আজ ৮ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২১শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

শনাক্ত

শনাক্ত ৮৫%, মৃত্যু ৪২% বেড়েছে এক সপ্তাহের ব্যবধানে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: দেশে এক সপ্তাহের ব্যবধানে করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত বেড়েছে ৮৫.২৪ শতাংশ। আর মৃত্যু বেড়েছে ৪২.৫৫ শতাংশ। গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে আরো ৩৯ জন, যা প্রায় সাড়ে তিন মাসের মধ্যে এক দিনের সর্বোচ্চ মৃত্যু। এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর ৪০ জনের মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে তিন হাজার ৬৭৪ জন।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরে দেশের রোগতাত্ত্বিক ১১তম সপ্তাহে (১৪-২০ মার্চ) নমুনা সংগ্রহ ছিল এক লাখ ৩৯ হাজার ৬৬৬টি। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ হয়েছে ১২ হাজার ৪৭০ জন। ওই এক সপ্তাহে মৃত্যু হয়েছে ১৪১ জনের। সুস্থ হয়েছে ১০হাজার ৪০৮ জন।পরের ১২তম সপ্তাহে (২১-২৭ মার্চ) নমুনা পরীক্ষা হয়েছে এক লাখ ৭৮ হাজার ৬৮৩টি। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে ২৩ হাজার ১০০ জন, মারা গেছে ২০১ জন ও সুস্থ হয়েছে ১৩ হাজার ২০৪ জন। অর্থাৎ এই এক সপ্তাহে পরীক্ষা বেড়েছে ২৭.৯৪ শতাংশ, শনাক্ত বেড়েছে ৮৫.২৪ শতাংশ, মৃত্যু বেড়েছে ৪২.৫৫ শতাংশ এবং সুস্থতার হার বেড়েছে ২৬.৮৬ শতাংশ। শনাক্ত বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ এবং সুস্থতা বৃদ্ধির হার সর্বনিম্ন।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৩৯ জনের মধ্যে ২৪ জন পুরুষ ও ১৫ জন নারী, যাঁদের মধ্যে ৩৫ জনের বয়স ৫১ বছরের ওপরে (২৫ জন ষাটোর্ধ্ব), ৪১-৫০ বছরের একজন ও ৩১-৪০ বছরের তিনজন; যাঁদের ২৮ জন ঢাকা বিভাগের, পাঁচজন চট্টগ্রামের, দুজন রাজশাহীর, দুজন খুলনার, একজন করে সিলেট ও রংপুরের। সবার মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে।

 

পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে সামনে মৃতের সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, গত এক সপ্তাহে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই আক্রান্ত হয়েছিলেন দুই-তিন সপ্তাহ আগে।

 

তখন শনাক্ত কম ছিল। কিন্তু এখন যেভাবে দিনে সাড়ে তিন হাজারের বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, তাতে আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মাথায় মৃতের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। যদিও এর পরে টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার ১৪ দিন পর থেকে আবার মৃত্যু কমে আসবে বলেই আশা করছি।’

 

তিনি বলেন, যারাই এখন করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে বাড়িতে অক্সিমিটার ব্যবহার। অক্সিজেন সেচুরেশন কমতে থাকলেই জরুরি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। হাসপাতালে যাওয়ার পর যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তবে হয়তো মৃত্যু কমিয়ে রাখা সম্ভব হবে। ফলে রোগী ও হাসপাতাল—উভয়ের সতর্ক ব্যবস্থাপনা এই সময়েই খুবই জরুরি।

 

করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন যারা বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছে, তাদের একটি অংশকে নিতে হচ্ছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। সেখানে নিয়েও বেশির ভাগকেই বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। যারা আইসিইউতে যাচ্ছে তাদের ৯০ শতাংশকেই আর ফেরানো যাচ্ছে না।

 

এমনকি ভেন্টিলেটার সাপোর্ট দিয়েও বাঁচানো যাচ্ছে না তাদের। আইসিইউয়ের জন্য হাহাকার রয়েছেই। প্রতিটি হাসপাতালে প্রতিদিন আইসিইউ পেতে আবেদনের স্তূপ জমছে, আকুতি-দেনদরবার চলছে। কিন্তু পর্যাপ্ত আইসিইউ না থাকায় হতাশ হয়ে অনেকেই সাধারণ শয্যায় বা কেবিনে ভর্তি হচ্ছে। সেখানেই তাদের মৃত্যু হচ্ছে।

 

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা প্রথমবার্তাকে বলেন, প্রতিদিন আইসিইউয়ের চাহিদা অনেক। এখন অনেকের মধ্যেই দেখা যায়, হাসপাতালে আসার পরপরই তাদের আইসিইউ দরকার হয়।

 

কারণ অনেকেই আগে থেকে নানা জটিলতায় ভুগছিল। তারা করোনায় আক্রান্ত হয়েও প্রথম দিকে গুরুত্ব না দিয়ে বাড়িতে সময় কাটায়। এরপর যখন অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে, তখন স্বজনরা হাসপাতালে নিয়ে আসে।

 

এ ধরনের রোগীদের অনেককে অক্সিজেন বা হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার সাপোর্ট দিয়ে সুস্থ করা গেলেও অনেকের আইসিইউ সাপোর্ট দরকার হয়। কিন্তু ততক্ষণে তাদের ফুসফুসসহ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে আইসিইউতে নিয়েও আর বাঁচানো সম্ভব হয় না।

 

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা অনুরোধ করব, বয়স্ক মানুষ এবং যে বয়সেরই হোক, যদি আগে থেকে জটিল কোনো রোগ থাকে এবং তাদের করোনায় আক্রান্ত বা উপসর্গ দেখা দেয়, তবে অবশ্যই তাদের দেরি না করে শুরুতেই হাসপাতালে নিতে হবে। এতে করে সাধারণ অক্সিজেন বা হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার সাপোর্টেই তারা সুস্থ হয়ে যেতে পারে।’

 

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংক্রমণ বেড়েছে বলেই মৃত্যুও বেড়েছে। যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁরা কী অবস্থায় ছিলেন সেগুলো আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখছি। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সারা দেশ থেকে এসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছে।’

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, গতকালও ঢাকায় আট-দশটি বড় হাসপাতালের ১০৮টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে মাত্র তিনটি হাসপাতালে পাঁচটি খালি ছিল। বেসরকারিতেও দেখা দিচ্ছে আইসিইউসংকট।

 

ঢাকার ১০টি বেসরকারি হাসপাতালের ১৮৮টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে গতকাল খালি ছিল ৪৫টি। অন্যদিকে সারা দেশে ৫৭৪টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ৩৪৮টিতে গতকাল রোগী ছিল। ফাঁকা ছিল ২২৬টি, যার বেশির ভাগই ঢাকার বাইরে। তবে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ঢাকায় বেশি থাকায় আইসিইউ শয্যার চাহিদাও এখানে সর্বোচ্চ।