ছুটি পেয়েছেন এক হাজার ৭৮৬ জন। প্রতিষ্ঠানটির ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, সারা দেশে ২৬ হাজার ৯৫৩টি নিবন্ধিত কারখানা রয়েছে। শুধু পোশাক কারখানাই আছে চার হাজারের বেশি।

 

ডিআইএফইর উপমহাপরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা ভোগের সংখ্যা বাড়ছে। তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট, চা, ওষুধ, জাহাজশিল্প এমন প্রায় ৪২টি খাতের তদারকি করছে ডিআইএফই। তবে মাতৃত্বকালীন ছুটির সংখ্যা বাড়লেও পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়।’

 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রকাশিত ‘বেইস লাইন সার্ভে ২০১৭’-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ৫৩ শতাংশ কারখানা শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয় না। ৯ শতাংশ শ্রমিক চাকরি জীবনে সন্তান জন্ম দিলেও তাঁদের সাড়ে ৩ শতাংশ মাতৃত্বকালীন ছুটি পাননি। ২৩ শতাংশ নারী শ্রমিক কারখানায় তাঁর সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর সুয়োগ পান না। শ্রম আইনে মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান আছে এই তথ্য জানেন না ৩৩ শতাংশ শ্রমিক। এর মধ্যে ৩৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৩১ শতাংশ নারী শ্রমিক।

 

বাংলাদেশে আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর টুমো পৌটি আইনেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পোশাক খাতে মাতৃত্বকালে দীর্ঘ সময় ধরে কারখানায় কাজ করার ফলে নারী শ্রমিকরা গর্ভপাতের ভয় এবং কর্তৃপক্ষের দ্বারা চাকরিচ্যুত হওয়াসহ নানা কারণে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন।

 

এ ছাড়া ছুটি শেষে কাজে ফিরলে তাঁদের অনেক চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়। বিশেষ করে অপর্যাপ্ত শিশুর যত্নের সুযোগ এবং কারখানায় সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর সুযোগের অভাব থাকে।’

 

তিনি বলছেন, বাংলাদেশে মোট শ্রমিকসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ নারী শ্রমিক। এর ৬০ শতাংশই কাজ করেন পোশাক খাতে। মাতৃত্বকালীন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হলে কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ কমে যাবে। এর ফলে শিল্পে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মীর সংকট তৈরি হবে। এতে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে।

 

টুমো বলেন, বাংলাদেশের শ্রম আইনে গর্ভবতী ও স্তনদানকারী নারীদের সুরক্ষার জন্য বেশ কয়েকটি বিধান আছে। সরকার চাইলে কঠোর পর্যবেক্ষণের ভূমিকা নিতে পারে। এ ছাড়া আইএলও প্রসূতি সুরক্ষা কনভেনশন সি-১৮৩ অনুমোদনের কথা বিবেচনায় নিতে পারে।

 

বিজিএমইএর জনসংযোগ স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান খান মনিরুল আলম শুভ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কমপ্লায়েন্স কারখানাগুলো মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রায় শতভাগ পালন করতে হয়। কেননা প্রত্যেক কারখানাকে প্রতিবছর তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কমপ্লায়েন্স সনদ নবায়ন করতে হয়।’কিন্তু পোশাক খাতের সব কারখানা কমপ্লায়েন্স মেনে পরিচালিত হয় না।

 

জাতীয় গামেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন (এনজিডাব্লিউএফ) সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলছেন, ২০০৬ থেকে তিনবার বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধন হলেও শ্রমিকরা শ্রম আইনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বারবার। এর কারণ, আগে রাজনীতিবিদরা সরকার চালাতেন, এখন ব্যবসায়ীরা সরকার চালান। সরকার ও ব্যবসায়ী একাকার হয়ে যাওয়ার ফলে বারবার শ্রম আইন সংশোধন হলেও শ্রমিকরা প্রকৃত অর্থে আইনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে সরকারি-বেসরকারি খাতে বৈষম্য তৈরির বিষয়টিও তুলে ধরেন।

 

আমিন বলছেন, ক্রেতাদের চাপে মালিকরা ছুটি দিতে বাধ্য হন। তার পরও পোশাক খাতের ৭০-৮০ শতাংশ শ্রমিক এই সুবিধা পান। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় হলে ওই সব কর্মীকে কৌশলে ছাঁটাই করা হয়। যাঁরা ছুটি পান, পরে কাজে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদেরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়টি কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ডিআইএফইর পরিসংখ্যান থেকে অনুমান হয় যে, ক্রেতাদের চাপে মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া হলেও তা অপর্যাপ্ত ও অসম্পূর্ণ। সামগ্রিক সচেতনতা বাড়লেও ছুটি পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধাগুলো ঠিকমতো পরিপালন নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়।