আজ ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

করোনা আক্রান্ত হয়ে স্বজনহারা পরিবারগুলো কেমন আছে?

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ  বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে শনিবার পর্যন্ত ২,৩০৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৮১ হাজারের বেশি মানুষ।

সংক্রমণ রোগ হওয়ায় এই রোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে ভীতি বা আতঙ্ক রয়েছে। যেসব পরিবারের সদস্যরা আক্রান্ত হন বা মারা যান, তাদের ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে বিরূপ আচরণের অভিযোগও উঠেছে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের পরিবারকে কতটা মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে? সামাজিকভাবে তারা কেমন প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হন?

বিবিসি বাংলার কাছে নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন কয়েকজন:

কুশল চক্রবর্তী, ফরিদপুরের বাসিন্দা

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন শুনছিলাম। আমাদের বাসার কাছাকাছি হাসপাতালে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে করোনাভাইরাস ওয়ার্ড করা হবে শুনে আমি ফেসবুকে প্রতিবাদও করেছি।

কিন্তু কখনো ভাবিনি আমার পরিবারের সদস্যরাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবেন, মারা যাবেন।

আমার বাবা এবং কাকা মিলে একটা ওষুধের ফার্মেসি চালাতেন। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন।

আমাদের যৌথ পরিবারের বাবাই ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। তিনি পরিবারটাকে ধরে রেখেছিলেন। সেই মানুষটা হঠাৎ করে কয়েকদিনের অসুখে নাই হয়ে গেলেন। আমাদের পুরো পরিবারটাই যেন বিপর্যস্ত হয়ে গেল।

এরপরে আমার ছোট কাকাও আক্রান্ত হয়েছেন। আমাদের পরিবারের সব মিলিয়ে আটজন আক্রান্ত হয়েছিলেন।

আমাদের পরিবার যেন একেবারে জনসমাগম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। আমার জীবনের সম্ভবত সবচেয়ে অভিশপ্ত সময়টা কেটেছে।

স্বাভাবিকভাবেই আত্মীয়স্বজনরা আসতে চায় না, কারণ সবার জীবনেরই একটা মায়া থাকে। প্রতিবেশীদের আচরণও পাল্টে গিয়েছিল। আমাদের কাছে তো কেউ আসেই নাই, বরং মানুষজনের কিসব ভ্রান্ত ধারণা ছিল- যেন আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে কেউ গেলেও তার করোনা হয়ে যাবে।

তবে কিছু কিছু আত্মীয়স্বজন আবার সবসময় খোঁজখবর নিয়েছে। বিশেষ করে আমার ফুফাতো ভাই আর মামারা বাজারহাট করে দিয়েছেন, যথাসম্ভব চেষ্টা করেছেন।

এই একমাস আমাদের ওষুধের দোকান বন্ধ ছিল। অর্থাৎ পুরো সোয়া একমাস ধরে আমাদের পরিবারের কোন আয়-রোজগার ছিল না।

ফারহানা হক, ঢাকার বাসিন্দা

আমার খালু কিছুদিন আগে মারা গেছেন। তার করোনাভাইরাস পরীক্ষা হয়নি, তবে সবরকম লক্ষণ নিয়েই তিনি মারা গেছেন।

খালুর জ্বর হওয়ার পর থেকেই খালাকে বা খালাতো ভাইকে বলেছিলাম করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করাতে। কিন্তু তারা রাজি হননি। তারা মনে করছিলেন, এটা স্বাভাবিক জ্বর। কিন্তু তারা রাজি হচ্ছিলেন না যে, লোকে কি বলবে? কেমন দেখাবে?

কয়েকদিন পরে বাড়িতেই হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট হয়ে দুই ঘণ্টার ভেতরে তিনি মারা গেলেন। আমরা হাসপাতালে নেয়ার সুযোগও পাইনি।

উনি মারা যাওয়ার পর, করোনাভাইরাসের লক্ষণ থাকায় আমাদের স্বজনরা সেভাবে জানাজায় বা দাফনের জন্য এগিয়ে আসেননি। করোনাভাইরাসের (মারা যাওয়া ব্যক্তিদের) জন্য যারা কাজ করে, এরকম একটি এজেন্সির সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি।

তখন আমাদের খালা এবং খালাতো ভাই খুব অফেন্ডেড হয়েছিলেন। তারা খুবই মাইন্ড করেছেন যে এরকম একটি সময়ে কেউ সাথে থাকেনি। তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক খুব খারাপ হয়ে গেছে।

