আজ ২৪শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৭ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

gold monir

মনিরের কপাল খোলে শফি সাক্ষী হওয়ায়

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:১৯৯৬ সালের ৯ মে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (তৎকালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) লন্ডন ফেরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক সুরত মিয়া কাস্টমস কর্মকর্তাদের হাতে হত্যাকা-ের শিকার হন। ওই ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলায় আসামি করা হয় কাস্টমসকে। আসামি পক্ষে অর্থাৎ কাস্টমসের পক্ষে ওই মামলায় সাক্ষী হন রাজধানীর উত্তরখানের বাসিন্দা মো. শফিকুল। এক্ষেত্রে শফিকুলের সঙ্গে কাস্টমসের একটি অদৃশ্য চুক্তি হয় যে, তাদের পক্ষে আদালতে সাক্ষী দেওয়ার বিনিময়ে শফিকুলের পাচারকৃত স্বর্ণের চালানে চোখ রাখবে না কাস্টমস।

অদৃশ্য, অলিখিত এ চুক্তি বাগিয়েই স্বর্ণ পাচারে ভীষণ বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি; গড়ে তোলেন সোনা চোরাকারবারে একচ্ছত্র আধিপত্য। এর পর অল্পদিনেই স্বর্ণ চোরাচালানে আন্তর্জাতিক চক্রের অন্যতম এক সদস্য হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন; মো. শফিকুল ধীরে ধীরে হয়ে যান সোনা শফি। তার সোনার কারবারে এ পর্যায়ে সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ন হন মনির হোসেন। দিন দিন চোরাকারবারের অন্ধকার জগতে আলো ছড়াতে থাকেন মনির, বাড়তে থাকে তার প্রভাব, খেতাবও

জোটে গোল্ডেন মনির হিসেবে। দোকানের সেলসম্যান গোল্ডেন মনির এবং হকারের পেশা থেকে আসা সোনা শফি মানিকজোড় গত কয়েক দশকে হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়েছেন; অবৈধ পথে গড়ে তুলেছেন বিশাল বিত্ত-বৈভব। সম্প্রতি র‌্যাবের জালে ধরা পড়েছেন মনির। অবৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি, রাজউকের ভূমি দখলসহ নানা অপরাধের অভিযোগে গোল্ডেন মনিরের রাজধানীর মেরুল বাড্ডার বাসভবনে গত শুক্রবার মধ্যরাত থেকে গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত অভিযান চালায় র‌্যাব, গ্রেপ্তার করা হয় গোল্ডেন মনিরকে। কিন্তু পালের গোদা সোনা শফি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

র‌্যাব বলছে, নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে কামানো গোল্ডেন মনিরের সম্পত্তির পরিমাণ হাজার কোটি টাকারও অনেক বেশি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সিল নকল করে এবং প্রতিষ্ঠানটির কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে রাজধানীতে অন্তত ২শ প্লট হাতিয়ে নিয়েছেন গোল্ডেন মনির।

সাড়ে ১২ ঘণ্টা অভিযানের পর গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, মনির হোসেনের বাসা থেকে বিদেশি একটি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি, চার লিটার বিদেশি মদ, ৩২টি নকল সিল, ২০ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, ৫০১ ইউএস ডলার, ৫০০ চাইনিজ ইয়েন, ৫২০ রুপি, ১ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার, ২ লাখ ৮০ হাজার জাপানি ইয়েন, ৯২ মালয়েশীয় রিঙ্গিত, হংকংয়ের ১০ ডলার, ১০ ইউএই দিরহাম, ৬৬০ থাই বাথ জব্দ করা হয়েছে। এগুলোর মূল্যমান ৮ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৬ টাকা। এ ছাড়া ৬০০ ভরি স্বর্ণালংকার এবং নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে।

সরকারের একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নেমে ঘটনার সত্যতা পায় র‌্যাব। ঢাকা ছাড়ার জন্য আজ রবিবারের একটি ফ্লাইটের টিকিটও কেনা ছিল মনিরের। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার আগেই র‌্যাবের জালে ধরা পড়েন এ স্বর্ণ চোরাকারবারি।

আশিক বিল্লাহ বলেন, নব্বইয়ের দশকে গাউছিয়া মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানের সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন মনির। এরপর রাজধানীর মৌচাকের একটি ক্রোকারিজ দোকানে তিনি কাজ নেন। সে সময় এক লাগেজ ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় হলে মনির লাগেজ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ঢাকা-সিঙ্গাপুর-ভারত, এই রুটে তিনি প্রথমে লাগেজে করে কাপড়, কসমেটিক, ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটারসামগ্রী, মোবাইল, ঘড়িসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আনা-নেওয়া করতেন। এই কাজগুলো করতে করতে তিনি লাগেজ স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন। বায়তুল মোকাররমে একটি জুয়েলারি দোকান দেন, যা তার এই চোরাকারবারি কাজে সাহায্য করে।

সময়ের ব্যবধানে মনির বড় ধরনের স্বর্ণ চোরাচালানকারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার নাম হয়ে যায় গোল্ডেন মনির। চোরাচালানের দায়ে ২০০৭ সাল বিশেষ ক্ষমতা আইনে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। তিনি বলেন, রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে ভুয়া সিল বানিয়ে সে বিপুল পরিমাণ ভূমি দখল করেছে; অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছে। ডিআইটি প্রজেক্ট ছাড়াও বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জে তার ২০০ বেশি প্লট রয়েছে বলে র‌্যাব জানতে পেরেছে। রাজউকের সম্পত্তি বেদখল করে এবং স্বর্ণ চোরাচালানে করে বর্তমানে তার সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটির টাকার বেশি।