আজ ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৮ই মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

Screenshot 20211127 051536

লিটন-মুশফিকের আলো

প্রথমবার্তা প্রতিবেদকঃ আধাকিলোমিটার দূরের ঘটনাস্থল থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পৌঁছে গেল স্টেডিয়ামেও। রাসায়নিক কারখানার অগ্নিকাণ্ড সাতসকালের চট্টগ্রামকে যেন কিছুকাল আগের উত্তপ্ত বৈরুতই বানিয়ে ফেলতে যাচ্ছিল। একটু পর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের শুরুও এর সঙ্গে পাল্লা দিতে থাকল। মাঠের ২২ গজও তাই দিনের প্রথম সেশনেই তাদের জন্য হয়ে উঠল তপ্ত উঠান।

 

ছুটির দিনের ভোরে ভূমিকম্পে মমিনুল হকদেরও ঘুম ভেঙে না গিয়ে পারেই না। তাঁরাও নিশ্চিতভাবেই ভয়াবহ কিছুর আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছেন। মাঠের ছবিও এ ক্ষেত্রে মিলে গেল অনেকটা। খেলা শুরুর পর দেখা গেল কম্পমান বাংলাদেশের ব্যাটিংও। দিনের প্রথম ঘণ্টায় গেলেন দুই ওপেনার, পরের ঘণ্টার অর্ধেকটা না যেতেই ৪৯ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে মহাবিপর্যয়ের মুখে টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া মমিনুলের দল। অধিনায়ক নিজেও ততক্ষণে দলের বিপদ আরো বাড়িয়ে ফিরে গেছেন।

সব মিলিয়ে রীতিমতো বিপন্ন চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম দিনের সকালের বাংলাদেশ। কিন্তু দিনের শেষের সঙ্গে শুরুর মিল আর থাকল না একদমই। বরং শুরুর ধাক্কার পর উল্টো আধিপত্যের গল্প লিখতে শুরু করলেন এমন দুজন, যাঁদের পিঠ ঠেকে গিয়েছিল দেয়ালেই। পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে তাঁকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে বলে নির্বাচকদের তরফ থেকে দাবি করা হলেও মুশফিকুর রহিম নিজে সেটিকে দেখেছেন ‘বাদ পড়া’

হিসেবেই। আর বিশ্বকাপ ব্যর্থতায় টি-টোয়েন্টি দলেই জায়গা হারানো লিটন কুমার দাস তো বাইরের সমালোচনায়ও বিদ্ধ হয়ে চলছিলেন প্রতিনিয়ত।

তাতে ক্ষতবিক্ষত হৃদয় নিয়ে তবু টেস্টের প্রস্তুতিতে নিবিষ্ট রেখেছিলেন নিজেকে। আর ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে লিটনের টেস্ট পারফরম্যান্সও উল্লেখযোগ্য হওয়ায় তাঁর কাছে এবার দলেরও ছিল বাড়তি প্রত্যাশা। সেই সঙ্গে বহু বিপদের ত্রাতা মুশফিকও যোগ হয়ে গিয়ে দিনের বাকি সময়টায় শুধু হতাশায়ই পুড়িয়ে গেলেন পাকিস্তানের বোলারদের। সকালে নতুন বল সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছিল টপ অর্ডার। অথচ বিকেলে ৮০ ওভার পর সেই নতুন বলের চ্যালেঞ্জ দিব্যি সামলে দিয়ে তাঁদের জুটি অবিচ্ছিন্ন ২০৪ রানের।

এই জুটি গড়ার পথে অস্থিরতায় এত দিন নিজের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসতে অভ্যস্ত লিটন দারুণ সুস্থিরতার ছবিও। এর আগে ছক্কা মেরে সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে চাওয়ার চেষ্টায় দুইবার ৯০-এর ঘরে আউট হওয়া এই ব্যাটসম্যানকে এবার সেই বিলাসিতায় পেয়ে বসল না। তাই আরাধ্য প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির দেখাও পেয়ে গেলেন। সেই সঙ্গে নিজের শরীরের সঙ্গে আরেক লড়াইয়েও জিতলেন। হাতের পেশিতে টান পড়ল, বাদ থাকল না পিঠও। এসব অস্বস্তি নিয়েও দিনের শেষে অবিচল লিটন অপরাজিত ১১৩ রানে। তাঁর সঙ্গে পরীক্ষিত যোদ্ধা মুশফিকও অষ্টম টেস্ট সেঞ্চুরির অপেক্ষায় ৮২ রানে। তাই ৪ উইকেটে ৪৯ থেকে প্রথম দিনের শেষেও বাংলাদেশের সংগ্রহ ওই ৪ উইকেটেই ২৫৩ রান।

 

পাকিস্তানের পেসার হাসান আলীও তাই বাংলাদেশের আধিপত্যের ঘোষণা দিতে দ্বিধা করলেন না কোনো, ‘শুরুটা আমরা ভালো করলেও বাংলাদেশই এখন ভালো অবস্থানে।’ দিনের শুরুতে যা ছিল অকল্পনীয়ই। বরং অবস্থা আরো খারাপও হতে পারত। ম্যাচের প্রথম ওভারেই যেমন শাহীন শাহ আফ্রিদির বল সাদমান ইসলামের ব্যাট ছুঁয়ে জমা পড়েছিল উইকেটকিপারের গ্লাভসে। তা বুঝতে না পারা পাকিস্তান আবেদনই করেনি কোনো। ৫ রানে থাকার সময়ও হাসান আলীর বলে পরিষ্কার এলবিডাব্লিউ ছিলেন সাদমান। সে যাত্রায়ও বেঁচে যান পাকিস্তান রিভিউ না নেওয়ায়।

 

ওভাবে দুইবার বেঁচে গিয়েও বেশিক্ষণ টেকেননি সাদমান। হাসানের বলে এলবিডাব্লিউ হওয়ার পর রিভিউ নিয়েও বাঁচেননি এই ওপেনার (১৪)। এর আগেই ফিরে যাওয়া অন্য ওপেনার সাইফ হাসান (১৪) অবশ্য অন্যদের তুলনায় ব্যতিক্রম। হাসান আলীকে মারা দুই বাউন্ডারিতে প্রতিশ্রুতি জাগিয়ে শুরু করা এই তরুণ আউট হন ম্যাচের সেরা বলে। বাউন্ডারি মারার পরের বলেই বাউন্সারে সাইফকে হকচকিয়ে দেন শাহীন। অপ্রস্তুত সাইফ নাক-মুখ বাঁচাতে যান। ব্যাট হয়ে হেলমেটের গ্রিলে লেগে শর্ট লেগে ক্যাচ হন তিনি। সাইফকে বাদ দিলে সাদমানের পর  নাজমুল হোসেন শান্ত (১৪) এবং মমিনুলও (৬) উইকেট ছুড়ে দিয়ে আসেন।

 

দলের যখন এমন বিপদ, তখন নিজেদের শুরুটা সাবধানেই করলেন মুশফিক-লিটন। প্রথম ৫১ বলে মুশফিকের মাত্র ৬ রান করা সে সাক্ষ্যই দেয়। মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগে লিটনকে নিয়ে ২০ রান যোগ করতে খেলেন ৭০ বল। ১৩৪ বল লেগে যায় তাঁদের জুটির ফিফটি হতেও। সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ ২০৭ বলে। ৪০৮ বলে যখন পেরিয়ে যায় জুটির ডাবল সেঞ্চুরিও, ততক্ষণে বাংলাদেশের উইকেটহীন দুটি সেশন পার করাও নিশ্চিত হয়ে গেছে। দিনের শেষ সেশনে অবশ্য শাহীনের বলে পুল করে শর্ট মিডউইকেটে সাজিদ খানের সৌজন্যে বেঁচেও যান লিটন। ১৯৯ বলে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিতে পৌঁছানো ইনিংসে ওই একটি খুঁত বাদ দিলে বরাবরের লিটন থেকে বেরিয়ে আসা ব্যাটিংও করেছেন তিনি। ছাড়ার বল ছেড়েছেন, তবে ছাড়েননি মারার বলও।

 

তাই বিকেলে ভাস্বর প্রথম দিনের সকালের বিপন্ন বাংলাদেশ আজ দ্বিতীয় দিনে আরো চড়ে বসার স্বপ্নও দেখতে পারছে অবলীলায়!