আজ ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

আবারও কভিড সেবায় বিশৃঙ্খলা

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: আবাসন জটিলতার মুখে কভিড রোগীদের সেবায় ফের পিঠটান দিতে শুরু করেছেন চিকিৎসকরা। বেশির ভাগ চিকিৎসকই এরই মধ্যে করোনাভীতি কাটিয়ে উঠেছেন। তবে পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষায় ছাড় দিতে তাঁরা নারাজ। এরই মধ্যে কয়েকটি হাসপাতালে ডিউটিরত চিকিৎসকদের পরিবারের কয়েকজন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে হাসপাতালে সহকর্মীদের মধ্যেও। কোনো কোনো হাসপাতালও হাঁটছে একই পথে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হোটেলে থাকার সুবিধা বাতিল করার পর কভিড রোগীদের সেবাদাতা চিকিৎসকদের থাকা নিয়ে দেখা দিয়েছে এমন জটিলতা।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের সাময়িক আবাসনের জন্য হোটেলের পরিবর্তে ডরমিটরির ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সরকারি ছয়টি ডরমিটরিতে বেশির ভাগ চিকিৎসকেরই জায়গা হয়নি। ফলে কেউ কেউ ডিউটি পালন করতে অনীহা জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ হাসপাতালে আসাই বন্ধ করে দিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে কোনো কোনো হাসপাতাল মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে এখনো চিকিৎসকদের হোটেলে রাখছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের ৭৭ জন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মোট আড়াই হাজারের বেশি চিকিৎসক, প্রায় দুই হাজার নার্স ও তিন হাজারের বেশি অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই সুস্থ হয়ে রোগীদের সেবায় ফিরেছেন। তবে তাঁরা এখন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা এদিকে নজর রেখেই মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু এখনো সে ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া নেই। ফলে চিকিৎসকরা অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ছে হাসপাতাল ও রোগীদের ওপর।’

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহম্মেদ বলেন, ‘শুরুর দিকে চিকিৎসকদের মধ্যে আতঙ্কের কারণে এক ধরনের সমস্যা ছিল। চিকিৎসকদের হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়। এখন আবার হোটেল ছাড়ার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ বেড়েছে। আমাদের জন্য যে ডরমিটরি নির্ধারণ করা হয়েছে তা কোয়ারেন্টিনের উপযুক্ত নয়; যদিও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত আমরা হোটেল ছাড়িনি। সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছি।’

কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ কে এম সারোয়ার উল আলম বলেন, ‘নির্বিঘ্ন সেবার স্বার্থে আমরা চিকিৎসকদের জন্য বরাদ্দকৃত হোটেলগুলো রেখে দিয়েছি। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন না এলে চিকিৎসকদের ধরে রাখা যাবে না। এর মধ্যেই এখানকার একজন চিকিৎসকের বাবার মৃত্যু হয়েছে। সব চিকিৎসকই এখন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উদ্বিগ্ন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, ‘সরকার আমাদের থাকার নিরাপদ কোনো ব্যবস্থা না নিলে প্রয়োজনে চাকরি ছেড়ে দেব। কারণ আমি হাসপাতালের করোনা রোগীদের সেবা দিয়ে বাসায় গেলে পরিবারের সদস্যরাও আক্রান্ত হতে পারে। বাসায় আমার বৃদ্ধ মা আছেন। তাঁকে তো ঝুঁকিতে ফেলতে পারি না।’

অন্যদিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল গত শনিবার থেকে কভিড রোগী ভর্তি বন্ধ করে দিয়েছে। আগামী শনিবার তারা হোটেল ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু গত ১ জুলাই থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ওই হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্টাফদের তিনটি হোটেলের বিল ও খাওয়া বাবদ প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকার বিল বকেয়া পড়ে আছে। ওই বিল চেয়ে হোটেলগুলো হাসপাতালকে চাপ দিচ্ছে। এসব বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক, হাসপাতাল ডা. ফরিদ উদ্দিন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে যে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে তা বলবৎ রয়েছে। ফলে কোনো হাসপাতাল চিকিৎসক-নার্সদের হোটেলে রাখলে সেটা তাদের ব্যাপার। এ ছাড়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এখন পর্যন্ত কভিড সেবা বলবৎ আছে। প্রসঙ্গত, গত ২৯ জুলাই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আব্দুল মান্নান স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে চিকিৎসকদের হোটেলে থাকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। পরে ৩ আগস্ট এক নির্দেশনায় ঢাকার ছয়টি প্রতিষ্ঠানের ডরমিটরিতে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীর থাকার ব্যবস্থা করতে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে বলা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, ডরমিটরিতে যাঁরা থাকতে পারবেন না, তাঁদের নির্ধারিত হারে ভাতা দেওয়া হবে।