আজ ৮ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২১শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গভ্যাক্স

বঙ্গভ্যাক্স আসছে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: ২০০ বছর হয়ে গেছে টিকা আবিষ্কারের বয়স। কিন্তু বাংলাদেশ চেষ্টা চালাচ্ছে এই করোনাতেই প্রথম। গ্লোব বায়োটেকের তৈরি টিকা নাম লিখিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার খসড়া তালিকায়ও। এই বঙ্গভ্যাক্স কর্মযজ্ঞে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. কাকন নাগ।

 

গ্লোবের ল্যাব সুবিধা আগে থেকেই ছিল। পৃথিবীতে করোনা ধরা পড়লে গ্লোব প্রথমে ভাবল শণাক্তকরণ কিট তৈরি করবে আর মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি বাজারে আনবে ওষুধ হিসেবে। একপর্যায়ে ভাবল, ভ্যাকসিন কেন নয়? করোনায় আক্রান্ত এক বাংলাদেশির স্যাম্পল নিয়ে কাজও শুরু করে দেয়।

 

শুরুর দিক
গ্লোব বায়োটেকের রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ড. আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘প্রথমে আমরা একটি অনিয়ন্ত্রিত এনিম্যাল ট্রায়াল দিই। ফলাফল থেকে বুঝতে পারি তিনটি ক্যান্ডিডেটের মধ্যে এমআরএনএভিত্তিক ভ্যাকসিনটিই ব্যবহারের দিক থেকে সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্পাদনের দিক থেকে সুবিধাজনক।

 

এমআরএনএ ভ্যাকসিন সহজেই কোষে ঢুকে যায় এবং কোষের জিনোমের কাছাকাছি না গিয়েও সরাসরি স্পাইক প্রোটিন তৈরি করতে পারে। এমনকি যদি রক্তে চলেও যায় তবু এনজাইমের প্রভাবে খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ক্ষতিকারক অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না। এমআরএনএ ভ্যাকসিন বস্তুত কোষগুলোকে অ্যান্টিভাইরাল প্রোটিন তৈরি করতে উত্সাহ দেয়।’

 

মেসেঞ্জার এমআরএনএ
এমআরএনএ হলো বার্তাবাহক। কোন কোষে প্রোটিন তৈরি হচ্ছে, কোথায় কী রাসায়নিক বদল হচ্ছে সব কিছুর জিনগত তথ্য বা জেনেটিক কোড জোগাড় করে আর তা শরীরের প্রয়োজনীয় জায়গায় পৌঁছে দেওয়া এর কাজ। আমেরিকার মডার্না, জার্মানির কিউরভ্যাক এমআরএনএ প্রযুক্তিই অনুসরণ করছে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম।

 

তখন কেউ ধারণা করতে পারেনি তখনকার জিনোম সিকোয়েন্সগুলো বিশ্লেষণ করে D614G নামে একটি বিশেষ স্ট্রেইনের (মিউটেড ধরন) খোঁজ মেলে। তখনো সেটি খুব প্রভাব বিস্তারকারী ছিল না। তবে কাকন নাগরা বুঝতে পারলেন, এটি ভবিষ্যতে মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করবে।

 

স্ট্রেইনটি ১০ গুণ বেশি সংক্রামক। গ্লোব বায়োটেকের প্রধান নির্বাহী ড. কাকন নাগ বলেন, ‘আমরা ঠিক করলাম সুনির্দিষ্টভাবে এটার বিরুদ্ধেই লড়ব। বিশ্বের আর কোথাও একে টার্গেট করে কোনো ক্যান্ডিডেট কেউ বানায়নি এখন পর্যন্ত।’

 

দিনটি ছিল ২ জুলাই
২ জুলাই ২০২০। অনিয়ন্ত্রিত ট্রায়াল শেষ করে দেশবাসীকে জানানো হয়, আমরাও (গ্লোব) ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। ড. আসিফ মাহমুদ জানান, এরপর দুই ধাপে নিয়ন্ত্রিত এনিম্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করি। এবারের উদ্দেশ্য, ভ্যাকসিনটি নিরাপদ কি না তা জানা। পাঁচটি গ্রুপে ছয়টি করে মোট ৩০টি ইঁদুর নেওয়া হয়। একটি গ্রুপের ওপর কোনো কিছু প্রয়োগ করা হয়নি। একটি গ্রুপ ছিল প্লাসিবো, যাদের ওপর ভ্যাকসিনের এপিআই (অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডেন্ট) ব্যতীত শুধু সহযোগী উপাদান বা বাফার প্রয়োগ করা হয়। বাকি তিনটি গ্রুপে নিম্ন-মধ্যম-উচ্চ তিনটি মাত্রায় ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়।

 

আশা-জাগানিয়া ফল
গবেষণায় দেখা গেল, ভ্যাকসিন পাওয়া ১৮টি ইঁদুরের প্রতিটির দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। পরের ধাপে বিজ্ঞানীরা দেখতে চেয়েছিলেন ভ্যাকসিন দেওয়ার পর ইঁদুরের দেহে সংক্রমণ ঘটে কি না। করোনাভাইরাস ইঁদুরের কোষে এমনি এমনি ঢুকে পড়তে পারে না, তাই সংক্রমণের উপযোগী বিশেষ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল।

 

এ জন্য ১৮টি ইঁদুরকে ছয়টি সমান গ্রুপে ভাগ করা হয়। একটি গ্রুপকে প্লাসিবো আর অন্য পাঁচটি গ্রুপে মধ্যম ডোজের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। ১০ দিন পর প্রবেশ করানো হয় ভাইরাস। এর ৪৮ ও ৭২ ঘণ্টা পর ইঁদুরগুলোর ফুসফুসের নমুনা নিয়ে রিয়াল টাইম পিসিআর করা হয়। দেখা যায়, ভ্যাকসিন না পাওয়া প্রতিটি ইঁদুরের ফুসফুস কোষে ভাইরাস আছে। আর ভ্যাকসিন পাওয়া ইঁদুরগুলোয় ভাইরাসের মাত্রা তুলনামূলক কম অথবা একেবারে অনুপস্থিত। এ ছাড়া অন্যান্য পরীক্ষায় আরো ১৫টি ইঁদুর ব্যবহার হয়েছে।

 

এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর বায়ো-আর্কাইভ নামের জার্নালে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গ্লোব বায়োটেকের কোয়ালিটি অ্যান্ড রেগুলেটরি ম্যানেজার ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মডার্নার দুই ডোজে যে অ্যান্টিবডি মিলেছে আমাদের সিঙ্গল ডোজ তার চেয়ে বেশি অ্যান্টিবডি উত্পাদনে সক্ষম। হিউম্যান ট্রায়ালে অনুরূপ ফল মিললে বিশ্বে এই প্রথম সিঙ্গল ডোজের এমআরএনএ ভ্যাকসিন হতে যাচ্ছে বঙ্গভ্যাক্স।’

 

এবার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পালা
গত বছরের ১৪ অক্টোবর গ্লোব বায়োটেক ও আইসিডিডিআরবির মধ্যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। নভেম্বরের ৩০ তারিখে নানা কারণে চুক্তি থেকে সরে আসে গ্লোব। ১ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব গ্লোব বায়োটেক পরিদর্শন করেন। এরপর একটা টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। ২৮ ডিসেম্বর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য ভ্যাকসিন উত্পাদনের অনুমতি দেয়।

 

এরপর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, আইইডিসিআর ও কনট্যাক্ট রিসার্চ অর্গানাইজেশন বাংলাদেশের অংশীদারিতে আবার ট্রায়ালের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে গ্লোব। ভ্যাকসিনটির নাম ব্যানকোভিড থেকে বঙ্গভ্যাক্স করা হয়। ১৮ জানুয়ারি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পরিকল্পনা বা প্রটোকল নৈতিক অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদে (বিএমআরসি) জমা দেওয়া হয়েছে।

 

ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কী দেখা হয়
একেকজন মানুষের কত ডোজ প্রয়োজন সেটা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণের জন্য মানবদেহে পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। আসিফ বলেন, আমরা ফেজ ওয়ানে দেখব ভ্যাকসিনটি গ্রহীতার দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করে কি না এবং সেটি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করে কি না। আর অ্যান্টিবডি তৈরি হলে সেটির ভাইরাসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা কতটুকু।

 

ওই ফেজে ১৮ বছরের কম বয়সীদের, ক্যান্সারের ইতিহাস আছে এমন ব্যক্তি, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। ফেজ টু ও থ্রির উদ্দেশ্য ডোজের মাত্রা ও সংখ্যা নির্ধারণ এবং কত দিন পর্যন্ত সুরক্ষা পাওয়া যায় তা দেখা। একই সঙ্গে কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় কি না সেটাও জানা। ইথিক্যাল ক্লিয়ারেন্স পেলে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ছয় মাসের মতো সময় লাগতে পারে। ড. মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের দলটি ৫০ জনের। এর মধ্যে বিজ্ঞানী ৩৬ জন। আমরাই প্রথম, তাই পথ তৈরি করে করে এগোতে হচ্ছে।’

 

ব্যাপারটা গর্বের
মাসে এক কোটি ডোজ টিকা উত্পাদন করা যাবে বলে জানালেন গ্লোব বায়োটেকের সিওও ড. নাজনীন সুলতানা। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভ্যাকসিনের প্রযুক্তি মডার্নার অনুরূপ। মডার্নার মতো আমাদের ভ্যাকসিনটিও মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ছয় মাস পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে। ২-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এক মাস পর্যন্ত রাখা যাবে।

 

অর্থাত্ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় একেবারে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এই ভ্যাকসিন দেওয়া সম্ভব হবে। বললেন, হিউম্যান ট্রায়ালের আগে দামের ব্যাপারে নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। তবে মডার্নার ভ্যাকসিনের চেয়ে দাম অনেক কম হবে।’ ড. কাকন নাগ বলেন, এত দিন বাংলাদেশ শুধু অন্যদের প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাই চিন্তা করেছে। টিকার ২০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা দেশের মাটিতে বসে টিকা উদ্ভাবন করছে। এটা দারুণ গর্বের ব্যাপার।