আজ ২৯শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১২ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

jnh

বায়ুদূষণে এবারও শীর্ষে ঢাকা

প্রথমবার্তা প্রতিবেদকঃ ক্রমাগত বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ছেই। পৃথিবীতে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে রাজধানী ঢাকা। সরকার নানা উদ্যোগের কথা বললেও কমছে না বায়ুদূষণ।

 

বরং প্রায় দিনই শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসছে ঢাকার বায়ুমান মাত্রা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের বায়ুমান যাচাই বিষয়ক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘এয়ার ভিজ্যুয়াল’-এর বায়ুমান সূচক (একিউআই) অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত গড়ে ঢাকা প্রথম অবস্থানে ছিল এবং দূষণের মানমাত্রা ৩২৬ পর্যন্ত উঠেছিল। এর আগের দিনও সকাল ৯টায় শীর্ষে ছিল ঢাকা। একই অবস্থা ছিল মঙ্গল, সোমবারও।

 

চলতি সপ্তাহে দিনের কোনো না কোনো সময়ে দূষণের ১ নম্বরে ছিল ঢাকা। অতীতে সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত ১০ জানুয়ারি দূষণের মানমাত্রা ছিল ৫০২। বায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, সূচক ৩২৬ মানেই দুর্যোগপূর্ণ। বায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই দূষণ কমাতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এটা কেবল মানব শরীর বা পরিবেশ নয়, মানুষের গড় আয়ুতেও আঘাত করছে।

 

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান লরেন্স বের্কলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি বলছে, রাসায়নিক মিশ্রণ আছে এমন দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে থাকলে চোখ, নাক বা গলায় সংক্রমণ অথবা ক্ষতির কারণ হতে পারে, সেই সঙ্গে ফুসফুসের নানা জটিলতা যেমন :ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়া, মাথাব্যথা, অ্যাজমা এবং নানাবিধ অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিতে পারে।

 

বায়ুদূষণের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্কও দেখতে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ‘মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস’ প্রকল্পের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২.৬ বছর। এক বছর আগে একই সময়ে এ গড় আয়ু ছিল ৭২.৩ বছর। তবে বাড়তির দিকে থাকা এই গড় আয়ু বায়ুদূষণ অব্যাহত থাকলে এক লাফে নেমে যেতে পারে ৬৭ বছরে!

 

বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ মানুষ দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশ—বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে বসবাস করে। এ চার দেশে বায়ুদূষণের মাত্রাও বেশি। গত এক দশক ধরে ৪৪ শতাংশ বায়ুদূষণ বাড়ায় এ চার দেশের মানুষের গড় আয়ু অন্তত গড়ে পাঁচ বছর কমে যেতে পারে। আর বিশ্বব্যাপী এ গড় আয়ু হ্রাস পেতে পারে কমবেশি তিন বছর।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৩৪ দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে দূষিত বায়ু ঢাকা এবং খুলনা অঞ্চলে।

 

এ দুই অঞ্চলে বসবাসরত মানুষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনের আট গুণ বেশি দূষিত বায়ুতে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন। বিশ্ব জুড়ে বাতাসে পিএম-২.৫ বায়ুকণার ২৫ শতাংশ সরবরাহ করছে যানবাহন। ২০ শতাংশ আসছে কাঠ ও কয়লা পোড়ানোর কারণে। এছাড়া বায়ুতে ১৫ শতাংশ অতি সূক্ষ্ম পদার্থের জন্য দায়ী বিদ্যুেকন্দ্র ও অন্যান্য শিল্পকারখানা।

 

আন্তর্জাতিক জার্নাল কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চে প্রকাশিত একটি গবেষণায়, বায়ুদূষণকে ‘মহামারি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে সারা বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু প্রায় তিন বছর কমেছে। অকালে মারা যাচ্ছে প্রায় ৮৮ লাখ মানুষ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—তেল, গ্যাস, কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্পন্ন দূষণ সৃষ্টিকারী কণার প্রভাব মানুষের ফুসফুসে প্রায় এক বছর পর্যন্ত থাকতে পারে।

 

গবেষণার প্রধান লেখক জস লেলিয়েভেল্ড বলেন, জনস্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব ধূমপানের চেয়েও ক্ষতিকর। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে এই ক্ষতি কমানো সম্ভব। মহামারির তুলনায় বায়ুদূষণেই বেশি মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। ম্যালেরিয়ার তুলনায় ১৯ গুণ এবং এইডসের তুলনায় প্রায় ৯ গুণ বেশি মানুষ বায়ুদূষণের কারণে অকালে মারা যাচ্ছেন।

 

বায়ুদূষণ থেকে কেবল ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ। এর প্রভাবে ফুসফুসের অন্যান্য রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অন্যান্য মহাদেশের তুলনায় এশিয়ায় বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি। বায়ুদূষণের কারণে চীনে ৪ দশমিক ১, বাংলাদেশে ৪ দশমিক ৭, ভারতে ৩ দশমিক ৯ এবং পাকিস্তানে ৩ দশমিক ৮ বছর গড় আয়ু কমেছে।

 