খালুর মৃতদেহ যখন নিতে আসে, তখন অন্য অ্যাপার্টমেন্টের মালিকরা খুব ঝামেলা করেছিলেন। তারা বলছিলেন, আগে টেস্ট করিয়ে বলতে হবে, তিনি করোনাভাইরাসে মারা গেছেন কিনা, তারপরে লাশ নিতে দেবো। তর্কবিতর্ক হয়েছে।

পরে টেস্ট করে আমার খালারও করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। তিনি এখন সুস্থ হয়ে গেছেন।

কিন্তু ওই ঘটনার পর থেকে পরিবারটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

আফসানা রহমান (আসল নাম নয়), ঢাকার বাসিন্দা

আমরা সবরকম সতর্কতা নিয়েই চলতাম, কিন্তু তারপরেও আমার বাবা কিভাবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেন জানি না। হয়তো বিকালে যে হাটতে যেতেন, তার কারণেও হতে পারে।

এপ্রিল মাসে তার জ্বর আসার পর আমরা করোনাভাইরাসের টেস্ট করালে পজিটিভ শনাক্ত হয়। তখন থেকেই তিনি বাড়িতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

কিন্তু কিছুদিন পর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাই। দুইদিন পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

এমনিতে আমাদের আত্মীয়স্বজনের কারো রোগব্যাধি হলে সবাই খোঁজখবর নেয়। এখানেও সবাই টেলিফোনে খোঁজখবর নিয়েছে, টাকা পয়সা লাগবে কিনা জানতে চেয়েছে। কিন্তু কেউ দেখতে আসেনি।

এমনকি মারা যাওয়ার পর জানাজা বা দাফনের সময়েও আমাদের কোন আত্মীয়স্বজন আসেনি। তবে সেজন্য কারো বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ নেই। তাদের ভয় আমরা বুঝতে পারি।

হাসপাতাল থেকেই মারকাজুল ইসলামের কর্মীরা আমার বাবার মৃতদেহ ঢাকার একটি কবরস্থানে নিয়ে দাফন করেছেন। কোন মিলাদ হয়নি, চল্লিশা হয়নি। টেলিফোনে অনেকে খোঁজ নিয়েছেন, কিন্তু কোন আত্মীয়স্বজন আসেননি।

আমার বাবার করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই বাড়িওয়ালা বলে দিয়েছিলেন, আমরা যেন কারো বাড়িতে না যাই বা বিল্ডিংয়ের কোন জিনিসপত্র না ধরি। তারা ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন যেন আমরা বাড়ি ছেড়ে দেই।

আমার বাবা একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। পরিবারে মা আর আমি আর আরেকটা ছোট ভাই। বাবা মারা যাওয়ার পরে আমরা সবাই খুব অসহায় হয়ে গেলাম। জমানো টাকা বেশি নেই। হয়তো বাবার প্রভিডেন্ট ফান্ডের কিছু টাকা পাওয়া যাবে। মা একটা প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করেন, কিন্তু তিনি খুব ভেঙ্গে পড়েছেন। কীভাবে কি করবেন বুঝতে পারছি না।

খুব বেশিদিন হয়তো আর ঢাকায় থাকাও যাবে না। এমনিতেই হয়তো বাসা ছেড়ে দিয়ে আমাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে হবে।

অনেক বেশি মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ মেখলা সরকার বিবিসিকে বলছেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা স্বজন হারাচ্ছেন, তাদের পুরোপুরি ভিন্ন রকমের একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

তিনি বলছেন, ”সাধারণত আমাদের দেশে যখন কেউ মারা যায়, তার আশেপাশের প্রতিবেশীরা, আত্মীয়স্বজন বড় একটি সাপোর্টিভ ভূমিকা পালন করেন। ধর্মীয় যেসব আচার-অনুষ্ঠান থাকে, সেগুলোও সামাজিক অনুষ্ঠান।”

“মৃত্যুর মতো কঠিন একটি বিষয়ের কষ্ট কাটিয়ে ওঠার জন্য, মোকাবেলা করার জন্য এই সামাজিক ব্যাপারগুলো অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।”

”কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এখন যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের পুরো পরিবারটিকে একা সামলাতে হচ্ছে। আত্মীয়স্বজন ঠিকমতো আসতে পারছে না, তাদের ভালোবাসার ব্যাপারটি দেখাতে পারছে না। এমনকি কবর যখন হচ্ছে, সেখানেও বেশি মানুষ নেই। ফলে পরিবারগুলোকে অনেক বেশি মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে,” বলছেন ডাঃ মেখলা সরকার।

তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন, এরকম পরিস্থিতিতে আত্মীয়স্বজনের বড় ভূমিকা নেয়া উচিত। কাছাকাছি আসতে না পারলেও তারা যে সমব্যথী, সেটা ফোনে হলেও তুলে উচিত। তেমনি যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদেরও নিজেদের প্রকাশ করা উচিত।