আজ ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

অথচ তিনি তিন-তিনবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন!

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:  কোমর থেকে শরীরের নিচের অংশ অবশ। অন্যের সাহায্য ছাড়া কিছুই করতে পারেন না—না পায়খানা, না গোসল। কয়েকবার আত্মহত্যাও করতে চেয়েছিলেন নিংপ্রুচাই মারমা। কিন্তু খাগড়াছড়ির এই তরুণ এখন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন অন্যদের। পিন্টু রঞ্জন অর্ককে বলেছেন নিজের সংগ্রামমুখর দিনগুলোর কথা।

একটা সময় আমাদেরও ‘গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান’ ছিল। কিন্তু মা জটিল এক রোগে আক্রান্ত হলে তাঁর চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে পথে নামতে হয় আমাদের। অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে দাদাদের দেখেছি দিনমজুরি করতে। আট ভাই-বোনের বড় পরিবার। আমি ষষ্ঠ। মা যখন মারা যান, আমি তখন ক্লাস টুতে পড়ি। আর আমার ছোট বোনটার বয়স তখন মাত্র তিন মাস। বাবা পরে আর বিয়ে করেননি।

মুদি দোকানি

বাবা একটা মুদি দোকান দিয়েছিলেন। বেশির ভাগ সময় সেখানে বসতাম। বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে এনে আমাদের দোকানে বিক্রি করতাম। প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে বাজার। স্কুল শেষ করে বাসায় বই রেখে বাজারে ছুটতে হতো। এসবের মধ্যেও পড়াশোনায় ছেদ পড়েনি। নবম শ্রেণি পর্যন্ত রোল নম্বর এক ছিল আমার।

পুরনো জামাকাপড়

বাড়ি থেকে কলেজ (খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ) ছিল ২৬ কিলোমিটার দূরে। দুই কিলোমিটার দূরের মহালছড়ি বাসস্টেশন পর্যন্ত হেঁটে যেতাম। তারপর বাস কিংবা চান্দের গাড়িতে চড়তাম। কলেজে যাচ্ছি কিন্তু পরার মতো ভালো জামাকাপড় ছিল না। আত্মীয়-স্বজন পুরনো জামাকাপড় যেগুলো দিত, সেগুলো ভালো ফিট হতো না। দড়ি দিয়ে প্যান্ট বেঁধে নিতাম। কোনো কোনো শার্ট তো হাঁটুর নিচ পর্যন্ত চলে যেত। খুব বেশি বন্ধু পাইনি কলেজে।

কলেজে সেকেন্ড হলাম

অন্য সময় বাড়ি থেকে কলেজে যেতে পারলেও বর্ষায় সেটা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। তখন খাগড়াছড়ি শহরে থাকতে চাইলাম। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও লজিং পেলাম না। এর মধ্যেই প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় দ্বিতীয় হলাম। সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি এক দূরসম্পর্কের মামার বাসায় থাকার ব্যবস্থা হলো। প্রথম বর্ষে সেকেন্ড হওয়ার সুবাদে কলেজ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা করে মাসিক বৃত্তি পেতাম। টেস্ট পরীক্ষায়ও সেকেন্ড হলাম। ২০০৪ সালে এইচএসসি পাস করলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

প্রথম পরীক্ষা দিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। নৃবিজ্ঞানে ভর্তির সুযোগ পেলাম। কিছুদিন পর শুনলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও চান্স পেয়েছি। এরই মধ্যে জমি বন্ধক রেখে চবিতে ভর্তি হয়ে গেছি। ফলে বাড়ির কেউই আর চাইছিল না আমি ঢাকায় যাই। শেষমেশ এগিয়ে এলেন বড় বউদি। তাঁর কানের দুল বন্ধক রেখে ঢাকায় এলাম। অর্থনীতিতে ভর্তি হলাম। প্রথম প্রথম মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। প্রত্যন্ত এলাকার ছেলে। ক্যাম্পাস লাইফটা উপভোগ করছিলাম না। সুযোগ পেলেই গ্রামে চলে যেতাম। এলাকার ছেলে-মেয়েদের ফ্রি কোচিং করাতাম।

 

