আজ ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সুযোগ-সুবিধার লোভে তাঁরা নিচু পদে?

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে পরিচালক পদ আছে আটটি। এসব পদে উপসচিব মর্যাদার কর্মকর্তারা নিয়োগ পান। কিন্তু পরিচালক (প্রশাসন) পদে কাজ করছেন অতিরিক্ত সচিব হারুন অর রশিদ মোল্লা। পরিচালক পদে কর্মরত আছেন আরো কয়েকজন যুগ্ম সচিবও।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সেন্ট্রাল মেডিক্যাল সাপ্লাই ডিপো-সিএমএসডি) পরিচালক পদটি উপসচিব মর্যাদার। এই পদে বর্তমানে রয়েছেন অতিরিক্ত সচিব মর্যাদার কর্মকর্তা আবু হেনা মোরশেদ জামান।

এভাবে নিম্নপদের কর্মকর্তার জায়গায় উচ্চ পদের কর্মকর্তা থাকায় নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে। অন্য দপ্তরের সঙ্গে কাজ করতে গিয়েও জটিলতা তৈরি হয়।

অনেকের প্রশ্ন উচ্চ পদধারীদের নিম্নপদে থাকার কারণ কী?
উদাহরণ দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, সিএমএসডির বর্তমান পরিচালক একজন অতিরিক্ত সচিব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কাজের দায়িত্বে থাকা উপসচিব ও যুগ্ম সচিব মর্যাদার কর্মকর্তারা অনেক কমিটির আহ্বায়ক থাকেন। সেখানে সিএমএসডির পরিচালক থাকেন সদস্য। এখন সিএমএসডির পরিচালক একজন অতিরিক্ত সচিব হওয়ায় উপসচিব-যুগ্ম সচিব মর্যাদার কর্মকর্তাদের কেউ বৈঠক আহ্বান করলে তিনি যান না, প্রতিনিধি পাঠান। এতে কমিটির সঙ্গে পরিচালকের সরাসরি যোগাযোগ না হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কৌশল নির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুল-বোঝাবুঝিরও সৃষ্টি হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর যাত্রা শুরু করার পর মহাপরিচালক পদটি দুই দফা আপগ্রেড করা হয়েছে। কিন্তু পরিচালক পদগুলোতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এ কারণে অনেকে পদোন্নতি পেলেও নিজে পদের মর্যাদার পরিচয় দিতে চান না।

উপসচিব মর্যাদার পদে কাজ করা অতিরিক্ত সচিব হারুন অর রশিদ মোল্লার কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘এখানে আমি নতুন যোগ দিয়েছি। কোন পদ কোন মর্যাদার তা আমার জানা নেই।’

পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হারুন অর রশিদ মোল্লা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে কমবেশি তিন বছর ধরে পরিচালক হিসেবে আছেন। এখানে থাকাকালেই তিনি যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। এখন পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও নিজের পদ-গ্রেড সম্পর্কে জানেন না!

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, যিনি নিজে কোন গ্রেডের পদে আছেন সেটা জানেন না, তিনি একটি অধিদপ্তরের প্রশাসন কিভাবে পরিচালনা করেন?

অন্য একজন কর্মকর্তা বলেন, এগুলো সবাই জানেন, কিন্তু প্রকাশ করতে চান না।

সাধারণত মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অনুবিভাগের প্রধান থাকেন যুগ্ম সচিবরা। তবে কিছু কিছু মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিবদের একটি পদও সাংগঠনিক কাঠামোতে রয়েছে। বর্তমানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনুবিভাগ প্রধানের দায়িত্বে যুগ্ম সচিবদের বদলে অতিরিক্ত সচিবদের দেওয়া হচ্ছে। অথচ মন্ত্রণালয়ের সাংগঠনিক কাঠামোতে যুগ্ম সচিবদের অনুবিভাগ প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা আছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ‘উন্নয়ন’ অনুবিভাগের প্রধান অতিরিক্ত সচিব বেলায়েত হোসেন। বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, এই অনুবিভাগে একজন অতিরিক্ত সচিবের অধীনে তিনটি অধিশাখায় তিনজন উপসচিবের পদ রয়েছে। এর মধ্যে উন্নয়ন-২ অধিশাখায় দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত সচিব ফজলুর রহমান। কিন্তু এই অধিশাখায় একজন উপসচিবের দায়িত্ব পালন করার কথা।

জনবল কাঠামো অনুযায়ী, রেলপথ মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব পদের সংখ্যা মাত্র একটি। এই মন্ত্রণালয়ের চারটি অনুবিভাগের সবকটির দায়িত্বে থাকার কথা যুগ্ম সচিবদের। কিন্তু চারটিতেই দায়িত্বে আছেন অতিরিক্ত সচিবরা। আর যুগ্ম সচিবরা কাজ করছেন অধিশাখায়। কিছু ক্ষেত্রে শাখার দায়িত্বেও যুগ্ম সচিবরা দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে দায়িত্ব পালন করার কথা সহকারী বা সিনিয়র সহকারী সচিবরা।

প্রশাসনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্ধারিত পদ না থাকলেও একের পর এক পদোন্নতির মাধ্যমে উচ্চ পদে কর্মকর্তার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, কমছে নিচের পদের কর্মকর্তার সংখ্যা। অনেককে নিচু পদে বাধ্য হয়ে কাজ করতে হয়। আবার অনেকে সুযোগ-সুবিধার লোভেও নিচু পদে থাকতে আগ্রহী হন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব জানান, বিভিন্ন দপ্তরের পদোন্নতি পেয়ে অনেকে সিনিয়র হয়ে যান। ফলে অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো) অনুযায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ দিলে সমমর্যাদার হয়ে গেলে দপ্তর চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে সিনিয়রদের নিয়োগ দিতে হয়।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘যে জায়গায় যাকে দিলে ভালো কাজ হবে তাকেই পদায়ন করা হচ্ছে।’