আজ ১৭ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২রা মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

download 1

প্রকল্প মানেই কি বিদেশভ্রমণ

প্রথমবার্তা,প্রতিবেদক :

প্রকল্প মানেই যেন বিদেশ সফরের মওকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যাওয়া প্রায় ৮৫ শতাংশ জরুরি ফাইলেই বিদেশ সফরের প্রস্তাব থাকে। বিপরীতে নীতিনির্ধারণী ফাইলের সংখ্যা নগণ্য। প্রকল্পের নামে অযথা বিদেশ সফর নিয়ে সরকারপ্রধান বিরক্তি প্রকাশ করলেও এ সম্পর্কিত প্রস্তাব কমছেই না। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর বিদেশ সফরের ফাইল বাড়তে শুরু করছে। প্রায় প্রতিটি প্রকল্পে রাখা হচ্ছে বিদেশ সফরের বিশাল বাজেট। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী নিজেই অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর কাটছাঁট শুরু করেছেন। সম্প্রতি তিনি দুটি প্রকল্পে বিদেশ সফরের জন্য সাড়ে ৯ কোটি টাকার বাজেট কেটে আড়াই কোটি টাকা করে দিয়েছেন।

সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন প্রশিক্ষণে কর্মকর্তাদের বিদেশ যেতে উৎসাহ দিয়েছেন। উদ্দেশ্য, বিদেশে ভালো শিক্ষা-প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মকর্তারা যেন দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফরে সরকারপ্রধান নিজেই এখন বিরক্ত। তার পরও আটকানো যাচ্ছে না বিদেশ সফর, একের পর এক প্রস্তাব।

গত বছরের ১৩ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন সচিব সাজ্জাদুল হাসান বলেন, “প্রজেক্টে কারণ ছাড়াই বিদেশভ্রমণ বা প্রশিক্ষণ থাকে। প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন—বিদেশভ্রমণ ছাড়া তো কোনো প্রজেক্ট হয় না। উনার (প্রধানমন্ত্রীর) কাছে কোনো সামারি জরুরি ফ্লাগ সাইন দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘তোমাদের জরুরি মানেই তো বিদেশ সফর।’ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ সামারি থাকে বিদেশ সফরের। আমার গত চার-পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতায় নীতিনির্ধারণী সামারি খুব বেশি একটা যেতে দেখিনি।”

সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিড ডে মিলের ব্যবস্থাপনা’ দেখতে বিদেশ সফরের প্রস্তাব নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাপক সমালোচনা করা হয়। তার পরও প্রতিমন্ত্রী ও সচিব এসংক্রান্ত বিদেশ সফরের পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় দুটি প্রকল্পের ডিপিপিতে বিদেশ ভ্রমণ ব্যয় রাখা হয়েছিল সাড়ে ৯ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে হওয়া ওই বৈঠকে তা কমিয়ে দুই কোটি ২০ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘আমরা বিদেশ সফরের বিরোধী নই। তবে অযৌক্তিক সফরে বরাদ্দ দেব না।’ একনেকে ব্যয় কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, আঞ্চলিক অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিদেশ সফর বাবদ চার কোটি ৫০ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিল। তা কমিয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া মৌজা ও প্লটভিত্তিক জাতীয় ডিজিটাল ভূমি জোনিং প্রকল্পের আওতায় পাঁচ কোটি টাকা ভ্রমণ ব্যয় চাওয়া হয়েছিল। তা কমিয়ে দেড় কোটি টাকা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ উল্লিখিত দুটি প্রকল্পে ভ্রমণ ব্যয় বাবদ কমানো হয়েছে সাত কোটি ৩০ লাখ টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র সচিব প্রথমবার্তাকে  বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তো ভালোর জন্য বিদেশ সফরে উৎসাহিত করতেন। এখন সব প্রকল্পে এমনভাবে বিদেশ সফরের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে, যা লজ্জার।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ডিপিপির বিষয়গুলো সচিব ও মন্ত্রী পর্যায়েই আটকে যাওয়ার কথা। এগুলো কিভাবে পরিকল্পনা কমিশনে যায়? আবার পরিকল্পনা কমিশন থেকে একনেকেই বা কিভাবে ওঠে?’

শুধু দেশীয় অর্থের প্রকল্প নয়, ঋণের টাকায় পরিচালিত প্রকল্পেও সফরের বাজেট নির্ধারিত থাকে। ‘রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন’ (রস্ক) প্রকল্পে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি চলে বিশ্বব্যাংকের ঋণে। প্রকল্পটির দ্বিতীয় পর্যায়ে বিদেশ সফরের বাজেট ছিল প্রায় ১৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধন প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে আবারও আন্তর্জাতিক সেমিনার ও বিদেশ সফর বাবদ ১২ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। সফরের তালিকায় রাখা হয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি), প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের।

প্রকল্পটির প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করছে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ। বিভাগের সচিব আবুল কালাম আজাদ প্রথমবার্তাকে বলেন , ‘আন্তর্জাতিক সেমিনারের বাজেট আমরা অনুমোদন দিইনি। আর প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যেখানে ২০-২৫ জন বিদেশ সফরে যান, সেখানে হয়তো একজন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বা আইএমইডির রাখা হয়। এটা কতটা উচিত-অনুচিত সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করব না। মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘নির্দিষ্ট কিছু মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে বিদেশ সফরের অভিযোগ অসত্য নয়। কিন্তু এটা পর্যায়ক্রমে কমে এসেছে। যেখানে বিদেশ সফর প্রয়োজন সেখানে সরকার কার্পণ্য করবে না