আজ ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

করোনায় নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় সংকটে সিরামিকশিল্প

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: স্যানিটারি সামগ্রী ও টাইলস-মার্বেলের অন্যতম মার্কেট রাজধানীর বাংলামোটর। সেখানে ‘সিফাত মার্বেল অ্যান্ড স্যানিটারি’ দোকানে গিয়ে দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের সিরামিক পণ্যে ভরপুর। ক্রেতা না থাকায় কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন। এ দোকানের সামনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো ক্রেতার দেখা পাননি এ প্রতিবেদক।

দোকান মালিক বলেন, ‘করোনার কারণে বিভিন্ন নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সিরামিক পণ্য বিক্রি কমে গেছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।’ ‘সিফাত মার্বেল অ্যান্ড স্যানিটারি’ দোকানের মতো বাংলামোটর এলাকায় ৫০০ থেকে ৬০০ স্যানিটারি সামগ্রী ও টাইলস-মার্বেলের দোকান রয়েছে। এসব দোকানে খুচরা ও পাইকারি দু্ভাবেই বেচাকেনা হয়ে থাকে। প্রায় প্রতিটি দোকান খোলা রয়েছে, দোকানের ভেতরে মালামালে ভরপুর কিন্তু ক্রেতা নেই। অনেকে সারা দিন দোকান খুলে বসে থাকেন একজন ক্রেতাও পান না। একই অবস্থা রাজধানীর কুড়িল চৌরাস্তা রোডের দুই পাশে গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক টাইলস-স্যানিটারির দোকানে। বেশির ভাগ দোকানেই ক্রেতার দেখা মিলছে না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সিরামিক পণ্যের দোকানে সরেজমিনে গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘করোনার মধ্যে খুব বেশি ক্রেতা পাব না, তা তাঁরা ধরেই নিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরও যে আশা করেছিলেন, তার অর্ধেকও ক্রেতা পাচ্ছেন না তাঁরা। দীর্ঘদিন দোকান বন্ধের পর ১ জুন থেকে দোকান খোলা হলেও পণ্য বিক্রি না হওয়ায় কর্মচারীদের বেতন, দোকান ভাড়া দিতে পারছেন না। আবার বিভিন্ন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে অনেক টাকা বকেয়া আছে। একদিকে বেচাকেনা না হওয়ায় কোনো আয় নেই। অন্যদিকে ব্যাংকের কিস্তি, দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন এসব নিয়ে দিন যাচ্ছে। আর বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।’

জানা যায়, ‘রাজধানীতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোই তাদের প্রধান ক্রেতা। করোনার কারণে অধিকাংশ নির্মাতার নির্মাণাধীন ভবনগুলোর কাজ বন্ধ। সরকারি-বেসরকারি স্থাপনার নির্মাণকাজও থেমে আছে। ব্যক্তি পর্যায়ের ছোটখাটো যে নির্মাণ চলছে, তারাই অল্প পরিসরে কেনাকাটা করছে। এ বিক্রি দিয়ে দোকান খরচ চালানোই কঠিন। এ ছাড়া এই ব্যবসায় বড় পার্টিগুলোর কাছে নিয়মিত একটা বড় অঙ্কের বকেয়া থাকে। নতুন চাহিদা আসে, মাল যায়, আগের দফায় পাঠানো মালের টাকা আসে এভাবেই এ ব্যবসা চলে।’

‘সিফাত মার্বেল অ্যান্ড স্যানিটারি’ দোকানের মালিক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমার দোকানে পর্যাপ্ত মাল আছে কিন্তু ক্রেতা পাচ্ছি না। দোকান খুলে সব সময় বসে থাকি, দোকানে মাল নিতে ক্রেতারা আসছে না। আমরা যারা এ ব্যবসায় জড়িত রয়েছি আর কিছুদিন এভাবে চললে ব্যবসা ছেড়ে চলে যেতে হবে। করোনার কারণে দেশের নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠান ও বড় বড় কম্পানির কাজ বন্ধ থাকায় মালপত্র বিক্রি হচ্ছে না। বর্তমানে আমাদের এ ব্যবসাটা সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থায় আছে। এখন সরকার যদি এ ব্যবসায়ীদের বিনা সুদে লোনের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে আমরা ব্যবসাটা চালিয়ে যেতে পারব।’

বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকরাচার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ‘এ মহামারির কারণে অনেক চলমান নির্মাণাধীন কাজগুলো বন্ধ রয়েছে। আমাদের পণ্য (সিরামিক ও টাইলস) তো ভবন নির্মাণের সব শেষে প্রয়োজন হয়। এখন কাজই যদি শুরু না করে তাহলে মানুষ মালপত্র কিনে কী করবে। স্যানিটারি ও টাইলস-মার্বেলের বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দোকানে বিক্রি না হওয়ায় কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল দিতে না পেরে অনেক ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ রাখছেন। সব কিছু মিলিয়ে আমরা একটা দুরবস্থার মধ্যে আছি।’

বিসিএমইএ-এর তথ্য মতে, ‘মহামারি করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর আগে বাংলাদেশে উৎপাদিত সিরামিক পণ্য দেশের বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হতো। দেশে ৫১টি প্রতিষ্ঠান সিরামিক পণ্য বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে। তার মধ্যে ২৫টি প্রতিষ্ঠান টাইলস উৎপাদন করে ও ১৩টি প্রতিষ্ঠান টেবিলওয়্যার উৎপাদন করে। ১৩টি প্রতিষ্ঠান স্যানিটারি ওয়্যার উৎপাদন করে। স্থানীয় বাজারে গত বছর প্রায় পাঁচ হাজার ২১৩ কোটি টাকার সিরামিক পণ্য বিক্রি হয়। গত বছর রপ্তানিও হয়েছে ৩৬১ কোটি টাকা। দেশের সিরামিক প্রডাক্টের গুণগত মান ভালো হওয়ায় বাইরের দেশগুলোতে যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। গত ১০ বছরে এ পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২০০ শতাংশ। সরাসরি নিয়োজিত কর্মীর পাশাপাশি সংযুক্ত শিল্প মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লাখের উপরে মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এ খাতে।’