আজ ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

দাস-ব্যবসার দায়ে সুইডেনকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি!

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: দাস ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার দায়ে সুইডিশ রাজপরিবার ও সরকারকে ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি করেছে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ। ‘দাস ব্যবসায় নিয়োজিত থেকে সুইডেন ও সুইডেনের রাজপরিবার এক সময় লাভবান হয়েছিল বলে দাবি করেন ক্যারিবিয়ান সম্মিলিত রাজ্যগুলো নিয়ে গঠিত ‘ক্ষতিপূরণ কমিশনের’ সদস্য ভেরেনা শেফার্ড।

‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের সমর্থকরাও এই দাবিকে সমর্থন জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ক্ষতিপূরণ- বা ক্ষমাপ্রার্থনার ব্যাপারে কোন অফিসিয়াল দাবি সরকারের হাতে আসেনি বলে জানায় সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়। সুইডেনের রাজপরিবারও কোন ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, সুইডেনের রাজা গুস্তভ (তৃতীয়) তাঁর রাজতন্ত্রের অধীনে একটা উপনিবেশ চেয়েছিলেন। ১৭৮৪ সালে তিনি সুইডেনের উপকূল শহর গোথেনবার্গে ফ্রান্সকে অবাধ বানিজ্যের সুবিধার দেয়ার বিনিময়ে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ সেন্ট-বার্থলেমী ফ্রান্সের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। তারপর থেকে দ্বীপটিতে যা আয় হতো তার ২৫% কর হিসেবে সুইডেনের রাজার কোষাগারে জমা হতো।

ক্যারিবীয় অঞ্চলে সুইডেনের সাবেক ও একমাত্র উপনিবেশ ‘সেন্ট বার্থলেমি’ পর্যবেক্ষকদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং ধন-সম্পদের খনি হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। এখানকার রাস্তাগুলোর নাম এখনও সুইডিশ নামকরণে রয়েছে এবং রাজ্যের প্রধান শহরটির নাম সুইডেনের রাজা তৃতীয় গুস্তাভের নামে ‘গুস্তাভিয়া’ নামকরণ করা হয়েছিল যা এখনো বহাল রয়েছে।

দ্বীপটি বর্তমানেও সুইডিশ ঐতিহ্য লালন করে এবং সুইডিশ ব্র্যান্ডের অংশ হিসাবে ক্যারিবীয়দের মধ্যে সবচেয়ে পরিষ্কার এবং শান্তিপূর্ণ স্থান হিসাবে বিশ্বদরবারে নিজেদের উপস্থাপন করে থাকে। সুইডিশ আমলে এই দ্বীপটি ক্যারিবিয়ান দাস-অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল। বৃটিশ, ফরাসী এবং অন্যান্য ক্যারিবিয়ান উপনিবেশগুলোতে লাভজনক বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ব্যবসা মূলত দাস শ্রমের উপর নির্ভরশীল ছিল।

সুইডিশ উপনিবেশ সেন্ট বার্থলেমি সম্মিলিত ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হলেও অনুর্বরতার কারণে এখানে খুব বেশি বৃক্ষরোপন হতো না এবং জমির মালিকও খুব বেশি ছিল না। যার কারণে অন্যান্য দ্বীপের তুলনায় এখানে দাস ছিল খুব কম। ১৮৪৭ সালে সুইডিশ উপনিবেশ ‘সেন্ট বার্থলেমি’ থেকে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছি।

সুইডেন ট্রান্সঅ্যাটল্যান্টিক ক্রীতদাস ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে তেমন কোন প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেনি। তবে সুইডেনের সেন্ট-বার্থলেমি একটি মুক্ত বন্দরের সাথে যুক্ত ছিল, যেখানে তাঁরা আন্তঃ-ক্যারিবিয়ান ক্রীতদাসদের ব্যবসায় দাসত্বপ্রাপ্ত আফ্রিকানদের সাথে ব্যবসা করতো।

এছাড়াও সুইডেন এবং সুইডিশ রাজপরিবার দাস-ব্যবসা থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতো। এসব ঐতিহাসিক কারণে সুইডেন ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের তোপের মুখে পড়েছে। তবে, ক্যারিবীয় সম্প্রদায়ের (ক্যারিকম) ক্ষতিপূরণ কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ভেরেন শেফার্ড বলেছেন, আমরা সুইডিশ সরকার ও তাঁর রাজপরিবারের পক্ষ থেকে ক্যারিবীয়দের কাছে ক্ষমা চেয়েছি।

তিনি আরো বলেন, যে জাতি মানবাধিকার ও সমাধিকার স্থাপনার জন্য সমগ্র বিশ্বের কাছে বিশেষভাবে গর্বিত, সেই জাতি দাস-ব্যবসার ইতিহাসে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারে না।  সুইডেনের ক্ষমা চাওয়া উচিত, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁরা এটি করতে বাধ্য নন, বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ক্যারিবীয় অঞ্চলের মোট ১৫টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত ইউনিয়ন দাসপ্রথার সময়কালে নৃশংসতার ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠন করেছিল।  যে সব দেশ দাস-ব্যবসার সাথে তখন জড়িত ছিল তারমধ্যে ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, স্পেন এবং পর্তুগালের নাম সর্বাগ্রে।  তবে স্ক্যানিডিনেভিয়ার মধ্যে সুইডেন ছাড়াও ডেনমার্কের নামও রয়েছে ‘ক্ষতিপূরণ কমিশনের’ তালিকায়।  সে সময় লোহা-বানিজ্যে সুইডেন প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছিল যা দিয়ে অস্ত্র, সরঞ্জাম, শেকল, অত্যাচারের সরঞ্জাম ছাড়াও বহুবিধ সরঞ্জমাদী প্রস্তুত হতো।