আজ ৮ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২১শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

030711Meradona 01 kalerkantho pic

ম্যারাডোনার শেষ ইচ্ছা যা ছিল এবং…

প্রথমবার্তা প্রতিবেদক: ‘ব্যক্তিগত জীবন বড় কিছু না। ফুটবল নিয়ে তুমি যে আনন্দ দিয়েছ সেটা ভুলব না কখনো’—এমন হাজারো ব্যানার ছেয়ে গেছে বুয়েনস এইরেসের রাস্তায়। কেউ রাজপথে দোকানের সামনে বিশাল পোস্টার সেঁটে দিয়েছেন রাজপুত্রের। কেউ দেয়ালে চিত্রকর্ম এঁকে লিখেছেন ‘রাজা’। শুধু বুয়েনস এইরেস নয়, ডিয়েগো ম্যারাডোনার অকালপ্রয়াণে কাঁদছে পুরো আর্জেন্টিনা, কাঁদছে পুরো ফুটবলবিশ্ব। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পর পরশু সমাহিতও করা হয়েছে এই কিংবদন্তিকে। কিন্তু আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ওলে, স্পেনের মার্কা আর রয়টার্সের মতো সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে সমাহিতই হতে চাননি ফুটবলের রাজা!

অনেক মানুষই নাকি মৃত্যুর গন্ধ পান? ডিয়েগো ম্যারাডোনাও কি পেয়েছিলেন? না হলে সমাহিত না করার ইচ্ছাটা জানাবেন কেন। ৬০তম জন্মদিনের আগে পরিবারের সদস্যদের ডেকে তাঁর লাশ সংরক্ষণের কথা জানিয়েছিলেন ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী এই মহানায়ক। আর্জেন্টাইন সাবেক অধিনায়কের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন সাংবাদিক মার্তিন আরেভালো। এমনিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকলেও আরেভালো হৃদয় জিতেছিলেন ম্যারাডোনার। সেই তিনি টিওয়াইসি স্পোর্টসকে জানালেন, ‘যদি মারা যান তাহলে যেন লাশটা সংরক্ষণ করে রাখা হয়, ৬০তম জন্মদিনের আগে পরিবারের সদস্যদের এমন কথাই জানিয়েছিলেন ম্যারাডোনা।’

আরেভালোর কথা উড়িয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ ম্যারাডোনার এমন প্রস্তাবের সময় উপস্থিত ছিলেন তাঁর আইনজীবী মাতিয়াস মোরলা। তিনি নাকি পরামর্শ দিয়েছিলেন, লাশ সংরক্ষণ করার প্রস্তাবটা দলিল করে রাখতে। তবে এ নিয়ে গণমাধ্যমে মোরলা এখনো জানাননি কিছু। আর্জেন্টিনার ইতিহাসে লাশ সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে কেবল দুজনের। এর একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরন। আরেকজন পেরনেরই স্ত্রী ইভা পেরন।

এমন কিছু বলে থাকলেও পরিবার থেকে সমাহিত করার সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে শেষ পর্যন্ত। পরশু বুয়েনস এইরেসের বেলা ভিস্তা সমাধিক্ষেত্রে চোখের জলে জানানো হয়েছে চিরবিদায়। যেখানে উপস্থিত ছিলেন ম্যারাডোনার খুব কাছের অল্প কয়েকজন সদস্য। আর বাইরে ছিলেন হাজারো সমর্থক। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ বিলাপ করছিলেন তো কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন একে অন্যকে। এর মাঝেই একটা ছবি ভাইরাল বিশ্বজুড়ে। বোকা জুনিয়র্সের এক সমর্থককে জড়িয়ে কষ্টটা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন রিভার প্লেটের এক সমর্থক। এমনিতে চিরশত্রু দুই দলের সমর্থকদের মারামারি, দাঙ্গা খুবই সাধারণ আর্জেন্টিনায়। কিন্তু ম্যারাডোনাই একমাত্র মানুষ যিনি এক সুতায় গাঁথতে পেরেছেন বোকা-রিভারকে। সেটা বেঁচে থাকতেও যেমন, তেমনি মৃত্যুর পরও।

মৃত্যুর ঠিক আগের দিনের একটি ভিডিও গতকাল এসেছে সংবাদমাধ্যমে। ম্যারাডোনা তখন দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছিলেন। কষ্ট হচ্ছিল পা চালাতে। পাশের বাড়ির ব্যালকনি থেকে একজন মেয়ে খুশিতে চিৎকার করে ওঠেন তাঁকে দেখে। একটু থেমে, সঙ্গী একজনের কাঁধ থেকে একটা হাত সরান ম্যারাডোনা। এরপর ভক্তের দিকে ঘুরে সেই হাতটা নাড়ান কিছুক্ষণ। এটাই জীবিত অবস্থায় এ পর্যন্ত তাঁর শেষ ভিডিও।

আর শেষ ছবি? সেটা প্রেসিডেনশিয়াল প্যালেস কাসা রোসাদার সৎকার বিভাগের ডিয়েগো মালিনার সঙ্গে! ম্যারাডোনার লাশ এত কাছে থেকে দেখে পেশাদারিত্ব ভুলে যান তিনি। কফিন খুলে নিথর দেহটার সঙ্গে ছবি তুলে পোস্ট করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ব্যাস, ঝড় ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ম্যারাডোনার আইনজীবী মোরলাই লিখেছেন, ‘আমার প্রিয় বন্ধুর স্মৃতির জন্য হলেও আমি সে সময়ই শান্ত হব, যখন দেখব এই জঘন্য কাজটা যে করেছে, তার উচিত শাস্তি হচ্ছে।’ এর মধ্যে অবশ্য চাকরি হারিয়েছেন মালিনা। পুলিশ হেফাজতেও নেওয়া হয়েছে তাঁকে।

ম্যারাডোনার আইনজীবী মোরলা ক্ষোভ জানিয়েছেন লা প্লাতা আইপেনসো ক্লিনিকের বিপক্ষেও। সেখানেই ভর্তি ছিলেন ম্যারাডোনা। ক্লিনিক থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়িতে চলছিল চিকিৎসা। তবে মৃত্যুর আগে ১২ ঘণ্টা পাননি কোনো চিকিৎসকের সেবা। হার্ট অ্যাটাকের পর অ্যাম্বুল্যান্সও ৩০ মিনিট দেরিতে এসেছিল বলে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন মোরলা, ‘সান ইসিদ্রোর প্রসিকিউটর অফিস থেকে জেনেছি, মৃত্যুর ১২ ঘণ্টা আগে আমার বন্ধুর জন্য নিয়োজিত কেউ যায়নি তাঁর কাছে। অ্যাম্বুল্যান্স আসতেও ৩০ মিনিট দেরি হয়েছে। এটা অপরাধমূলক কাজ। আমি এ নিয়ে তদন্তের আহ্বান করব। ম্যারাডোনা সব সময় বলত আমি ওর সৈনিক।’

এক সাক্ষাৎকারে ম্যারাডোনা জানিয়েছিলেন, ‘আবারও ডিয়েগো হয়ে জন্মাতে চাই।’ তিনি কি আবারও ফিরে আসবেন? নাই বা আসুন, ম্যারাডোনা চিরকাল থেকে যাবেন কোটি ভক্তের হৃদয়ে, পরম ভালোবাসায়।  সূত্র : মার্কা, বিবিসি, এএফপি