আজ ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

ফুলের নয়, নিহতদের হেলমেটের ‘বাগান’; দিচ্ছে বিশেষ বার্তা

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ মানুষের বাগানে থাকে মন ভালো করা ফুল-ফল। শৌখিনদের বাগানে আরো নজরকাড়া কিছু থাকতে পারে। কিন্তু থাইল্যান্ডের চমপং চান্দ্রাকসার বাগানটাকে ব্যাখ্যা করা নিঃসন্দেহে দুরূহ বিষয়। তার বাগানে প্রবেশপথেই একটা মোটরবাইক চোখে পড়বে। সামনে বসা বড় একজন, পেছনে তাকে আকড়ে ধরে রয়েছে ছোট একটা বাচ্চা। মুহূর্তেই বুঝতে পারবেন এ দুজন আসলে ম্যানিকুইন। মানবের আদলে গড়া এই দুই পুতুল এমনভাবে সাজানো হয়েছে একদম সত্যি মনে হবে।

এই বাইকের পেছনে অনেকগুলো হেলমেট চোখে পড়বে। এগুলোই এই বাগানের ফুল। তবে এ বাগানটি বহু দুর্ভাগার স্মৃতিবিজড়িত। হেলমেটগুলো যারা ব্যবহার করতেন তাদের গল্পটাই অন্যদের জানান দেয় এই বাগান।

এই বাগান সম্পর্কে বলতে শুরু করলেন চমপং, এই ম্যানিকুইন বানিয়েছি মানুষকে এটা মনে করিয়ে দেয়ার জন্য যে, তারা যেন বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে নিরাপত্তার জন্যে হেলমেট পরে নিতে ভুলে না যান। অনেক সময়ই তারা হেলমেটটা পাশে বা সামনে রাখেন। ভাবেন, এটা পরলে তাদের ভালো দেখায় না। কিন্তু এই হেলমেটগুলো দিয়ে আমি মানুষকে বাইক নিয়ে বের হওয়ার আগে হেলমেট পরে নেয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে চাই।

এই হেলমেটগুলো কিন্তু স্রেফ বাজার থেকে কিনে আনা বা রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া হেলমেট নয়। যারা দুর্ঘটনায় নিজের জীবন হারিয়েছেন তাদের হেলমেটগুলো সংগ্রহ করেছেন চমপং। যাদের মৃত্যু হয়েছে সেই দুর্ঘটনা স্থল থেকে হেলমেটগুলো আনা হয়েছে।

দুটো পুরনো হেলমেট হাত তুলে নিলেন চমপং। বললেন, এ দুটোর বয়স যুগ পেরিয়েছে। বাসের সাথে সংঘর্ষ হয়েছিল বাইকের। আরোহী ঘটনাস্থলেই মারা যান। সেদিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। কাজে যাওয়ার আগে খাওয়ার কাজটা সেরে নিচ্ছিলাম। বাইরে থেকে বিকট আওয়াজ শুনলাম। বেরিয়ে দেখি দুজনের মৃতদেহ পড়ে আছে। চালকের হেলমেটটা পড়েছিল। ওটা কেউ নেয়নি। পরে আমি নিয়ে আসি।

বাগানের কোণায় বাউন্ডারি ওয়াল। ওটার ওপরে সারি করে সাজানো হেলমেট। সবগুলোরই মর্মান্তিক গল্প রয়েছে। এখানকার প্রতিটি হেলমেট এসেছে দুর্ঘটনায় জীবন যাওয়া বাইকারদের কাছ থেকে। এদের সবার হেলমেট বাইকের পাশে জুড়ে থাকা ঝুরিতে ছিল, তাদের মাথায় নয়। ‘এটা মারাত্মক এক দুর্ঘটনা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। হেলমেটে অর্ধেকটা রয়েছে। এটার মালিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন’, একটা হেলমেট হাতে নিয়ে বললেন তিনি।

এই মন খারাপ করা বাগানে আরেকটু ভেতরে গেলেই একটা পুতুল চোখে পড়বে। ছোট একটা পুতুল ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পাশেই ছোট একটা হেলমেট। দুটোই একটা বাচ্চার। সে আর তার বাবা-মায়ের একজন দুর্ঘটনায় মারা যান। তাদের নাম আমি জানি না, বললেন সংগ্রাহক।

এমন অসংখ্য হেলমেট পড়ে রয়েছে। কিছু হেলমেট ভাঙাচোড়া, আবার কিছু দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো স্পর্শই পড়েনি। কিছু হেলমেটের ভেতর দিয়ে গাছ গজিয়েছে। শেকড়-বাকর আকড়ে রেখেছে। কয়েকটি হেলমেটে ছেয়ে রয়েছে লতা-গুল্ম। এগুলো পরিষ্কার করা হয়নি।

আরো কিছু হেলমেট রয়েছে যেগুলোতে সামান্য আঁচড়ের মতো দাগ রয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় বাইকার বেঁচে গেছেন। তবে কারো হাত বা কারো পা ভেঙেছে। দাগগুলো নিঃসন্দেহে ভয়াবহতার চিহ্ন বহন করে।

‘আমার নিজের এখন হেলমেট নেই। মাঝে মাঝে বাজারে বাইকে করে গেলে এখান থেকেই হেলমেট নিয়ে পরি। মৃতদের হেলমেট পরি, অনেকবার পরেছি।

চমপংয়ের এই বাগানটা অন্যদের জন্য সাবধান বাণী হতে পারে। সবাইকে সচেতন করে বিশেষ বার্তা দিয়ে। তবে আরেকটা সমস্যাও হয়েছে তার জন্য। অনেকের বিশ্বাস, মৃতদের হেলমেট রাখার কারণে এই বাড়িতে ভূতের আনাগোনা রয়েছে। অনেক বাচ্চা এই বাগানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ভয় পায়। আশপাশের যারা চমপংয়ের কাছ থেকে প্রয়োজনে হেলমেট ধার নিয়েছিলেন তারা ওটা পরার পর নাকি রাতে ঘুমাতে পারেন না। আবার অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন, চমপংয়ের বাড়িতে গতরাতে কোনো অনুষ্ঠান ছিল কিনা। কারণ তারা অনেক মানুষের আনাগোনার আওয়াজ পেয়েছেন। অথচ তার তিন-চারজনের সংসার। কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়নি। এমন অনেক পরিস্থিতি তৈরি হয় মাঝে মাঝে।

‘আমার কোনো ভয় কাজ করে না। আমি কেবল অন্যদের সাবধান করতে চাই। রাস্তার পাশে হেলমেট সারি করে রাখার বিষয়টা অন্যদের কাছে খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু এ থেকে অন্যদের শিক্ষা নেয়া উচিত। অনেকে এ বিষয়টা মৃতদের জন্যে সম্মানহানীকর মনে করেন। আমি তা মনে করি না। এগুলো প্রদর্শন করা হয়েছে সবাইকে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য। এগুলো সংগ্রহের সময় আমি অনুমতি নিয়ে থাকি’, বলেন তিনি।

এই হেলমেটগুলো অনেক ভৌতিক গল্পের জন্ম দিলেও প্রতিবেশীরা সাবধান হয়েছেন। তারা বার্তাটা গ্রহণ করেছেন। হেলমেট ছাড়া বাইকে চড়েন না। রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে তারা এখন অনেক বেশি সাবধান।

সূত্র: স্কাই নিউজ