আজ ৮ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২১শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

034204St. Martin kalerkantho pic

সেন্ট মার্টিনে মানা হচ্ছে না সরকারের নির্দেশনা

প্রথমবার্তা প্রতিবেদকঃ মাঘ মাসের শুরুর দিনও শীতের বালাই নেই। সমুদ্রসৈকতজুড়ে হাজারো মানুষের বিচরণ। ওই সময়ে ছিল সাগরে পূর্ণ জোয়ার। জলের ঢেউ আর গর্জনে বিভোর উপস্থিত পর্যটকরা।

 

এর মধ্যেই সৈকতে ভেসে এলো বিশাল আকৃতির একটি অসুস্থ কচ্ছপ। দৃষ্টিতে পড়তেই কয়েকজন পর্যটক এগিয়ে যায়। কচ্ছপটিকে নাড়া দেয়। সাড়া না মেলায় কচ্ছপটিকে ফের সমুদ্রের ঢেউয়ে ভাসিয়ে দেয় তারা।

 

অন্যদিকে সমুদ্রসৈকতজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল ভাড়া করা মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল। সমুদ্রসৈকতের যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা গেছে পলিথিন, চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, ডাবের খোসা। বলছিলাম সেন্ট মার্টিন সমুদ্রসৈকতের কথা।

 

গত শুক্রবার সকাল ১১টায় এমন চিত্র দেখা গেল সেখানে। এর আগে ২ জানুয়ারি সেন্ট মার্টিন ও ছেঁড়া দ্বীপ রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর ১১ দফা বিধি-নিষেধ আরোপ করে।

 

এসব নির্দেশনার ছিটেফোঁটাও প্রতিপালিত হতে দেখা যায়নি। নির্দেশনা অমান্য করে সেন্ট মার্টিন থেকে ঠিকই পর্যটক নিয়ে ছুটছে সারি সারি স্পিডবোট।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা না মানায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দ্বীপের রাজকাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, প্রবালসহ অসংখ্য জীববৈচিত্র্য। আবার স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এসটিপি) না থাকায় গণহারে সেন্ট মার্টিনে গড়ে ওঠা ১৩০টি হোটেল, ৪০টি কটেজ আর অর্ধশতাধিক রেস্তোরাঁর ময়লা-আবর্জনায় দূষিত হচ্ছে সমুদ্রের জল।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধি-নিষেধ বিষয়ে সেন্ট মার্টিন প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রকল্পের পরিচালক সোলায়মান হায়দার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হঠাৎ করে কোনো কিছুতেই কঠোর হওয়া যায় না।

 

সেন্ট মার্টিনের অবস্থা সবার জানা। ফলে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আমরা পর্যায়ক্রমে সতর্ক করার চেষ্টা চালাচ্ছি। এর জন্য আমরা গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করেছি। সামনে আরো করা হবে। এ নিয়ে ফল পেতে একটু সময় লাগবে।’

 

তিনি আরো বলেন, ‘শুরুতেই আমরা কেন অ্যাকশনে যাচ্ছি না, এটা অনেকের প্রশ্ন। কিন্তু আমরা প্রথমে চাচ্ছি সবাইকে বিধি-নিষেধের বিষয়গুলো অবগত করতে, যেন অ্যাকশন শুরু করলে কেউ আর বলতে না পারে যে বিষয়টি তিনি জানেন না। বিষয়গুলো নিয়ে উচ্চপর্যায়েও আলোচনা হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমরা চাচ্ছি সেন্ট মার্টিনকে বাঁচাতে। এর জন্য পর্যটক ও স্থানীয় মানুষজনের সহায়তা জরুরি।’

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা না মানার বিষয়ে সেন্ট মার্টিন কোস্ট গার্ডের স্টেশন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার রেদোয়ানুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা মানার জন্য সবাইকে আমরা অনুরোধ করছি।

 

একজন পর্যটক এলে তাঁর সঙ্গে খারাপ আচরণ করা যায় না। আর হুট করে চাইলেই অনেক কিছু করা যায় না। এর জন্য সময় দরকার। ধীরে ধীরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। এখন নির্দেশনা মানতে অনুরোধ করছি, তখন আর হবে না। সৈকতে মোটরসাইকেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; বিচ্ছিন্নভাবে হয়তো কিছু চলছে।

 

ধীরে ধীরে সেগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হবে। আর আমার জানামতে ছেঁড়া দ্বীপে স্পিডবোট যায় না।’ ওই দিন সেন্ট মার্টিনের জেটিতে গিয়ে দেখা গেছে, বিধি-নিষেধ অমান্য করে পর্যটক নিয়ে ছেঁড়া দ্বীপে যাচ্ছে সারি সারি স্পিডবোট। প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে দেখা গেছে, অন্তত ১০টি স্পিডবোট ছেড়ে গেছে ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশে। সঙ্গে ডজনখানেক বড় নৌকায় হাজারখানেক পর্যটক।

 

কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে বেড়াতে যাওয়া পর্যটক সৌরভ হাবীব বলেন, ‘সেন্ট মার্টিন এসে ছেঁড়া দ্বীপে না গেলে হয়! অপূর্ণতা থেকে যায় তো! ছেলে-মেয়েরাও যেতে চাচ্ছে। তবে আমাদের সবার নির্দেশনা মানা উচিত। এর পর থেকে মানব।’

 

সেন্ট মার্টিন থেকে ছেঁড়াদ্বীপে পর্যটক নিয়ে যাওয়া ট্রলারের চালক ইব্রাহীম বলেন, ‘এই দ্বীপে বাঁচার উপায় কী? পর্যটকদের বেড়ানোর ওপরেই আমাদের আয়। ভ্রমণ নিষেধ করলে দ্বীপের হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে যাবে। এদের খাওয়াবে কে? আমরা তো দ্বীপের কোনো ক্ষতি করি না। যখন যে নির্দেশনা দেয়, সেটা মেনে চলি, পর্যটকদেরও মানতে বলি।’

 

স্থানীয় লোকজন বলছে, এত নির্দেশনা মানতে গেলে স্বাভাবিক রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে। বেকার হয়ে পড়বে সেন্ট মার্টিনের সব মানুষ। যেসব বিষয় বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গেই সবার জীবিকার সম্পর্ক।

 

সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের সব নির্দেশনা মানার মতো অবস্থা সেন্ট মার্টিনে নেই। এখানে সবাই দরিদ্র। এসব নির্দেশনার কিছু শর্ত শিথিল করে পর্যটন খাতটা ঠিক রাখতে হবে, তা না হলে এ খাতে যুক্ত তিন হাজার মানুষ বেকার হয়ে যাবে, তাদের পরিবার না খেয়ে মরবে।’

 

তিনি আরো বলেন, ‘দ্বীপের মানুষ অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছে। আমাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাইরের বড় ব্যবসায়ীরা অনুমোদন নিয়ে কোন ফাঁকে দ্বীপে হোটেল-রেস্টুরেন্ট গড়ে তুলছে, আমরা জানতেও পারি না। অথচ স্থানীয় লোকজন নিজের জায়গায় ঘর তুলতে পারে না।’