আজ ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

লোকসানে নিমজ্জিম কোম্পানিগুলোতে হঠাৎ এত মধু!

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ গত এক মাসে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জিল বাংলা সুগার মিলের শেয়ারের দাম বেড়েছে ২৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকা এক মাস বিনিয়োগ করেই মুনাফা পাওয়া গেছে ২৭৩ টাকা। শেয়ারের এমন দাম বাড়লেও লোকসানের ভারে নিমজ্জিম কোম্পানিটি বছরের পর বছর ধরে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয় না।

এমনকি প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের সর্বশেষ কবে লভ্যাংশ দিয়েছে, সে সংক্রান্ত কোনো তথ্যও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে নেই। ডিএসইর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের ব্যবসায় শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪৪ টাকা ৭২ পয়সা।

দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফেরার মধ্যে বড় অঙ্কের লোকসানের ভারে ন্যুব্জ কোম্পানিটির শেয়ারের দাম গত ৯ জুলাই থেকেই বাড়ছে। ৯ জুলাই যেখানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ৩১ টাকা ৬০ পয়সা, সোমবার (১৭ আগস্ট) লেনদেন শেষে তা দাঁড়িয়েছে ১১৭ টাকা ৮০ পয়সায়।

বড় লোকসানে নিমজ্জিত আরও এক কোম্পানির নাম শ্যামপুর সুগার মিল। কোম্পানিটিও সর্বশেষ কবে লভ্যাংশ দিয়েছে তার কোনো তথ্য নেই। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের ব্যবসায় শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৭২ টাকা ৩৮ পয়সা। অথচ সোমবার লেনদেন শেষে প্রতিটি শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ৫৪ টাকা ১০ পয়সায়, যা গত ৯ জুলাই ছিল ২৩ টাকা ৮০ পয়সা। অর্থাৎ কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়েছে ১২৭ শতাংশ।

শেয়ারবাজারের বহুল আলোচিত কোম্পানি অ্যাপোলো ইস্পাত। ২০১৩ সালে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর নিয়মিত লভ্যাংশ হিসাবে বোনাস শেয়ার দেয়া কোম্পানিটি ২০১৮ সালের পর আর কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। ফলে ‘পচা’ বা ‘জেড’ গ্রুপের কোম্পানির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে এটি।

গত ১৯ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ছিল ২ টাকা ৮০ পয়সা, এই দামেও বিনিয়োগকারীরা তা কিনতে চাচ্ছিলেন না। অথচ দফায় দফায় দাম বেড়ে এখন প্রতিটি শেয়ারের দাম ৬ টাকা ৩০ পয়সায় উঠেছে। এরপরও এক শ্রেণির বিনিয়োগকারী এখন প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার বিক্রি করতে চাচ্ছেন না। এক মাসেরও কম সময়ে ১২৫ শতাংশ দাম বাড়লেও ২০১৯ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৮ পয়সা।

ঠিক মতো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করা কোম্পানি বিডি ওয়েল্ডিং। ২০১৪ সালের পর থেকে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। কোম্পানিটির শেয়ারের দাম গত ২১ জুলাই ছিল ১৪ টাকা ৬০ পয়সা, যা টানা বেড়ে সোমবার লেনদেন শেষে দাঁড়িয়েছে ২৮ টাকায়। এ হিসাবে মাসেরও কম সময়ের মধ্যে শেয়ারের দাম বেড়েছে ৯২ শতাংশ।

লোকসানে নিমজ্জিত সাভার রিফ্র্যাক্টরিজের শেয়ারের দাম ২১ জুলাই ছিল ৯৮ টাকা ৭০ পয়সা, যা সোমবার ১৮৫ টাকা ৬০ পয়সায় ওঠে। মাসেরও কম সময়ে দাম বেড়েছে ৮৮ শতাংশ। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৬৫ পয়সা। শেয়ারের এমন আকাশচুম্বী দাম হলেও কোম্পানিটি সর্বশেষ কবে লভ্যাংশ দিয়েছে তার কোনো তথ্য নেই।

