আজ ৯ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

024005Wine kalerkantho pic 1

ভেজাল মদের কারবারে প্রাণক্ষয়

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:মদসহ বিভিন্ন মাদক সেবনে তাত্ক্ষণিক অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছেই। সম্প্রতি ভেজাল মদপানে একের পর এক মৃত্যুতে রাজধানীসহ দেশজুড়ে একরকম ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। নানা কারণে দেশে বিদেশি মদের দাম বেড়ে যাওয়ায় অসাধু ব্যক্তিরা এই ভেজাল কারবারে জড়াচ্ছে। প্রায়ই ‘ভেজাল মাদক’ সেবনে মৃত্যুর খবর জানা গেলেও এই প্রাণহানির পেছনে দায়ী ব্যক্তিরা থাকছে আড়ালেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গেল এক বছরে দেশে শতাধিক ব্যক্তি মদপানে অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। এর মধ্যে কয়েকজন নারীও রয়েছে। মদপানে অসুস্থ হয়ে মারা গেলে মৃত ব্যক্তির পরিবার সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চায়। ফলে সেই বিষাক্ত মাদক জব্দ করে পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা আইন রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে আর সম্ভব হয় না। তবে মৃত ব্যক্তির ভিসেরা পরীক্ষায় প্রায়ই মাদকের সঙ্গে প্রাণঘাতী রাসায়নিক থাকার প্রমাণ মেলে। এর মাধ্যমে দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার নজির খুবই কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশি মদ, ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল ভেজাল করতে গিয়ে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশায় মাদক কারবারিরা। আর বিদেশি মদের বেশির ভাগই বৈধ পন্থায় আমদানির দাবি করে অবৈভাবে কেনাবেচা হচ্ছে। পুরান ঢাকায় এসব মদের বোতলে ভেজাল মেশানো হয় বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। দামি মদের বোতলে সাধারণ পানীয় মিশিয়ে ঝাঁজালো করতে প্রাণঘাতী রাসায়নিক মিথানল মিশিয়ে দেওয়া হয়। ইথানল ও মিথানল একই রকম হওয়ায় সাধারণভাবে অনেকে তা চিনতে পারে না। মাদকে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি ঠেকাতে সবখানে নজরদারি ও মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায়ও আনতে হবে।

সর্বশেষ গত রবিবার রাতে বগুড়ায় মদপানে পাঁচজন মারা গেছে। একই দিন গাজীপুরের একটি রিসোর্টে গিয়ে মদ পান করে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তিন কর্মকর্তার মৃত্যু হয়। গত রবিবারেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী হাসপাতালে মারা যান। তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মৃত্যুঞ্জয় দে সজল বলেন, ‘চার বন্ধু মিলে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্টে যায়। সেখানে তারা মদ পান করে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

সম্প্রতি ভাটারার মাদানি এভিনিউর এক পরিবারের ছেলে-মেয়েসহ চারজন ময়মনসিংহে মদপানে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। পরিবার কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনজনের লাশ দাফন করে। ভাটারা থানার ওসি মোক্তারুজ্জামান বলেন, ‘পরিবার কোনো অভিযোগ করে না। এমন ঘটনা চাপা দিলে কিছু করার থাকে না। তবে আগে জানা গেলে আমরা ময়নাতদন্ত ও পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে ব্যবস্থা নিই।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) পরিচালক (চিকিৎসা ও পুনর্বাসন) মু. নুরুজ্জামান শরীফ বলেন, গত ৮ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় মদপানে অসুস্থ হয়ে ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মীসহ চারজনের মৃত্যু হয়। কাউকে কিছু না জানিয়ে পারিবারিকভাবে দুজনের দাফনও করা হয়। সোনারগাঁ থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানায়, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। তোফাজ্জল ও মহসিনের লাশ কাউকে না জানিয়ে দাফন করে তার স্বজনরা। পরিবারের সদস্যরা মদপানের কথা অস্বীকার করে।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল চক্র সাহা বলেন, ‘কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে, দেশি বা বিদেশি মদে ইথানলের বদলে মিথানল দিয়ে ভেজাল করা হয়। মিথানল বিষাক্ত, প্রাণঘাতী। দুটো দেখতে একই রকম।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিদেশি মদ মানসম্মতভাবে তৈরি করা হয়ে থাকে। এগুলো পান করে মরার কথা নয়। এতেই পরিষ্কার এগুলো ভেজাল হচ্ছে।’

ডিএনসির আরেক কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক এক ব্যক্তি লাইসেন্স নিয়ে নির্দেশনা মেনে মদ পান করতে পারবে। তবে এ আইন মানার বালাই নেই। আগে দেশি মদে স্পিরিট মেশানোর কারণে নিম্নশ্রেণির মানুষ মারা যেত। এখন বিদেশি মদে ভেজালের কারণে অভিজাত শ্রেণির মানুষও মারা যাচ্ছে। পুরান ঢাকার লালবাগসহ কিছু এলাকায় বিদেশি মদের বোতলে ভেজাল দেওয়ার গোয়েন্দা তথ্য আছে। বিদেশি মদ বেশির ভাগই অবৈধ কেনাবেচা হয়। নজরদারি না থাকায় মান যাচাই হচ্ছে না।’

গত ইংরেজি নববর্ষের পার্টিতে রাজশাহীতে বিষাক্ত মদপানে পাঁচজন মারা যায়। গত বছরের ২৭ মে বিষাক্ত মদপানে দিনাজপুরের বিরামপুরে আট ও রংপুরের শ্যামপুর এলাকায় তিনজনসহ ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। চোলাই মদপানে মৃত্যুর ওই ঘটনাটিও গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়। মদপানে গত ৫ এপ্রিল রংপুরে চারজন, ৪ মে খুলনায় হরিজন সম্প্রদায়ের দুই নারী-পুরুষ, ২৮ মে বগুড়ার ধুনটে দুই যুবক, ২৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনজন, ২৫ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে একজন এবং ৬ নভেম্বর লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের চলবলায় দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘ময়নাতদন্ত হলে এবং সুরতহালে পুলিশ বিষাক্ত কিছু সেবনে মৃত্যুর সন্দেহ প্রকাশ করলে আমরা ভিসেরা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাই। সে পরীক্ষায় অনেক সময়ই মিথানলসহ বিষাক্ত কোনো রাসায়নিকের উপাদান মেলে। তখন আমরা ময়নাতদন্তে উল্লেখ করি। এর পেছনে কে বা কারা আছে, তা বের করার দায়িত্ব পুলিশের।’

অভিযোগ করলে ধরা পড়ে অপরাধী : পরিবার অভিযোগ করলে ঘটনা তদন্তে দায়ী ব্যক্তি ধরা পড়ার নজিরও আছে। গত বছরের ২০ থেকে ২৫ মের মধ্যে যশোরের তিন উপজেলায় মদপানে ১৫ জন মারা যায়। এসব ঘটনায় মৃত দুই ব্যক্তির স্ত্রী ও পুলিশ বাদী হয়ে পাঁচটি মামলা করে যশোর মাড়োয়ারি মন্দিরসংলগ্ন পতিতাপল্লীর সামনে মদ বিক্রেতা মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে। তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়। পরবর্তী তদন্তের ব্যাপারে জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ওসি শেখ মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ডিসেম্বরেই মাহমুদুলসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তাঁরা বেশি লাভের আশায় মদে বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়েছেন। এতে মানুষের মৃত্যু হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি-মিডিয়া) ওয়ালিদ হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন থানা এলাকায় যে বিষাক্ত মদ পান করে মানুষের জীবননাশের ঘটনা ঘটেছে, সে ব্যাপারে আমাদের নজরদারি আছে। অভিযোগ, তথ্য পেলে আমরা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করি। সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মদ বিক্রেতাসহ অবৈধ মদের কারখানায় অভিযান শুরু হয়েছে। গত রাতে রাজধানীর খিলবাড়ীরটেক এলাকায় অভিযান চালিয়েছে ডিবি।’