ধনী দেশগুলোর তুলনায় দরিদ্র দেশে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি। যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপ এবং দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে বায়ুদূষণ তুলনামূলকভাবে কম। ধনী দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়ার রোমানিয়া, বুলগেরিয়া এবং হাঙ্গেরিতে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ হয়।

 

গবেষক টমাস মাঞ্জেল বলেন, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অকালমৃত্যুর জন্য মূলত মানবসৃষ্ট দূষণই দায়ী। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বছরে প্রায় ৫৫ লাখ মানুষকে অকালমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব।

 

এয়ার ভিজ্যুয়াল বাতাসের মানকে মোট ছয়টি স্কেলে পরিমাপ করে থাকে। এগুলো হচ্ছে—গুড, মডারেট, আনহেলদি ফর সেনসেটিভ গ্রুপস, আনহেলদি, ভেরি আনহেলদি এবং হেজার্ডাস (বিপজ্জনক)।

 

ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রাকে হেজার্ডাস বলেই অভিহিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়ুমান যাচাইয়ের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়াল। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) কিছুদিন পূর্বে ঢাকার ধুলাদূষণ নিয়ে একটি গবেষণা করেছে। এতে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের গাছপালায় প্রতিদিন ৪৩৬ মেট্রিক টন ধূলিকণা জমে।

 

সেই হিসাবে মাসে ১৩ হাজার মেট্রিক টন ধুলা জমার হিসাব পেয়েছেন তারা। ঢাকার চারটি পার্ক ও উদ্যানে বিভিন্ন প্রজাতির ৭৭টি গাছের পাতা সংগ্রহের পর এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়।

 

পরিবেশ মন্ত্রণালয় বায়ুদূষণের জন্য ২০টি কারণ চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো—ইটভাটা, রাস্তা নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও মেরামত, সেবা সংস্থাগুলোর নির্মাণকাজ ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, বড় উন্নয়ন প্রকল্প (এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল), সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ, সড়ক বা মহাসড়কের পাশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বালু উত্তোলন ও সংগ্রহ,

 

ট্রাক বা লরিতে বালু, মাটি, সিমেন্টসহ অন্য নির্মাণসামগ্রী উন্মুক্ত অবস্থায় পরিবহন, রাস্তায় গৃহস্থালি ও পৌর বর্জ্য স্তূপাকারে রাখা ও বর্জ্য পোড়ানো, ড্রেন থেকে ময়লা তুলে রাস্তায় ফেলে রাখা, ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করতে গিয়ে ধুলাবালি ছড়ানো, বিভিন্ন সড়কের পাশে থাকা অনাবৃত স্থান, ফুটপাত ও রাস্তার আইল্যান্ডের মধ্যের ভাঙা অংশের মাটি ও ধুলা, ফিটনেসবিহীন পরিবহন থেকে নিঃসৃত ক্ষতিকর ধোঁয়া,

 

বিভিন্ন যানবাহনের চাকায় লেগে থাকা কাদামাটি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কলোনির ময়লা-আবর্জনা পোড়ানো, বিভিন্ন মার্কেট, শপিংমল ও বাণিজ্যিক ভবনের আবর্জনা ও ধুলাবালি রাস্তায় ফেলে দেওয়া, ঢাকা শহরের দূষণপ্রবণ এলাকার ধুলা, হাসপাতালের বর্জ্য রাস্তায় ফেলা, অধিক সালফারযুক্ত ডিজেল ব্যবহার এবং জনসচেতনতার অভাব।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটার ধোঁয়া ৫৮ শতাংশ দায়ী। বাকি ৪২ শতাংশের জন্য দায়ী নির্মাণ ও মেরামতকাজের সঙ্গে আসা ধুলা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন থেকে বের হওয়া ধোঁয়া।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছয় ধরনের পদার্থ এবং গ্যাসের কারণে ঢাকায় দূষণের মাত্রা সম্প্রতি অনেক বেড়ে গেছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণা অর্থাত্ পিএম ২.৫-এর কারণেই ঢাকায় দূষণ অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠছে।

 

 

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, দূষণের জন্য এতদিন আমরা বাইরে থেকে আসা বাতাসের সঙ্গে ধুলোবালিকেই দায়ী করেছি বেশি। আজ বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন।

 

আজ পুরো দূষণের কারণ আমাদের নিজেদের দূষণ। বড় প্রকল্পের কাজ, যানবাহনের ধোঁয়া, আবর্জনা পোড়ানোর ধোঁয়াই মূলত বায়ুদূষণের জন্য দায়ী। এগুলো বন্ধ করে দ্রুত বড় রাস্তাগুলোতে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা দরকার এখনি। নইলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।

 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নির্বাহী সহসভাপতি ডা. মো. আব্দুল মতিন বলেন, দূষণ কেন হয়, দূষণ রোধে কি কি করতে হবে তা আমরা যেমন জানি, সরকারও জানে। গণমাধ্যমে বহু বার এসব নিয়ে লেখালেখি হয়েছে। আসল বিষয় হচ্ছে সরকার এটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে কি না। সরকার চাইলেই দূষণ রোধ করা সম্ভব।