আজ ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৯শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশে খামার যান্ত্রিকীকরণের বর্তমান অবস্থা

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বিভিন্ন ফসল উৎপাদন ও বিপণনে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবিকার জন্য কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৪.১০ শতাংশ। গত ২০০৩-০৪ অর্থবছরে কৃষিতে শ্রমিকের প্রাপ্যতা ছিল ৫১.৭০ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৪০.২০ শতাংশে এবং তা ক্রমহ্রাসমান। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৩০ সাল নাগাদ তা কমে ৩০ শতাংশ হবে। শিক্ষার হার বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পের বিকাশের কারণে মানুষ আর এখন কৃষি শ্রমিকের মতো কঠোর পরিশ্রমের কাজ করতে চায় না। কৃষিবহির্ভূত অনেক সহজ কাজে কর্মসংস্থান থাকায়; যেমন—শহরে ও গ্রামে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রির কাজ করে কৃষিকাজের চেয়ে বেশি অর্থ উপার্জন করা যায়। এ ছাড়া গ্রামে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। মাছ চাষ, পোল্ট্রি খামার ও ডেইরি ফার্ম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের তরুণরা কৃষি পেশায় কাজ করতে একেবারেই অনাগ্রহী। এসব কারণে কৃষিতে শ্রমিক সংকট বেড়েই চলেছে। কায়িক শ্রমের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন অনেক শ্রম, সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। তাই বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকার কৃষিকে আধুনিকায়ন, যান্ত্রিকীকরণ ও লাভজনক করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কৃষির বর্তমান শ্রমিক সংকট নিরসনের জন্য যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। চাষাবাদের সনাতন পদ্ধতি বদলাতে হবে। কৃষিতে যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে উত্পাদন যেমন বৃদ্ধি পাবে, ফসল সংগ্রহোত্তর অপচয় তেমন কম হবে। এ ছাড়া শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টির মাধ্যমে বিভিন্ন সফলতা পাওয়া যেতে পারে। কায়িক শ্রমের বদলে যন্ত্রের মাধ্যমে কৃষিকাজে তরুণদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানের খোরপোশ কৃষিকে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর ঘটাতে তরুণরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। সাধারণত কৃষিযন্ত্র ব্যবহার হয় জমি চাষে, বীজ বা চারা রোপণে, আগাছা পরিষ্কার, আন্ত পরিচর্যা, সেচ, সার প্রয়োগ, শস্য কর্তন, মাড়াই, ঝাড়াই, শুকানোসহ অন্যান্য কাজে। এই কাজগুলোতে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে ফসলের নিবিড়তা ও উত্পাদন যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি উৎপাদন খরচ কম পড়বে। গত দুই-তিন দশকে বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে কৃষক পর্যায়ে কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), কৃষি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ২০১২-১৯ সাল মেয়াদে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শেষে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্প এলাকায় কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে উত্পাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি উত্পাদন খরচও কমেছে। এ ছাড়া যন্ত্রপাতি ব্যবহারে শস্য সংগ্রহোত্তর অপচয় কমেছে ২০-৯০ শতাংশ, ফসলের নিবিড়তা বেড়েছে ১৯০-২০৪ শতাংশ, প্রকল্প এলাকায় নতুন কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়েছে।  অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্ম পাওয়ার অ্যান্ড মেশিনারি বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কৃষি জমি চাষে ৯০ শতাংশ যন্ত্র ব্যবহূত হলেও শস্য লাগানো ও কর্তনে যন্ত্রপাতির ব্যবহার এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে ধানের চারা রোপণ ও ধান কর্তন বা মাড়াইকাজে যন্ত্রের ব্যবহার না থাকায় কৃষকরা দারুণভাবে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। ধান উত্পাদনের খরচ কমিয়ে লাভজনক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ট্রান্সপ্লান্টার ও হার্ভেস্টার। রবি মৌসুমে বোরো ধান লাগানোর সময় অন্যান্য ফসল আবাদের কারণে কৃষিতে শ্রমিক সংকট দারুণভাবে পরিলক্ষিত হয়। আবার বোরো ধান কাটার সময় শিলাবৃষ্টি, ঝড় ও আগাম বন্যার কারণে এবং স্বল্প সময়ে সারা দেশের ধান কাটার জন্য দারুণভাবে কৃষি শ্রমিকের সংকট দেখা যায়। বছরব্যাপী অন্যান্য ফসল আবাদে শ্রমিক সংকট তেমন পরিলক্ষিত না হলেও বোরো ধান লাগানো ও কাটার সময় শ্রমিক সংকটের অভাব পূরণে সরকার খুবই সচেতন। তাই ধান চাষকে যান্ত্রিকীকরণে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে অন্যান্য ফসল চাষ যান্ত্রিকীকরণের জন্য বর্তমান সরকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে তিন হাজার ২০০ কোটি টাকার ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। প্রকল্পটি ২০২০-২৫ সাল মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। কৃষিকে লাভজনক