আজ ২রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৫ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

025623Rohingya kalerkantho pic 1

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: জরুরি অবস্থা চলার সময় সাধারণত বিদেশের সঙ্গে বড় কোনো সফর বিনিময় বা আলোচনায় বসে না মিয়ানমার। গতকাল সোমবার অং সান সু চির সরকারকে সরিয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পাশাপাশি এক বছরের জরুরি অবস্থাও ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে বলেছে, জরুরি অবস্থা শেষে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন ঠিক এক দিন আগে গত রবিবার বলেছিলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের কাছ থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একটি গোষ্ঠীকে দিয়ে প্রত্যাবাসন শুরু হবে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ যে সামরিক বাহিনী মিয়ানমারে রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়েছে, সেই বাহিনীর সদস্যরাই তিন বছর আগে রাখাইন রাজ্যে জেনোসাইড, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নির্মম নির্যাতন চালিয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে প্রাণে বাঁচতে আট লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মাত্র তিন মাসে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বরাবরই বলে আসছে, রোহিঙ্গাদের ফেরার বিষয়টি অবশ্যই স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক হতে হবে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের ‘বিদেশি’ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে থাকে। এ ছাড়া এখন মিয়ানমারে সর্বময় ক্ষমতাধর সিনিয়র জেনারেল অং মিন অং হ্লাইংসহ শীর্ষ অধিনায়কদের বিরুদ্ধে জেনোসাইডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভিযোগ আছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গারা কতটা ফিরতে আগ্রহী হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একে আদৌ সমর্থন করবে কি না, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন আছে।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল বিকেলে এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও তার বিকাশে বিশ্বাসী। আমরা আশা করি, মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থা সমুন্নত থাকবে। নিকটতম ও বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী হিসেবে মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতাই আমাদের কাম্য।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরো বলেছে, ‘মিয়ানমারের সঙ্গে পারস্পরিক কল্যাণকর সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যেও আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা আশা করি, এই প্রক্রিয়াগুলো চলমান থাকবে।’

রোহিঙ্গা নিপীড়নের অভিযোগে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতসহ (আইসিসি) আন্তর্জাতিক বিচারিক ও জবাবদিহি কাঠামোগুলোতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ধারণা করছে। তবে মিয়ানমার যদি এসব কাঠামোকে পুরোপুরি অসহযোগিতা করার নীতি গ্রহণ করে, তাহলে এই প্রক্রিয়াগুলোও হুমকিতে পড়তে পারে। আইসিজেতে রোহিঙ্গা জেনোসাইডের অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করার পর অং সান সু চির সরকার সেই মামলা লড়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার মিয়ানমার অস্বীকার করে আসছে। এই বিচারিক কাঠামোগুলোর বিষয়ে মিয়ানমারে অভ্যুত্থানকারী সরকারের মনোভাব কী হবে, তা আগামী কিছুদিনের মধ্যেই স্পষ্ট হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মিয়ানমারের সহযোগিতা ছাড়া আন্তর্জাতিক বিচারিক কাঠামোগুলোর কাজ করা কঠিন হবে। কারণ ওই বিচারিক কাঠামোগুলোর নিজস্ব পুলিশ নেই। সদস্য দেশগুলোর সহযোগিতায় ওই আদালতগুলো কাজ করেন।

মিয়ানমার পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিবিড় দৃষ্টি থাকায় বিষয়টি এখন জাতিসংঘের শীর্ষপর্যায়েও উঠতে পারে। এদিকে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা ওআইসি বলেছে, তারা মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নিলে মিয়ানমার বাহিনীর চীন নির্ভরশীলতা আরো বাড়তে পারে। এ ছাড়া সামরিক অভ্যুত্থান সত্ত্বেও চীন-মিয়ানমার সম্পর্ক নষ্ট হবে না বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন। কারণ মিয়ানমারে, বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে চীনের বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।