আজ ৩০শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৩ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

022923Bnp kalerkantho pic 1

সমাবেশের সবুজ সংকেত নিয়ে শঙ্কা

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:ভোট কারচুপির প্রতিবাদ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে বিভাগীয় শহরে ছয়টি সমাবেশের ডাক দিয়েছে বিএনপি। তবে সমাবেশগুলোর অনুমতি নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন দলটির নেতারা। তাঁরা বলেছেন, ‘প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের জন্য যে দলীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং উদার সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রবণতা অপরিহার্য, তা আওয়ামী লীগ কখনো রপ্ত করেনি। ভোট ডাকাতি ও জোর-জুলুম করে ক্ষমতায় বসে থাকতেই তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। তাই বিএনপি যে সমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছে সেটির অনুমতি নিয়ে বরাবরের মতো সরকারের নানা টালবাহানা থাকবে। অনুমতি নিয়ে আমরা এবারও পুরোপুরি শঙ্কায় আছি। তারপর আমাদের চেষ্টা থাকবে জনগণকে সম্পৃক্ত করে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সফল করা। যদি সেটা সম্ভব না হয় তাহলে বিকল্প কর্মসূচি থাকবে।’

জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্দোলন-সংগ্রাম আমাদের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার। আমরা এমন কর্মসূচি দেব না যার জন্য অনুমতির প্রয়োজন হবে। তারা (সরকার) এত বোকা নয় যে আমাদের সরকার পতন আন্দোলনের অনুমতি দেবে। বর্তমান সরকার ইলেক্টেড কিংবা সিলেক্টেড যা-ই হোক না কেন, তিনি (শেখ হাসিনা) ক্ষমতায় আছেন। আমরা দেশের মানুষ গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আন্দোলন করব, এ জন্য সরকারের অনুমতি কেন নেব? এর পরও আমাদের অনুমতি নিতে হয়! তারা যদি আমাদের কর্মসূচি বানচাল করে আমরাও শান্তিপূর্ণ বিকল্প আরেকটি কর্মসূচি দেব।’

বিএনপি চট্টগ্রামে আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি, বরিশালে ১৮ ফেব্রুয়ারি, খুলনায় ২৭ ফেব্রুয়ারি, রাজশাহীতে ১ মার্চ, ঢাকা উত্তরে ৩ মার্চ এবং ঢাকা দক্ষিণে ৪ মার্চ সমাবেশের ঘোষণা দেয় গত শুক্রবার।

সূত্রগুলো বলছে, বড় সমাবেশের ক্ষেত্রে বিএনপির ঘোষিত যেকোনো কর্মসূচিতে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ‘সবুজ সংকেত’ না পেলে সেটি পালন করতে পারে না দলটি। বিনা অনুমতিতে কর্মসূচি করার চেষ্টা হলে তা আগেও যেকোনো উপায়ে পণ্ড হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিভাগীয় শহরে সমাবেশের মতো বড় কর্মসূচির জন্য বিএনপিকে এবারও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেছেন, সময়মতো অনুমতি চাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। কিন্তু সেই অনুমতি মিলবে না বলেও ধরে নিয়েছেন নেতারা। তাঁদের সেই শঙ্কা আরো সুদৃঢ় হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের গত শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের পর। সেখানে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সমাবেশের নামে সহিংসতা সৃষ্টি করলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা দমন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে সারা দেশে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সভা-সমাবেশ, প্রতিনিধিসভা ও গণসংযোগ কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীদের মাঠে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার মতে, তাঁর এই বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা তাঁদের ঘোষিত কর্মসূচির দিনক্ষণের দুই-এক দিন আগে বা পরে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। ফলে জনসভার যে প্রস্তুতি সেটি বিএনপি সঠিকভাবে নিতে পারবে না। প্রস্তুতিসভা করলেই সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হানা দেবে। আবার ঘোষিত দিনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাইলেও তারা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা করে তা বাতিল করবে। এর পরও নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন তাঁরা।

জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছয়টি সমাবেশের জন্য কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন গত নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থীরা। এই সমাবেশের উদ্দেশ্য নির্বাচনী অনিয়মের প্রতিবাদ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি করা। এটা তো গণতন্ত্রের বিধান, গণতন্ত্রের পদ্ধতি। এখানে ওবায়দুল কাদের সাহেব হুমকির কী দেখলেন? আমরা বলতে চাই, ওবায়দুল কাদেরের হুমকি জুলুমবাজ, কর্তৃত্ববাদী শাসনের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর বক্তব্যে আবারও প্রমাণিত হলো প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের জন্য যে দলীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং উদার সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রবণতা অপরিহার্য, তা আওয়ামী লীগ কখনো রপ্ত করেনি।’ তিনি আরো বলেন, রাইট টু অ্যাসেম্বলি সংবিধান স্বীকৃত। গণতান্ত্রিক অধিকার হচ্ছে সভা-সমাবেশ করা। আর সেই সভা-সমাবেশ বন্ধ করার হুমকি কোনো রাজনৈতিক নেতা দিতে পারেন না, সেটি শুধু মাফিয়ারাই দিতে পারে।

বরিশাল সিটি নির্বাচনের বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী মজিবুর রহমান সরোয়ার বলেন, ‘ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য জনগণকে প্রচণ্ড অবাক করেছে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল প্রয়োজন। আবার তাঁর সাধারণ সম্পাদক মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে জনরোষের ভয়ে ঘরে বসে হুঙ্কার দিচ্ছেন। আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিয়েছি এবং তা পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, ‘যদি কর্মসূচি করতে না দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের বিকল্প কর্মসূচি থাকবে এবং সেটি আমরা দলীয় ফোরামে বসে সিদ্ধান্ত নেব।’

ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনের মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘ঢাকা উত্তরে ৩ মার্চ আমাদের কর্মসূচি। সেটি সফল করার জন্য খুব শিগগির আমরা প্রস্তুতিসভা করব। তখনই বোঝা যাবে সরকার আমাদের কর্মসূচি করতে দেওয়ার বিষয়ে কতটুকু আন্তরিক। আমরা কর্মসূচি করতে না পারলে অবশ্যই জ্যেষ্ঠ নেতারা বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।’