ও বাণিজ্যিকীকরণে সরকার বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। প্রকল্প মেয়াদে আগামী পাঁচ বছরে ৫৭ হাজার কৃষিযন্ত্র কৃষকদের ভর্তুকি মূল্যে দেওয়া হবে। হাওর এলাকায় ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে এবং হাওর ছাড়া অন্যান্য এলাকায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকিতে বিভিন্ন প্রকার কৃষিযন্ত্র ক্রয় করতে পারবে কৃষক ভাইয়েরা। প্রকল্পের আওতায় ধান ও গমের জন্য ১৫ হাজার ও ভুট্টার জন্য ৫০০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার দেওয়া হবে। এ ছাড়া রিপার ছয় হাজার, রিপার বাইন্ডার তিন হাজার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার পাঁচ হাজার, সিডার বা বেড প্লান্টার পাঁচ হাজার, পাওয়ার থ্রেসার পাঁচ হাজার, ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র পাঁচ হাজার, শস্য শুকানো যন্ত্র পাঁচ হাজার, পাওয়ার স্প্রেয়ার দেড় হাজার, আলু উত্তোলন যন্ত্র তিন হাজার, গাজর ও অন্যান্য সবজি ধোয়া মেশিন ৫০০টি, আলুর চিপস তৈরি যন্ত্র দুই হাজার। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে এটি এযাবত্কালের সর্ববৃহত্ প্রকল্প। এর আগে ‘খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উত্পাদন বৃদ্ধি প্রথম পর্যায়’ প্রকল্পে ৩৮ হাজার এবং ওই একই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৫ হাজার বিভিন্ন প্রকার কৃষিযন্ত্র ভর্তুকি মূল্যে দেওয়া হয়েছে। আগের প্রল্পের ধারাবাহিকতায় এবং দেশে বর্তমানে কৃষি শ্রমিকের অভাব পূরণে এই নতুন প্রকল্পটি সরকার হাতে নিয়েছে। নতুন প্রকল্পটি দেশের প্রায় সব জেলা ও উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হবে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষির আধুনিকায়ন আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। এ বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে হাওর এলাকায় ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে কম্বাইন্ড হারভেস্টার এক হাজার ২৪০টি, রিপার ৪৯৯টি, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ১৩টি কৃষকের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। হাওর ছাড়াও অন্যান্য এলাকায় ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে কম্বাইন্ড হারভেস্টার ২১৭টি, রিপার ৯০টি বিক্রি করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনায় শ্রমিক সংকটকালে বর্তমান সরকার, বিশেষ করে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, এমপি মহোদয়ের সাহসী পদক্ষেপের কারণে হাওর অঞ্চলে অন্য এলাকার শ্রমিক এনে ও কম্বাইন্ড হারভেস্টার ব্যবহারের মাধ্যমে সুন্দরভাবে সমস্ত ধান কেটে মাড়াই করে কৃষকের ঘরে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। যেসব তরুণ উদ্যোক্তা যন্ত্র ক্রয় করে সফল ও লাভবান হয়েছেন, তাঁদের কথা আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন মিডিয়ায় দেখেছি। কৃষিমন্ত্রী বিভিন্ন সময় বলেছেন, কৃষি শ্রমিকের একটি বড় অংশ বিভিন্ন পেশায় স্থানান্তরিত হয়েছে। শ্রমিক সংকট মোকাবেলা করে কৃষির উত্পাদনশীলতা ধরে রাখতে হলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। কৃষিমন্ত্রী আরো বলেছেন, উদ্ভাবন বা আবিষ্কার এমন হতে হবে, যেন তা ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক সহজে ব্যবহার করতে পারে। বিদেশ থেকে আনা যন্ত্রের বিক্রয়োত্তর সেবা ও খুচরা যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতার দিকে নজর দিতে হবে। গবেষণার এক হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০ লাখ ৫৬ হাজার বিভিন্ন প্রকার কৃষিযন্ত্র ব্যবহূত হচ্ছে। এর মধ্যে ইঞ্জিন, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, সেচ পাম্প, নিড়ানি যন্ত্র, মাড়াই যন্ত্র, ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, আখ মাড়াই যন্ত্র, স্প্রেয়ার, উইনার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে দেশে আরো বিদেশ থেকে আমদানীকৃত উন্নতমানের কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রিপার, রাইচ ট্রান্সপ্লান্টার কৃষকের মধ্যে বিক্রি করা হচ্ছে। বিদেশ থেকে আমদানীকৃত যন্ত্র বেশ দামি ও জটিল। যেমন—কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রাইচ ট্রান্সপ্লান্টার, রিপার, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ইত্যাদি। এসব যন্ত্র পরিচালনা ও মেরামতের জন্য দক্ষ চালক, মেকানিক ও মেরামত কারখানা প্রয়োজন। সরকারকে প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশ থেকে যন্ত্র আমাদানির পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণ যন্ত্র পরিচালনা, মেরামত ও সংরক্ষণ বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণত সরকারিভাবে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ধরা থাকে। তেমনিভাবে বর্তমানে প্রস্তাবিত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে ২৮ দিনব্যাপী ৯ হাজার গ্রামীণ মেকানিক প্রশিক্ষণ, পাঁচ দিনব্যাপী ১৫ হাজার উপসহাকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ, এক হাজার কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ, ৩০ হাজার কৃষক বা উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, এক হাজার ৪৪০ জনকে যন্ত্রে ব্যবহার উপযোগী ধানের চারা উত্পাদন প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া উদ্বুদ্ধকরণ সফর ২০০টি, কৃষি মেলা ১৯৭টি, কর্মশালা ৪৩টি বাস্তবায়নের সংস্থান আছে।  বর্তমানে দেশে অনেকগুলো কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প চালু আছে। USAID-এর অর্থায়নে দেশে দুটি প্রকল্প চলমান আছে। একটি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্ম পাওয়ার অ্যান্ড মেশিনারিজ বিভাগের মাধ্যমে ‘Appropriate Scale Mechanization Innovation Hub-Bangladesh’ শীর্ষক প্রকল্প ২০১৭-২০২০ সাল মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে। অন্যটি International Wheat and Maize Improvement Center (CIMMYT), বাংলাদেশ এর মাধ্যমে ‘Mechanization Extension Activities’ শীর্ষক শিরোনামে ২০২০-২০২৫ সাল মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটির অর্থায়ন প্রায় ১৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মাধ্যমে ‘যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান চাষাবাদের লক্ষ্যে খামার যন্ত্রপাতি গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে। প্রকল্পটি ‘ব্রি’ উদ্ভাবিত বিভিন্ন টেকসই যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। প্রকল্পটিতে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ ৪৪ কোটি টাকা, যা ২০১৯-২০২৪ সাল মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মাধ্যমে ‘কৃষি যন্ত্রপাতি ও লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে ফসল উত্পাদনব্যবস্থাকে লাভজনক করা’ শীর্ষক প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটিতে অর্থ বরাদ্দ ৫৬ কোটি টাকা, যা ২০২০-২০২৫ সাল মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পটি বারি উদ্ভাবিত বিভিন্ন টেকসই যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করবে। এসব কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবিত টেকসই কৃষি যন্ত্র ও বিদেশ থেকে আমদানীকৃত নতুন নতুন যন্ত্র ব্যবহার, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমেই কৃষি যান্ত্রিকীকরণের উত্তরণ ঘটাতে হবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বিএইউ) অন্যান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কৃষকের ব্যবহার উপযোগী বেশ কিছু টেকসই কৃষি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই গবেষণাকাজ চলমান আছে। উদ্ভাবিত এসব যন্ত্র দেশি-বিদেশি প্রকল্পের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে কৃষকের জমিতে ফসল উত্পাদনে প্রদর্শিত হয়েছে এবং কৃষক ব্যবহার করছে। ফলে দেশে উদ্ভাবিত কৃষিযন্ত্রের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব যন্ত্রপাতির চাহিদা বৃদ্ধির ফলে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় কৃষি যন্ত্র তৈরির কারখানা। দেশে ব্যবহূত বিপুলসংখ্যক কৃষি যন্ত্রপাতি মেরামতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের বেশির ভাগই দেশীয় ছোট-বড় কারখানাগুলোতে তৈরি হচ্ছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে, কারখানার বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় সরকারি উদ্যোগ ও অবকাঠামো না থাকায় এই শিল্প খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন এর ব্যবসায়ীরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বাজারে প্রতি বছর ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদা রয়েছে। কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি ও রপ্তানির প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও সরকারি সহায়তা অপ্রতুল। তার পরও দেশে প্রয়োজনীয় কৃষি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ তৈরি করে কৃষকের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকারের সময়োপযোগী উদ্যোগ ও ঐকান্তিক চেষ্টায় দেশের কৃষি উৎপাদন অনেক গুণ বেড়েছে। আর এই কৃষি উৎপাদন বাড়ার পেছনে উন্নত জাত ও প্রযুক্তির পাশাপাশি কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার অনস্বীকার্য। ফসল উৎপাদনের এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে টেকসই যান্ত্রিকীকরণের পাশাপাশি কৃষি প্রকৌশল পেশায় জনবল বৃদ্ধি, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি, উন্নত ও গুণগতমানের কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকির ব্যবস্থা, কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ উত্পাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃষক দল সংগঠিত করা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তির উন্নয়ন, যন্ত্রের বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত করতে হবে। বর্ণিত ব্যবস্থাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কৃষিতে আধুনিকায়ন ও টেকসই যান্ত্রিকীকরণ সম্ভব।লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর