আজ ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সেরে উঠেও আবারও অসুস্থ

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: ঢাকার মীরবাগের ৬৫ বছর বয়সী ব্যবসায়ী আজহারুল হক করোনায় আক্রান্ত হন জুনের শুরুতে। প্রথমে জ্বর, কাশি ও মুখে রুচি না থাকার উপসর্গ থাকলেও একপর্যায়ে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। তাঁকে দ্রুত ভর্তি করা হয় করোনা ডেডিকেটেড এক সরকারি হাসপাতালে। সেখানে একটানা ১৫ দিন থাকার পর ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই দফায় নেগেটিভ রিপোর্ট পেয়ে বাসায় ফেরেন তিনি; পরিবারের লোকজন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। নিজেকে করোনামুক্ত মনে হলেও সপ্তাহখানেক পরই দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট, কাশি, শারীরিক দুর্বলতা, পাতলা পায়খানাসহ নানা উপসর্গ। একপর্যায়ে অবস্থা গুরুতর হলে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান আজহারুল।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বা হোম আইসোলেশনে থাকার পর করোনাভাইরাস থেকে সেরে উঠেছে মোট আক্রান্তের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) মতে, কভিড থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে তিন থেকে ছয় সপ্তাহ লাগতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ব্যতিক্রমও ঘটছে। আক্রান্তদের যারা সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে গেছে বা করোনামুক্ত হয়েছে বলে মনে করছে, অল্প কিছুদিন পর তাদের অনেকেরই দেখা দিচ্ছে নানা রকম শারীরিক ও মানসিক জটিলতা।

পরিসংখ্যান কী বলে : চীনের উহানের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের নিয়ে করা সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কভিড থেকে ঘরে ফেরা লোকদের ৪২ শতাংশের জীবাণু দ্বারা রক্তের কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়া (সেপসিস), ৩ শতাংশের শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা, ১২ শতাংশের হার্টের নানা সমস্যা এবং ৯ শতাংশের রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা ছিল। শারীরিক দুর্বলতাসহ অন্যান্য জটিলতাও ছিল বেশির ভাগ রোগীর।

পুনরায় কভিডে আক্রান্ত? : ডাব্লিউএইচও জানিয়েছে, করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পর দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হলেও দ্বিতীয়বার সংক্রমণ হবে না—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আবার একবার সংক্রমিত হলে মানুষের দেহে ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হয় বটে, তবে কিছু লোকের ক্ষেত্রে তা ঘটে না।

বিবিসি বলছে, সুস্থ হতে কত সময় লাগবে, তা নির্ভর করছে আপনি কতখানি অসুস্থ হয়েছিলেন তার ওপর। কিছু রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে, অনেকে আবার দীর্ঘ সময় ধরে স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগতে পারে। মূলত বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক গঠন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যের জন্য কভিড-১৯ আক্রান্তদের মধ্যে অসুস্থতার ধরন আলাদা হয়ে থাকে।

স্পেনের ন্যাশনাল বায়োটেকনোলজি সেন্টারের তথ্য মতে, একবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এমন লোকদের ১৪ শতাংশের ক্ষেত্রে পুনরায় সংক্রমিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে; যদিও তারা এটিকে দ্বিতীয়বার সংক্রমণ বলছে না। তাদের মতে, ভাইরাসটি হয়তো দেহের কোথাও লুকিয়ে ছিল এবং তা হয়তো আবার ফিরে এসেছে। তবে করোনাভাইরাস যে এত তাড়াতাড়ি তার লুকানো অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে আবার আঘাত হানতে পারে—এটিই বিস্মিত করছে বিজ্ঞানীদের।

জটিলতা ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ : চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, কভিড-পরবর্তী শারীরিক জটিলতা হয় সাধারণত তিন ধরনের। একটি অর্গানিক বা অঙ্গের সমস্যা, একটি সাধারণ উপসর্গ, অন্যটি মানসিক। অর্গানিক সমস্যাগুলোর মধ্যে ফুসফুস, কিডনি, যকৃৎ, হার্ট, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুুতন্ত্র, ত্বক, ডাইজেস্টিভ সিস্টেমে সমস্যা, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়া জ?টিল রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল? থাকায় স্ট্রোক এবং রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা হতে পারে। কারো কিডনি, লিভার, হার্টের সমস্যা হতে পারে।

সাধারণ উপসর্গগুলো হলো—অবসাদ বা ক্লান্তি, শরীর ঘেমে যাওয়া, রুচিহীনতা বা স্বাদ না লাগা, বুক ধড়ফড় করা, ঘুমের ধরন পাল্টে যাওয়া, মনোযোগে ঘাটতি হওয়া বা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়া পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডার (পিটিএসডি) বা রোগ-পরবর্তী মানসিক চাপও তৈরি হয়। স্মৃতিতে থেকে যাওয়া সংকটের সময়গুলো হ্যালুসিনেশন তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে প্রায় ৪.৪ শতাংশ মানুষ পিটিএসডিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ইউজিসির অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে কভিডে আক্রান্ত গুরুতর রোগীরাই শুধু নয়, মাঝারি এবং মৃদু পর্যায়ের করোনা রোগীদের দেহও বেশ দুর্বল এবং ক্লান্ত্ত থাকতে পারে কিছুদিন। তবে আগে থেকে যারা অন্যান্য রোগে, যেমন—স্ট্রোক, হৃদেরাগ, কিডনি রোগ, লিভার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছিলেন, করোনার অব্যবহিত পরে তাদের ঝুঁকি একটু বেশি থাকে। বিশেষ করে বয়স্কদের সমস্যা বাড়তে পারে। তিনি বলেন, এসব নিয়ে চিন্তার তেমন কারণ নেই। এ সময় দেহের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই মূল ভরসা। এটি বজায় রাখতে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের পাশাপাশি হালকা শারীরিক ব্যায়াম করা দরকার। এর পরও জটিলতা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শে কিছু ওষুধ সেবন করা দরকার।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, পোস্ট ভাইরাল সিনড্রোম কারো কারো ক্ষেত্রে তিন থেকে ছয় মাস থাকতে পারে। এ সময় টেনশনে না থেকে সুষম খাদ্য খাওয়া, ঘুম ও বিশ্রামের পাশাপাশি হালকা হাঁটাচলা বা ব্যায়াম করা উচিত। সংক্রমণ কমে গেলেও দেহে প্রদাহের জের কিন্তু থেকেই যায়। তাই খুব ধীরে ধীরে ব্যায়াম করে দেহকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্ষব্যাধি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, কভিড-পরবর্তী সময়ে ফুসফুস আগের চেয়ে অনেকটা দুর্বল থাকতে পারে। এতে ধীরে ধীরে শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। যারা হাই-ফ্লো অক্সিজেন গ্রহণ করেছে তাদের ফুসফুসে সমস্যা থাকার আশঙ্কা বেশি। কভিড থেকে সেরে যাওয়ার পরও কারো ফুসফুসে সমস্যা রয়েছে কি না, তা নির্ণয় করতে বুকের এক্স-রে, কম্পিউটারাইজড সিটিস্ক্যান (এইচআরসিটি), ইকোকার্ডিওগ্রাম, পালমোনারি ফাংশন টেস্ট, সিক্স মিনিট ওয়ার্ক টেস্ট, পালস অক্সিমেট্রি ইত্যাদি পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে আতিকুর রহমান বলেন, পুরোপুরি ধূমপান বর্জন করা, ফুসফুসের ফিটনেস বাড়াতে ধীরে ধীরে ও নিয়মিতভাবে ব্রিদিং এক্সারসাইজ করা, ফুসফুসবান্ধব সুষম খাবারের প্রতি জোর দেওয়া উচিত।

জাতীয় হৃদেরাগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান বলেন, কভিড-পরবর্তী কিছু মানুষ পড়তে পারে হৃদেরাগসংক্রান্ত জটিলতায়। করোনায় রোগীদের হার্ট রেট ৬০-এর নিচে নেমে গেলে পরবর্তী সময়ে তাদের হৃেপশিতে প্রদাহ বা মায়োকার্ডাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এতে হার্টের সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা বেশ কমে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, যেকোনো বড় দুর্ঘটনার পরই কিছু মানুষ মানসিক চাপে ভুগতে শুরু করে। তখন আতঙ্কের স্মৃতি বারবার ফিরে আসে তাদের মনে। রাতের পর রাত হয়তো তারা ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। এটি রোগী ছাড়াও সংশ্লিষ্ট লোকজনেরও হতে পারে। এই ট্রমার সময় কাউন্সেলিং বা চিকিৎসা না নিলে সমস্যা দীর্ঘায়ু হতে পারে। আজকাল ইউটিউবেও মেডিটেশন, ব্রিদিং এক্সারসাইজ, ইয়োগাসহ নানা ভিডিও পাওয়া যায়। এগুলো দেখে দেখেও কেউ উপকৃত হতে পারে।

ছড়াচ্ছে নতুন স্ট্রেইন : কিছুদিন আগে চীনের উহানসহ কয়েকটি প্রদেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে জরিপ শে?ষে ডাব্লিউএইচও ও চীনের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়, হালকা রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পুনরুদ্ধারের সময় প্রায় দুই সপ্তাহ। কিন্তু গুরুতর রোগে আক্রান্ত লোকদের তিন থেকে ছয় সপ্তাহ লাগতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, একবার সেড়ে ওঠার পর সাধারণত ১৫ দিন থেকে তিন মাস পর্যন্ত পুনরায় কভিড হওয়ার আশঙ্কা নেই। এর পরও যদি সঠিক পরীক্ষায় ফলাফল পজিটিভ আসে, তাহলে বুঝতে হবে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের কোনো নতুন ধরন ছড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ বিসিএসআইআরের জেনোমিক রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ ল্যাবের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সেলিম খান বলেন, ‘সেকেন্ডারি বা দ্বিতীয় পর্যায়ের কভিড সংক্রমণ নিয়ে আমরা ইতিমধ্যে গবেষণা করেছি আবারও করব।’