আজ ৮ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৪শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মন্ত্রী বলছেন শঙ্কা নেই তবু পেঁয়াজের দাম চড়া
মন্ত্রী বলছেন শঙ্কা নেই তবু পেঁয়াজের দাম চড়া

মন্ত্রী বলছেন শঙ্কা নেই তবু পেঁয়াজের দাম চড়া

প্রথমবার্তা প্রতিবেদকঃ গত এক মাসে পেঁয়াজের বাজার কিছুটা অস্থিতিশীল হলেও বাজারে ঘাটতি নেই। পর্যাপ্ত মজুদ আছে, আমদানি করা পেঁয়াজও বাজারে ঢুকছে। আমদানির পথে আছে আরো। এসব বিবেচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, দাম বাড়া নিয়ে শঙ্কা নেই। শিগগিরই দাম কমে আসবে। কিন্তু বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে।

 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, আগামী এক মাস পেঁয়াজের বাজার নিয়ে তারা শঙ্কিত। এই শঙ্কা দূর করতে আগামী তিন-চার মাসের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের পরামর্শ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

 

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ, সরবরাহ, আমদানি, মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখতে করণীয় বিষয়ে আলোচনার জন্য এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

 

বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘চার দিক থেকে চেষ্টা করছি যতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ভারত ছাড়াও মিয়ানমার থেকে যদি পেঁয়াজ আনা যায়, তাহলে কিন্তু অত চাপ পড়ার কথা না।’

 

এনবিআরের সদস্য সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পেঁয়াজের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে। পর্যালোচনা করে কাল (আজ মঙ্গলবার) জানানো হবে।

 

এর আগে বৈঠকে পেঁয়াজ, ভোজ্য তেল, চিনি ও মসুর ডাল নিয়ে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি) এ এইচ এম সফিকুজ্জামান।

 

এর মধ্যে ব্যবসায়ীরা চিনি ও তেলের দাম আরেক দফা বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। গত মাসে এক দফা বাড়িয়ে এই দুটি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে পেঁয়াজ মজুদ থাকলেও আগামী এক মাস এই পণ্যটির বাজার নাজুক থাকার শঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ভোজ্য তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি। সেই তুলনায় স্থানীয় বাজারে কম। চিনি ও মসুর ডালের বাজার কিছুটা বাড়তির দিকে হলেও ঘাটতি নেই। মসুর ডালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে বেড়েছে ১১ শতাংশ; স্থানীয় বাজারে গত এক মাসে বেড়েছে ১৮ শতাংশ।

 

পেঁয়াজের চাহিদা, উৎপাদন ও আমদানি চিত্র উল্লেখ করে বলা হয়, দেশে প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন ২৯ লাখ ৫৫ হাজার টন। প্রক্রিয়াজাত করার সময় ক্ষতি হয় ২৫ শতাংশ। এই ঘটতি মেটাতে আমদানি করতে হয় ছয়-সাত লাখ টন। এর মধ্যেও অপচয় হয় ৮ থেকে ১০ শতাংশ। তাই সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কিছুটা ঘাটতি থাকে।

 

আমদানির ৯৫ শতাংশই হয় ভারত থেকে। পূজা ও বৃষ্টির কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া দেশের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। ডিসেম্বর থেকে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করলে এই সমস্যা কেটে যাবে বলে আশা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে পেঁয়াজ মজুদ আছে চার লাখ ২১ হাজার টন। গতকাল ভারত থেকে পেঁয়াজ এসেছে ১৮০ ট্রাক। গত বছর পেঁয়াজের দাম পড়ে গিয়েছিল। তাই চলতি অর্থবছরে ঋণপত্র কম খোলা হয়েছে।

এক মাস আগে স্থানীয় পেঁয়াজের দর ছিল ৪০-৪৫ টাকা কেজি। আর আমদানির পেঁয়াজ ৩৮-৪০ টাকা।

 

গত এক সপ্তাহে দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়ে হয়েছে ৭০-৭৫ টাকা। আমদানির পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আরিফুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, পেঁয়াজের দাম সহনীয় রাখতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে টিসিবি ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি শুরু করেছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রতিটি ট্রাকে ৭০০ কেজি দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে এক টন করে দেওয়া হবে।

 

প্রয়োজনে ট্রাকের সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে। ১৫ টন মজুদ আছে। এ ছাড়া ভারত ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আসছে। বন্দরে আছে চার হাজার টন।

 

ভোজ্য তেল : দেশে প্রায় ২০ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় দুই লাখ টন। আমদানি হয় প্রায় ১৮ লাখ টন। অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আসে প্রায় পাঁচ লাখ টন। সয়াবিন বীজ আমদানি হয় প্রায় ২৪ লাখ টন (যা থেকে চার লাখ টন অপরিশোধিত তেল হয়)। অপরিশোধিত পাম তেল আমদানি প্রায় ১১ লাখ টন। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে ৭০ শতাংশ। স্থানীয় বাজারে তা ৪০ শতাংশ। সেই হিসেবে স্থানীয় বাজারে কম।

 

চিনি : দেশে প্রায় ১৮ লাখ টন পরিশোধিত চিনির চাহিদা রয়েছে; আখ থেকে চিনির স্থানীয় উৎপাদন ৩০ হাজার টন। আমদানি হয় প্রায় ১৮ লাখ টন। চিনির আন্তর্জাতিক বাজারদর বাড়তির দিকে। তবে ঘাটতি নেই। ৭৯ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে স্থানীয় বাজারে। গত মাসে ছিল ৭৮-৮০ টাকা। ৭৫ টাকা প্যাকেটজাত চিনি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। খোলা চিনি ৭৪ টাকা।

 

মসুর ডাল : দেশে প্রায় পাঁচ লাখ টন মসুর ডালের চাহিদা রয়েছে। আমদানি করতে হয় প্রায় চার লাখ টন। মসুর ডাল আমদানিতে কোনো শুল্ক নেই। গত মাসে মসুর ডালের দাম ছিল কেজি ৮৫-৯০ টাকা। এখনো একই দাম আছে। মান ভেদে ১০৫ থেকে ১১০ টাকা।

 

বৈঠকে ব্যবসায়ীদের প্রতি ভোগ্য পণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখার পরামর্শ দিয়ে অতিরিক্ত সচিব সফিকুজ্জামান বলেন, পণ্যের দাম বাড়িয়ে নির্ধারণের পর এক ঘণ্টার মধ্যে ব্যবসায়ীরা সেটা কার্যকর করে ফেলেন। কিন্তু যখন দাম কমানো হয় তখন তাঁদের এক সপ্তাহ লেগে যায়। ভোক্তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করার জন্য ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানান তিনি।

 

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষ। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁরা সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে এর মধ্যে চিঠি দিয়েছেন। এনবিআরকে শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য বলা হয়েছে। মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আনার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি মনিটরিংয়ের জন্য বলা হয়েছে।