যখন সুস্থ ছিলেন

আলুডালময় জীবন

জগন্নাথ হলের অক্টোবর স্মৃতিভবনে থাকতাম। ঢাকায় এসে বাড়ি থেকে টাকা চাওয়ার সাহস হয়নি। টিউশনি করে চলতাম। এলাকায় আগে যাদের পড়িয়েছি তাদের অভিভাবকরা আমার জন্য চাল, ডাল, শুঁটকি ইত্যাদি পাঠাতেন। নিজে রান্না করতাম। আলু, ডাল ও ডিম—এর বেশি কিছু খাওয়ার সুযোগ ছিল না। আলুভর্তা, আলুভাজি, আলুর দম, ডাল কিংবা ডিম—এভাবেই চলত সকাল-বিকাল। এভাবে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করি। তত দিনে আমি বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি।

সবাই যেন সুখে থাকে

সব সময় মাথায় থাকত—বাড়ির সবাই অভাবের মধ্যে আছে। আমাকে কিছু একটা করতে হবে। বন্ধুবান্ধব তখন সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু বিসিএস একটা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। মাস্টার্সের পর টিউশনিগুলোও হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে গ্রামে চলে আসি। খাগড়াছড়িতে বিয়াম ফাউন্ডেশনের একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল আছে। সেখানে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলাম। ১০ হাজার টাকা বেতন। ছোট বোনকে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে ভর্তি করালাম। বাবাকে আবার দোকান করে দিলাম। পরিবারের অন্যদেরও সাপোর্ট দিতাম। চেয়েছি সবাই যেন সুখে থাকে।

ব্যথায় ঘুমাতে পারতাম না

২০১৭ সাল। আমি তখন রামু ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে। মাঝে আড়াই বছর ছিলাম কক্সবাজারে বিজিবি স্কুলে। এরই মধ্যে শরীরে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে থাকে। কোমর ব্যথায় সারা রাত দুই চোখের পাতা এক করতে পারতাম না। দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকতাম। চট্টগ্রাম শহরে এসে এমআরআই করালাম। স্পাইনাল কর্ডে টিউমার ধরা পড়ল। চিকিৎসকরা বললেন, অপারেশন জরুরি।

ভারতে গেলাম

ভ্যালোরের সিএমপি হাসপাতালের ডাক্তারও বললেন, অপারেশনের কোনো বিকল্প নেই। তবে ইউরিন লাইন সারা জীবনের জন্য নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যেতে পারে। অপারেশন হওয়ার পর জ্ঞান ফিরলে দেখি কোমর থেকে নিচের অংশ সম্পূর্ণ অবশ হয়ে গেছে!

ডাক্তার বললেন, এ ধরনের অপারেশনের পর এমন হতে পারে। আশা করি, সপ্তাহখানেকের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। ওখানে ১০ দিন ছিলাম। কিন্তু কোনো উন্নতি হয়নি। পরে জানলাম, আসলে অপারেশন সফল হয়নি। এরই মধ্যে তারা ক্যান্সার সন্দেহ করে স্যাম্পল পরীক্ষার জন্য চেন্নাই পাঠাল। রিপোর্ট পাওয়ার পর জানাল, ২৮টি কেমো দিতে হবে। ২৫টি দেওয়ার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে আইসিইউতে ভর্তি ছিলাম তিন দিন। জ্ঞান ফেরার পর তারা ক্যান্সারের ওষুধ চালিয়ে যেতে বলল, সঙ্গে ফিজিওথেরাপি। দিনদিন চিকিৎসা খরচ বেড়েই চলছিল। তত দিনে আমি নিঃস্ব। তখন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরা, মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিলসহ অনেকেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল। বাড়ি ফেরার সপ্তাহখানেকের মাথায় আবার মূর্ছা গেলাম। এরপর চট্টগ্রাম মেডিক্যালে ভর্তি ছিলাম প্রায় ১৫ দিন। কোনো মতেই নিজের এই অবস্থা মেনে নিতে পারছিলাম না। দিন-রাত বিছানায় থাকার ফলে এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলাম যে তিন-তিনবার আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছি।

তোমাকে উঠে দাঁড়াতে হবে

আমেরিকা থেকে তখন দেশে এসেছিলেন মং সানু দাদা (মং সানু মারমা, বিজ্ঞানী)। তাঁর সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল। তিনি বাড়ি এসে আমার খোঁজখবর নিলেন। কিছুদিন পর আবার আমেরিকায় ফিরে গেলেন। তখন কিছুটা সাহস পেয়েছিলাম। এরপর আবারও বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করি। একদিন মং সানু দা ফোন করলেন। বললেন, ‘বিছানায় পড়ে থাকা তোমাকে মানায় না। ভেবে দেখো, তোমার চেয়ে আরো অনেক খারাপ অবস্থায় আছে বহু মানুষ। তারা তো ভেঙে পড়েনি। তোমার তো হাত আছে, চোখ আছে, ব্রেন এখনো সচল আছে। তুমি কেন অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে। তোমাকে উঠে দাঁড়াতে হবে। উঠে দাঁড়াও।’

 

স্বপ্নগুলো হাতের মুঠোয়

কলেজে থাকতে স্বপ্ন দেখেছিলাম, একটা লাইব্রেরি করব গ্রামে। আরেকটা স্বপ্ন ছিল, গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য একটা ফান্ড করব। রেম্রাচাই মগ শিক্ষা ফাউন্ডেশন নামে একটা ফাউন্ডেশন গড়েছি। আমি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এখন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া পাঁচজন শিক্ষার্থীর খরচ জোগাই আমরা। সিংগীনালা শিক্ষা তহবিলেরও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আমি। বয়স্কদের জন্য কিছু একটা করারও ইচ্ছা ছিল। কক্সবাজারে যখন চাকরি করতাম তখন এলাকার বয়স্ক ব্যক্তিদের শীতবস্ত্র কিনে দিতাম। হাত খরচার টাকাও দিতাম। কিন্তু লাইব্রেরি করার স্বপ্নটা তখনো অধরা ছিল। শেষে ২০১৯ সালের অক্টোবরে পাঠাগারের যাত্রা শুরু হয়। নাম, স্বপ্নের পাঠশালা। স্লোগান, ‘এসো স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখাই’। অবকাঠামো নির্মাণের জন্য মং সানু দাদা ১৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। শুরুতে ৪০টির মতো বই ছিল। এখন গল্প, কবিতা, উপন্যাসসহ সাত শর বেশি বই আছে। একটা দৈনিক পত্রিকাও রাখি। এখানে শিশুরা ছবি আঁকে। বিতর্ক কর্মশালা হয়। এখন প্রতিদিন সন্ধ্যায় কোচিং করাই। প্রতি শুক্রবার মুভি টাইম। প্রজেক্টরে ছেলে-মেয়েদের দেশি-বিদেশি অনুপ্রেরণামূলক সিনেমাগুলো দেখানো হয়। পাঠশালার জন্য আলাদা একটা ভবন করার স্বপ্ন আছে। ভবিষ্যতে কারো সহযোগিতা পেলে কয়েকটি কম্পিউটার কিনতে চাই। এলাকার ছেলে-মেয়েদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিতে চাই।

 

 

এই তো বেঁচে থাকা

মাঝেমধ্যে ইউরিন ইনফেকশন হয়। কারণ একটা নল তো সব সময় লাগানো থাকে। পায়খানা-প্রস্রাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। সকাল ৯টার দিকে বিছানা ছাড়ি। মানে দুজন ধরে হুইলচেয়ারে বসিয়ে দেয়। নাশতা করার পর পাঠশালায় যাই। ততক্ষণে শিক্ষার্থীরা চলে আসে। তাদের পড়ানো শুরু করি। একাডেমিক পড়ার বাইরেও তাদের সৃজনশীল বই পড়তে দিই। অনেক সময় ইউটিউবে শিক্ষামূলক ভিডিও দেখাই। সাড়ে ১১টার দিকে ওদের ছুটি হয়ে যায়। ১২টার দিকে লাঞ্চ করে এক ঘণ্টা বসে থাকি। তারপর চারটা পর্যন্ত বিছানায়। সাড়ে চারটার দিকে আবার পাঠশালায় যাই। থাকি আটটা পর্যন্ত। তারপর আবার বসে থাকা। বসে থাকতে থাকতে শরীরে ঘা ছড়িয়েছে। ব্যথাও অনেক। জানি সারা জীবন এ নিয়েই বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে!