আজ ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

চাই আমার আশঙ্কাটা ভুল প্রমাণিত হোক

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ এমন জীবন কখনো আসতে পারে কল্পনাও করেননি রামেন্দু মজুমদার। বললেন, চার মাস থেকে ঘরবন্দি। এটা তো জীবনের একটা নতুন অভিজ্ঞতা। তবে আস্তে আস্তে কিন্তু সবই মানুষের সহ্য হয়ে যায়। এমন জীবন কখনো আমি কল্পনাও করিনি—ঘর থেকে বের হব না চার মাস; কিন্তু তা তো হচ্ছে। আমি তো অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সুতরাং সব কিছুই মানুষের আয়ত্তের মধ্যে আছে।

রামেন্দু মজুমদার এ দেশের গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ সময় ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সভাপতির দায়িত্ব পালন শেষে এখন তাঁকে প্রতিষ্ঠানটির সম্মানিত সভাপতি হিসেবে রাখা হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার কর্ণধার রামেন্দু মজুমদার এখন বই পড়ে, গান শুনে, টেলিভিশন দেখেই বেশির ভাগ সময় পার করছেন।

করোনা পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে বলে তাঁর ধারণা। তাঁর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডেও সে প্রমাণ পাওয়া গেল।

এখন তাঁর প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডের অন্যতম হচ্ছে অফিস সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সকাল ১০টায় অনলাইন প্রযুক্তি জুমের মাধ্যমে মিটিং ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া। আরেকটি কাজও ইদানীং নিয়মিতই করতে হচ্ছে তাঁকে। তা হচ্ছে—তাঁর স্ত্রী দেশবরেণ্য অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারকে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান। ফেরদৌসী মজুমদার রাজধানীর একটি স্কুলে পড়ান। এখন অনলাইনেই ক্লাস করাতে হয়। কিন্তু তিনি কম্পিউটারে অভ্যস্ত না। তাই তাঁকেও টেকনিক্যাল সহায়তা দিতে হচ্ছে রামেন্দু মজুমদারকে। এ ছাড়াও দৈনন্দিন কাজের মধ্যে আরেকটি কাজ হচ্ছে—লোকজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলা। কথা বললেও অনেকটা প্রশান্তি পাওয়া যায় বলে জানান গুণী এই নাট্যজন।

করোনাকালে আরো একটি বড় কাজ করছেন তিনি। লিখছেন আইটিআইয়ের ইতিহাস। আইটিআইয়ের সামগ্রিক ইতিহাস এখনো লিখিত হয়নি। ’৮১ সাল থেকে সম্পৃক্ত থেকে নিজের দেখা, অভিজ্ঞতা এবং তারও আগের ইতিহাস অনুসন্ধান করে ইংরেজিতেই লিখছেন বইটি।

সংকটকালে মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন নানাভাবে। ব্যক্তিগতভাবে, দলগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন বিপন্ন মানুষের পাশে। তাঁর মতে, ‘কেবল রাষ্ট্রের ওপর ভরসা করলে হবে না। সমাজের শক্তিটাও চাই। আশপাশের মানুষকে সবাই মিলে যদি একটু সহায়তা করি তাহলেই এই বিপদ থেকে আমরা উদ্ধার পেতে পারব।’

এই সময় নিজের চাওয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, ‘প্রার্থনা করি পৃথিবীটা যেন দ্রুত রোগমুক্ত হয়। যাতে একটা নতুন মানবিক পৃথিবী আমরা পাই। এটাই কাম্য। কিন্তু কিছু মানুষ মহামারিকে যেভাবে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে আমরা কিছুই শিখিনি। কিছুই শিখি না।’ বলতে বলতে কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তিনি। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেন রিজেন্ট হাসপাতালের সাহেদের কেলেঙ্কারির কথা। বলেন, ‘এই যে সাহেদের মতো মানুষদের শায়েস্তা করা দরকার। সৌদি আরবের মতো আইন থাকলে এদের প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হতো। ওরা যে অন্যায় করেছে তাতেই আমাদের জ্বালাটা কিছুটা কমত। এ ক্ষেত্রে আমার মনে হয় সৌদি আরব একদম ঠিক কাজটিই করে। এ ক্ষেত্রে আমি মানবাধিকার নিয়ে একদম কুণ্ঠিত নই। এদের পাপ এতটা যে এরা কোনো দিনই শুধরাবে না। যখনই সুযোগ পাবে এরা আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে।’

৭৯ বছর বয়স্ক রামেন্দু মজুমদারের জীবনে এ রকম সময় আর কখনো আসেনি। তাঁর ভাষায়, ‘একাত্তর সালেও এতটা হয়নি। একাত্তরে একটা লক্ষ ছিল—আমরা একদিন মুক্ত হব, স্বাধীন হব। এখন তো কোনো লক্ষ নেই। কবে মুক্ত হব আমরা কিছুই জানি না। আদৌ পৃথিবীটা আবার স্বাভাবিক হবে কি না সেটাও তো বুঝতে পারছি না।’

করোনাকাল শেষ হলে কী করতে চাইবেন, জানতে চাইলে বলেন, ‘করোনাকালের শিক্ষা—এক নম্বর কথা হচ্ছে মানবিক হওয়া। দ্বিতীয়ত—প্রতিটি মানুষের প্রতি এবং প্রকৃতির প্রতি সহনশীল হওয়া। প্রকৃতির ওপর আমরা যে অত্যাচার করেছি, সেই অত্যাচারটা যেন আর কেউ না করতে পারে সেটার চেষ্টা করতে হবে। মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করব প্রকৃতি যে প্রতিশোধটা নিল, তার মাধ্যমে বোঝা গেল আমরা প্রকৃতির কাছে কতটা অসহায়। এই শিক্ষাটা যেন আমরা মনে রাখি। এটাই শিল্পী হিসেবে আমার দায়িত্ব হবে, আমার শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে এই কথাগুলো তুলে ধরা।’

করোনা-উত্তর পৃথিবীটা কেমন হতে পারে জানতে চাইলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন তিনি। হাসতে হাসতে বলেন, ‘আমার আশঙ্কা করোনা থেকে আমরা কিছুই হয়তো শিখব না। আবার আমরা আগের মতো চলা শুরু করব।’ এটুকু বলেই আবার ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে বললেন, ‘এটা আমার আশঙ্কা। কিন্তু আমি চাই আমার আশঙ্কাটা ভুল প্রমাণিত হোক।’