আজ ৩রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৭ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

এক

লক্ষ্য এক, শুধুমাত্র রাস্তাটা ভিন্ন

হিন্দুরা কেন গরুর মাংস খায় না? হিন্দুরা যেই গরুকে সম্মান করে, সেই গরুকে মুসলিমরা কেটে কেন খায়? মুসলিমরা কেন মাটিতে মাথা ঠুকিয়ে সেজদা দেয়? হিন্দুরা মাটির তৈরী কেন মূর্তি পুজো করে? হিন্দু- মুসলিম ধর্মের কি আসলেই কোন মিল নেই? আসলেই কি এদের লক্ষ্য এক নয়? এই প্রশ্ন বাঙ্গালির মনে হাজার হাজার বছর ধরে ছিলো,রয়েছে, থাকবে।

 

এর সঠিক উত্তরও কেউ কখনো বের করার চেষ্টা করেছে কিনা জানি না, কিন্তু ধোয়াশা রয়েই আছে, রয়েই আছে। শাস্ত্রোজ্ঞ জ্ঞান বাদ দিন, পুথিগত বিদ্যা বাদ দিন। আসুন আজকে মানুষ হিসেবে মানবিক জ্ঞানে আমরা জানার চেষ্টা করি। প্রথমেই বলি গরু নিয়ে – গরুর কদর এই বাঙালি তথা মানবসমাজে হাজার হাজার বছর ধরে এবং গরু আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গরু দুধ দেয়, হাল চাষ করতে সাহায্য করে, আরো কত কত যে উপকারে আসে বলে শেষ করা যাবে না।

 

গরুর দুধ এতোটা পুষ্টিসম্পন্ন, যা খেয়ে হিন্দু মুসলিম তথা সকল মানুষেরাই পুষ্ট হই। আমরা সবাই এটাও জানি, বিজ্ঞানীরা সায়েন্টিফিক্যালি গরুর দুধের পুষ্টিগুণকে আমাদের সবার মায়ের দুধের সাথে তুলনা করেছে। অর্থাৎ গরুর দুধ মায়ের দুধের সমান প্রায়। তাই গরুকে “মাতা ” সম্মোধন করে হিন্দুরা গোমাতা বলে ডাকে। ডাকতে পারে না? আমাদের মুসলিম- হিন্দু উভয় ধর্মে অন্য মা(যেমন কাকিমা, খালাম্মা, জেঠিমা দের)কে ” মা “বলে সম্মোধন করি না? অন্যদিকে , একটা শিশু যখন নিজের মা ব্যতিত অন্য কারো দুধ খেয়ে বড় হয়, সেই মাকে “দুধমাতা ” বলে।

 

নিশ্চয় মানেন? হোক তিনি অন্য কোন মা বা গরু। একসাথে কোন মায়ের ৫টা বাচ্চা থাকলে, সবগুলো বাচ্চার দুধের ঘাটতি কি এক মা পূরণ করতে পারে? তখন অন্য মা বা গরুর দুধ খাওয়ানো হয় না? এটা তো প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে – অন্য মায়ের দুধ খেলে তাকে “দুধমা/ দুধমাতা ” বলা হয়, এই নিয়ম এখনো চলছে, ভবিষ্যতেও চলতেই থাকবে। ঠিক তেমনি গরুকে হিন্দুরা সম্মানপূর্বক গোমাতা ডাকে এবং গরুর মাংস খায় না। মুসলমানেরাও যে অসম্মান করে তাও নয়, তারাও সম্মানপূর্বক গরুকে জবাই করে আল্লাহর কাছে সমর্পন করে, যেমনটা হিন্দু ধর্মে বিশেষ কিছু সম্প্রদায়ে ছাগল বলি দিয়ে করে। সেইম টু সেইম। এখানে ব্যতিক্রমধর্মী কিছু নেই তো।

 

একেকজনের জীবনধারা একেক রকম থাকতেই পারে, স্বাভাবিক এবং সিম্পল ব্যাপার। এরপরে আসি মাটি নিয়ে- মাটি? হা হা হা, এই সেই মাটি যা আপনার, আমার , আমাদের পূর্বপুরুষ, পরিবারের সবার গায়ে ওতপ্রতভাবে লেপ্টে আছে। এই মাটিতে প্রাণ দিয়েছে ৩০ লক্ষ শহীদ, এই মাটিতেই আমরা পেয়েছি আমাদের স্বাধীনতা। এই পবিত্র মাটিতেই মুসলমানেরা “নিরাকার আল্লাহ”র কাছে সেজদা দেয়, হিন্দুরা এই মাটি দিয়েই “নিরাকার ঈশ্বর” এর শাখা প্রশাখার( দেব- দেবীর) প্রতিমা বানিয়ে পুজো করে, মাটিতে শুয়ে নমস্কার করে সম্মান জানায়।

 

হ্যা এই সেই পবিত্র মাটি। এই সম্পর্কে আরো গভীর এবং ব্যাখা জ্ঞান অর্জন করতে হলে আমাদেরকে আমাদের নিজেদের স্ব স্ব ধর্মীয় গ্রন্থগুলোর গভীরে যেতে হবে। কিন্তু, একটুহ যাস্ট একটু গভীরে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ করলে দেখবেন- উপরোক্ত দুইটা ক্ষেত্রেই ঘুরে ফিরেই হিন্দু- মুসলিম ধর্মের মিল রয়েছে। লাইফস্টাইল / পথটা আলাদা শুধু। দুই ধর্মেরই লক্ষ্য এক- “নিরাকার আল্লাহ – ঈশ্বরের কাছে যাওয়া, তার সন্তুষ্টি বজায় রাখা। ” তাহলে ছোট ছোট বিষয় গুলো নিয়ে কেন আমরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করবো? কেন?

 

এতে কি আদৌ হিন্দু – মুসলিমের কোন লাভ হয়? নাকি কিছু দুষ্কৃতিকারীদের লাভ হয়, যারা কখনো চায়নি একসাথে দেশের উন্নয়ণ হোক, মানুষের উন্নয়ণ হোক? লাভটা কাদের আসলে? আসুন না, একসাথে মানবিক হই? ছোট খাটো বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে সংঘাত না করে, নিজের ও দেশের উন্নয়ণে একসাথে অগ্রণী ভূমিকা রেখে যাই। নিজ নিজ ধর্ম পালন করি, নিজ নিজ ধর্মের লক্ষ্যে পৌছাই। আসুন না ঈমানের সহিত, ক্ষুদ্র জীবনটাকে স্বার্থক করে তুলি। ” রাস্তাটা না হয় ভিন্ন, কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে ঘুরে ফিরেই তো লক্ষ্য এক ”

– নিলয় ধর।