অপর এক জাঙ্ক কোম্পানি ফ্যামিলি টেক্স। বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দিয়ে জেড গ্রুপে স্থান করে নেয়া কোম্পানিটির শেয়ারের দাম অর্ধমাসের মধ্যে বেড়েছে ৮৩ শতাংশ। ২৯ জুলাই প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ১ টাকা ৮০ পয়সা, যা টানা বেড়ে এখন ৩ টাকা ৩০ পয়সায় উঠেছে।

২০১৬ সালের পর বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেয়া তুং হাই নিটিংয়ের দাম ১০ কার্যদিবসের মধ্যে বেড়েছে ৭৪ শতাংশ। ৩০ জুলাই ১ টাকা ৯০ পয়সা থাকা কোম্পানিটির শেয়ারের দাম এখন ৩ টাকা ৩০ পয়সায় উঠেছে।

লোকসানে নিমজ্জিত তাল্লু স্পিনিং, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, জাহিন টেক্স, জুট স্পিনার্সও দাম বাড়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ফেরায় তাল্লু স্পিনিংয়ের ৬৯ শতাংশ, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক ও জাহিন টেক্সের ৬১ শতাংশ এবং জুট স্পিনার্সের ৪৫ শতাংশ দাম বেড়েছে এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে।

শুধু ওই কোম্পানিগুলো নয়, জাঙ্ক বা ‘জেড’ গ্রুপে থাকা প্রায় সব কোম্পানির শেয়ারের দাম সম্প্রতি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। মূলত, কারসাজি চক্রের মুনাফা হাতিয়ে নেয়ার কৌশলের কারণেই এসব কোম্পানির শেয়ারের এমন দাপট— মনে করছেন বিশ্লেষক ও শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, হঠাৎ করে জাঙ্ক শেয়ারের এমন অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। এটা কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারে না। এর পেছনে কোনো চক্র থাকতে পারে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এই চক্রের ফাঁদে পা দেয়া উচিত হবে না। জাঙ্ক শেয়ারের দাম বাড়ার পেছনে কী কারণ আছে তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসির) খতিয়ে দেখা উচিত এবং কোনো চক্র থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. বখতিয়ার হাসান বলেন, ‘লোকসানে নিমজ্জিত, বছরের পর বছর লভ্যাংশ দেয় না— এমন কোম্পানির শেয়ারের দাম এক মাসের মধ্যে একশ-দুইশ শতাংশ বেড়ে যাওয়া কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারে না। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো চক্র আছে। বিএসইসির উচিত এই চক্রকে শনাক্ত করে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া।

তিনি আরও বলেন, বিএসইসির নতুন কমিশন শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছেন। কয়েকটি দুর্বল কোম্পানির আইপিও বাতিল করেছেন। অনিয়ম করায় বেশকিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মোটা অঙ্কের জরিমানা করেছেন। এতে বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে বাজার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে।

‘এমন পরিস্থিতিতে জাঙ্ক শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বাড়া বাজারের জন্য ভালো লক্ষণ নয়। কারণ একটা সময় পর এসব কোম্পানির শেয়ারের দামে পতন হবে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লোকসানের মধ্যে পড়তে পারেন, যা সার্বিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

বখতিয়ার হাসান বলন, আমি বরাবরই বলে আসছি, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ‘জেড’ গ্রুপের শেয়ারে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। বিনিয়োগকারীদের মনে রাখতে হবে, তাদের বিনিয়োগ করা পুঁজির নিরাপত্তার জন্য তাদেরকেই উদ্যোগ নিতে হবে। কেউ যদি দুর্বল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে নিজের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে ফেলেন, তার দায় কিন্তু কেউ নেবে না।

ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, দীর্ঘদিন পর বাজার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। ‘জেড’ গ্রুপের শেয়ারের দাম যে হারে বাড়ছে তা টিকবে বলে মনে হয় না। অতিরিক্ত মুনাফার আশায় এসব শেয়ারে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, ‘জেড’ গ্রুপের কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিষয়টি আমাদের মনিটরিংয়ের মধ্যে আছে। বিনিয়োগকারীদের প্রটেকশনের (রক্ষা) জন্য আমরা সবধরনের পদক্ষেপ নেব। ইতোমধ্যে ‘জেড’ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।